নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী কারা?


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬, ১২:৪২ পিএম
নির্বাচনে প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী কারা?
নির্বাচনে সবচেয়ে ধনী প্রার্থীরা (ওপরে বাঁ থেকে)– আবদুল আউয়াল মিন্টু, আসলাম চৌধুরী, ফখর উদ্দিন আহমেদ, জাকারিয়া তাহের ও এম এ এইচ সেলিম; (নিচে বাঁ থেকে)– সালাউদ্দিন আলমগীর, মো. জালাল উদ্দীন, গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, মোহাম্মদ ফজলুল আজিম ও মো. সফিকুর রহমান।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এরই মধ্যে মনোনয়ন চূড়ান্ত করে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ৩০০টি আসনে মোট ১ হাজার ৯৯৪ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের মধ্যে ২৫৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বাকিরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মনোনীত।

প্রার্থীদের জমা দেওয়া নির্বাচনী হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের মধ্যে অন্তত ২৬ জন শতকোটি টাকার মালিক। একই সঙ্গে স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী কোটিপতি প্রার্থী রয়েছেন ৮৯১ জন।

টিআইবির প্রতিবেদন ও প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শীর্ষ ১০ ধনী প্রার্থীর তালিকা তৈরি হয়েছে।

শীর্ষে বিএনপির আবদুল আউয়াল মিন্টু
ধনী প্রার্থীদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন ফেনী-৩ (সোনাগাজী ও দাগনভূঞা) আসনের বিএনপির প্রার্থী আবদুল আউয়াল মিন্টু। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর ও তাঁর স্ত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়ালের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য ৬০৭ কোটি টাকা।

আবদুল আউয়াল মিন্টু বর্তমানে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। হলফনামা অনুযায়ী, তিনি পেশায় ব্যবসায়ী। তাঁর নিজের নামে থাকা সম্পদের মূল্য ৫০৭ কোটি টাকা। তাঁর স্ত্রী নাসরিন ফাতেমা আউয়ালের নামে রয়েছে ১০০ কোটি টাকার সম্পদ। তিনিও পেশায় ব্যবসায়ী।

হলফনামায় নিজের ৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা দায় থাকার কথাও জানিয়েছেন আবদুল আউয়াল। তবে তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের কোনো দায়-দেনা নেই। একক ও যৌথ নামে ২৮০ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ থাকার তথ্য রয়েছে তাঁর হলফনামায়।

দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে বিএনপির আরও দুজন
তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন চট্টগ্রাম-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী মোহাম্মদ আসলাম চৌধুরী। তাঁর, তাঁর স্ত্রী জামিলা নাজনীল মাওলা এবং কন্যা মেহরীন আনহারের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট মূল্য ৪৭৪ কোটি টাকা। হলফনামা অনুযায়ী, তাঁরা তিনজনই পেশায় ব্যবসায়ী। বিভিন্ন ব্যাংকে ৩৪৫ কোটি টাকা ঋণের তথ্য হলফনামায় উল্লেখ করেছেন আসলাম চৌধুরী।

তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন ময়মনসিংহ-১১ আসনের বিএনপির প্রার্থী ফখর উদ্দিন আহমেদ। স্থাবর ও অস্থাবর মিলিয়ে তাঁর মোট সম্পদের মূল্য ২৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে তাঁর স্ত্রীর নামে রয়েছে সাত কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ। তিনি ও তাঁর স্ত্রী তাসলিমা আক্তার দুজনই ব্যবসায়ী। হলফনামা অনুযায়ী, ফখর উদ্দিনের ব্যাংকঋণ ১৫ কোটি টাকা।

চতুর্থ স্থানে রয়েছেন কুমিল্লা-৮ আসনের বিএনপির প্রার্থী জাকারিয়া তাহের। তাঁর ও তাঁর স্ত্রী নাজনীন আহমেদের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য ২৯২ কোটি টাকা। তাঁরা দুজনই পেশায় ব্যবসায়ী। তাঁর হলফনামায় ঋণের কোনো তথ্য নেই।

স্বতন্ত্র প্রার্থীদের উত্থান
নির্বাচনে অংশ নেওয়া ২৫৬ স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে তিনজন রয়েছেন শীর্ষ ১০ ধনীর তালিকায়। পঞ্চম স্থানে রয়েছেন টাঙ্গাইল-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী সালাউদ্দিন আলমগীর। তিনি পেশায় ব্যবসায়ী। নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, তাঁর ও তাঁর স্ত্রী সুলতানা জাহানের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মোট বাজারমূল্য ২৮৩ কোটি টাকা।

ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম। বিএনপির সাবেক এই সংসদ সদস্য বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁর একার নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য ২৬২ কোটি টাকা। প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার দায় রয়েছে এম এ এইচ সেলিমের।

বিশ্লেষকদের মতে, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের একটি বড় অংশ ব্যবসায়ী হওয়ায় অর্থনৈতিক সক্ষমতাই তাঁদের নির্বাচনী শক্তির প্রধান ভরকেন্দ্র হয়ে উঠছে।

বাকি তালিকা
শীর্ষ ১০ ধনীর তালিকায় বিএনপির প্রার্থী মোট সাতজন। সপ্তম অবস্থানে রয়েছেন চাঁদপুর-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী মো. জালাল উদ্দীন। তাঁর ও তাঁর স্ত্রী শাহনাজ শারমীনের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য ২৪৯ কোটি টাকা। তাঁরা দুজনই পেশায় ব্যবসায়ী। এর আগে মো. জালাল উদ্দীন ঢাকাস্থ স্পেন দূতাবাসে কর্মরত ছিলেন।

অষ্টম অবস্থানে রয়েছেন বগুড়া-৫ আসনের বিএনপির প্রার্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ। তাঁর স্ত্রী শাহনাজ সিরাজ, পুত্র আসিফ রাব্বানী এবং তিনি নিজেও পেশায় ব্যবসায়ী। তাঁদের নামে থাকা স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের বর্তমান মূল্য ২০৪ কোটি টাকা। একটি ব্যাংকে ২৭ লাখ টাকার ঋণ রয়েছে অষ্টম স্থানে থাকা গোলাম মোহাম্মদ সিরাজের।

নবম স্থানে রয়েছেন নোয়াখালী-৬ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মোহাম্মদ ফজলুল আজিম। স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে তাঁর মোট সম্পদের বর্তমান মূল্য ১৯০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২১ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে তাঁর স্ত্রী শামীমা আজিমের নামে। পেশায় তাঁরা দুজনই ব্যবসায়ী।

শীর্ষ ১০ ধনী প্রার্থীর তালিকায় দশম অবস্থানে আছেন শরীয়তপুর-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী মো. সফিকুর রহমান। টিআইবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাঁর সম্পদের বর্তমান মূল্য ১৮৫ কোটি টাকা। তিনিও পেশায় ব্যবসায়ী। দুটি ব্যাংকে ৪১ কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে তাঁর।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল সম্পদের পাশাপাশি বড় অঙ্কের ব্যাংকঋণ থাকলে নির্বাচিত হলে স্বার্থের সংঘাত ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এরই মধ্যে অনেকের খেলাপি ঋণ নিয়ে প্রার্থী হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘যারা জনগণের টাকা নিয়ে টাকা পরিশোধ করতে চায় না, তাঁরা জনগণের সেবা করবে কীভাবে?’

রাজনৈতিক দলগুলোর যতদিন না পর্যন্ত শুদ্ধভাবে, যোগ্য ব্যক্তিকে মনোনয়ন দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু না করবে, ততদিন পর্যন্ত দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা ভালো হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

Link copied!