দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে সুনামগঞ্জের ছাতকে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে বিস্ফোরণের বহুল আলোচিত ঘটনায় কানাডিয়ান বহুজাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানি নাইকোর বিরুদ্ধে চলা মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতে চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটনভিত্তিক আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর সেটেলমেন্ট অব ইনভেস্টমেন্ট ডিসপিউট (ইকসিড) এক ঐতিহাসিক রায়ে নাইকোকে ৪ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৫১৬ কোটি টাকা) ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান এই রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এই জয় বাংলাদেশের শক্তি খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
২০০৫ সালের ভয়াবহ বিস্ফোরণ
২০০৩ সালে টেংরাটিলা গ্যাসক্ষেত্রে গ্যাস অনুসন্ধানের দায়িত্ব পায় কানাডিয়ান কোম্পানি নাইকো। তবে অদক্ষতা ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় না রাখার কারণে ২০০৫ সালের ৭ জানুয়ারি এবং ২৪ জুন পরপর দুবার সেখানে ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে।
সেই আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে যায় প্রায় আট বিলিয়ন ঘনফুট মূল্যবান গ্যাস। তছনছ হয়ে যায় আশপাশের জনপদ ও পরিবেশ। স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষতির সম্মুখীন হন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়। এই বিপর্যয় বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে।
দীর্ঘ আইনি লড়াই
বিস্ফোরণের পর পেট্রোবাংলা ৭৪৬ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দাবি করলে নাইকো তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত গড়ায়। ২০১৬ সালে বাপেক্স প্রায় ৯ হাজার ২৫০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দাবি করে মামলা দায়ের করে। দীর্ঘ এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই আইনি লড়াইয়ে অবশেষে বাংলাদেশের পক্ষে রায় এসেছে।
ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ
ইকসিড ট্রাইব্যুনাল তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নাইকোর অব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক পেট্রোলিয়াম শিল্পের মানদণ্ড অনুসরণে ব্যর্থতার কারণেই এই মহাবিপর্যয় ঘটেছিল। ট্রাইব্যুনাল নাইকোর কর্মপদ্ধতিকে অবহেলাপূর্ণ এবং পেশাদারিত্বহীন বলে চিহ্নিত করেছে।
পেট্রোবাংলার সূত্রমতে, ইকসিডের রায়ে পুড়ে যাওয়া গ্যাসের দাম বাবদ ৪০ মিলিয়ন ডলার এবং পরিবেশগত ও অন্যান্য ক্ষতির জন্য আরও দুই মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়েছে। বর্তমানে প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে এই অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ৫১৬ কোটি টাকা।
ছাতক গ্যাসক্ষেত্রের ভবিষ্যৎ
বর্তমানে ছাতক পূর্ব ও পশ্চিম মিলিয়ে দুই থেকে পাঁচ ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের বিশাল মজুতের সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এই গ্যাসক্ষেত্র সঠিকভাবে উন্নয়ন করতে পারলে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজানুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, "আমরা এই চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় ছিলাম। ছাতক গ্যাসক্ষেত্রে নতুন করে কূপ খননের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) এরই মধ্যে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এখন আইনজীবীদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।"
ক্ষতিপূরণ আদায় ও পরবর্তী পদক্ষেপ
এই রায়ের পর এখন প্রশ্ন উঠছে কীভাবে এবং কত দ্রুত নাইকোর কাছ থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থ আদায় করা যাবে। পেট্রোবাংলা তাদের আইনি উপদেষ্টাদের সঙ্গে পরামর্শ করে দ্রুত অর্থ আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু করবে বলে জানিয়েছে।
এই বিজয় শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি নৈতিক বিজয়ও। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে টিকে থেকে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে যে, বহুজাতিক কোম্পানির অব্যবস্থাপনা ও অবহেলার বিরুদ্ধে দেশ তার অধিকার রক্ষায় সক্ষম।
জাতীয় স্বার্থ রক্ষার দৃষ্টান্ত
টেংরাটিলা মামলায় এই জয় ভবিষ্যতে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি শিক্ষাও হবে যে, বাংলাদেশে কাজ করতে হলে আন্তর্জাতিক মান ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে হবে। অন্যথায় তাদের আইনি জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে।
এই ক্ষতিপূরণের অর্থ ছাতক গ্যাসক্ষেত্র পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে বলে আশা করা হচ্ছে, যা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।





































