টাইমকে তারেক রহমান

জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৯, ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
জনগণের রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে

বিএনপির কার্যনির্বাহী কেন্দ্রীয় পরিচালক তারেক রহমান যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত সাময়িকী টাইমকে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, দেশের জনগণ যাতে তাঁদের হারিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক অধিকার পুনরুদ্ধার করতে পারেন সেই লক্ষ্যে সকল শক্তি ও গোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস অত্যন্ত জরুরি। বুধবার টাইমের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই বিস্তারিত প্রতিবেদনটি তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনের পর প্রথম একান্ত সাক্ষাৎকার হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যাপক গুরুত্ব পেয়েছে।

 

সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান বলেন, "আমি যদি আমার পরিকল্পনার মাত্র ৩০ ভাগও সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি, তাহলে আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশের সকল মানুষ আমাকে সমর্থন করবেন এবং দেশকে একটি নতুন দিকনির্দেশনা দেওয়ার সুযোগ পাব।" টাইমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার শুরু করেছে তা দেশকে আবারও স্বৈরাচারের দিকে ঝুঁকে পড়া থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয় ভারসাম্য তৈরি করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের সময়ে তারেক রহমান প্রয়োজনীয় আত্মোপলব্ধি এবং পরিপক্বতা অর্জন করেছেন, যা তাঁকে দেশের জনগণের প্রকৃত নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ করে দিতে পারে। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে প্রাণ দানকারীদের প্রতি দায়বদ্ধতা জানিয়ে তিনি বলেন, "যাঁরা এই আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছেন তাঁদের প্রতি আমাদের অত্যন্ত শক্তিশালী দায়বদ্ধতা রয়েছে, এবং জনগণ যাতে তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার সম্পূর্ণরূপে ফিরে পান সেই লক্ষ্যে আমাদের সকলের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।"

 

তারেক রহমানের জীবনের সাম্প্রতিক মাসগুলো ছিল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ এবং আবেগপূর্ণ। যুক্তরাজ্যের লন্ডনে ১৭ বছর নির্বাসিত জীবনযাপনের পর গত ২৫ ডিসেম্বর তিনি বাংলাদেশে পৌঁছালেন, যখন লাখো উচ্ছ্বসিত সমর্থক রাজধানীর রাস্তায় তাঁকে স্বাগত জানায় এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্যমের সঞ্চার ঘটে। কিন্তু এর মাত্র পাঁচ দিন পরই দীর্ঘ অসুস্থতার শিকার তাঁর মা এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মারা যান, যা তারেকের জন্য ব্যক্তিগতভাবে বিশাল আঘাত হয়ে দাঁড়ায়। খালেদা জিয়ার জানাজার সময় রাজধানী ঢাকা জনসমুদ্রে পরিণত হয় এবং অশ্রুসজল চোখে তারেক রহমান সংবাদমাধ্যমের সামনে বলেন, "আমার হৃদয় বড় বেশি দুঃখভারাক্রান্ত, কিন্তু মা'র কাছ থেকে আমি এই শিক্ষা পেয়েছি যে যখন কোনো দায়িত্ব আপনার ওপর অর্পিত হয় তখন তা অবশ্যই পালন করতে হয়।" সমর্থকদের কাছে তিনি নিপীড়নের শিকার একজন মুক্তিদাতা যিনি সমস্যাগ্রস্ত মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে ফিরে এসেছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা তাঁর নেতৃত্বের একমাত্র যোগ্যতা পারিবারিক সূত্র বলে মনে করেন। তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেছেন, "আমি আমার বাবা-মায়ের সন্তান হওয়ার কারণে এখানে নেই, আমার দলের লাখো সমর্থকদের জন্যই আজ আমি এখানে পৌঁছেছি এবং এই বিভক্ত জাতিকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনব।"

 

টাইমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের মানুষ তারেক রহমানের কথায় আস্থা রাখছে বলে মনে হচ্ছে, যা ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে করা এক জনমতজরিপে প্রতিফলিত হয়েছে—যেখানে তার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর প্রতি প্রায় ৭০ শতাংশ সমর্থন পাওয়া গেছে, যা নিকটতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর ১৯ শতাংশ সমর্থনের তুলনায় অনেকগুণ বেশি। তবে প্রতিবেদনে স্পষ্ট উদ্বেগও প্রকাশ করা হয়েছে যে, ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির শাসনামলে দুর্নীতির ধারণা সূচকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল টানা চার বছর বাংলাদেশকে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সংস্কারপন্থী নেতাকর্মীরা আশঙ্কা করছেন, শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ বিক্ষোভকারী প্রাণ দিয়েছেন তাঁদের রক্তের বিনিময়ে শেষ পর্যন্ত হয়তো আরেকজন স্বার্থপর অভিজাত শাসকের উত্থান ঘটবে।

 

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ এবং দণ্ডের বিষয়ও টাইমের প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। ২০০৭-২০০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অর্থ আত্মসাৎ, অর্থ পাচার এবং আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনাসহ মোট ৮৪টি অভিযোগে তিনি ১৮ মাস কারাবন্দী ছিলেন। এই সময় কারাগারে নির্যাতনের কারণে তাঁর মেরুদণ্ডে স্থায়ী সমস্যা তৈরি হয়, যা আজও তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে এবং মূলত চিকিৎসার উদ্দেশ্যেই তিনি যুক্তরাজ্যে যান। সব দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করতে গিয়ে তারেক বলেন, "তারা কোনো কিছুই প্রমাণ করতে পারেনি, এবং অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে আমার সব দণ্ড বাতিল হয়েছে।" বর্তমান মেরুদণ্ডের সমস্যা সম্পর্কে তিনি বলেন, "খুব বেশি শীত পড়লে আমার পিঠে ব্যথা বেড়ে যায়, কিন্তু আমি এটাকে জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতার স্মারক হিসেবে দেখি। আমাকে আমার সেরাটা দিতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর এই ধরনের পরিস্থিতির শিকার না হয় এবং দেশ একটি সমৃদ্ধ, গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়।"

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!