বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, শেখ হাসিনা ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো স্থায়ী বাধা হতে পারেন না। তাঁর ভাষায়, শেখ হাসিনার উপস্থিতি বা অনুপস্থিতির ঊর্ধ্বে উঠে দুই দেশের সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে হবে। ভারতের সাপ্তাহিক প্রভাবশালী ইংরেজি সাময়িকী ‘দ্য উইক’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, বিএনপির দলীয় সংস্কার এবং প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন।
সাক্ষাৎকারে ভারতের সঙ্গে অনিষ্পন্ন বিভিন্ন ইস্যুর মধ্যে পানি–বণ্টন, সীমান্তে হত্যা বন্ধ এবং বাণিজ্য বৈষম্য কমানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন মির্জা ফখরুল। দ্য উইকের সিনিয়র অ্যাসোসিয়েট এডিটর নম্রতা বিজি আহুজা যখন জানতে চান, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়ছে—এ অবস্থায় কোন কোন বিষয় দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে, এর জবাবে তিনি তিনটি বিষয়কে সামনে আনেন। প্রথমত, শুধু আলোচনা নয়, আন্তরিক ও কার্যকর সমাধানের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের পানি–বণ্টন সংকট মেটাতে হবে; দ্বিতীয়ত, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড অবশ্যই বন্ধ করতে হবে, কারণ ‘কোনো সভ্য সমাজেই এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না’; তৃতীয়ত, বাণিজ্যে বিদ্যমান বৈষম্যগুলোকে ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাধান করতে হবে। সাম্প্রতিক ক্রিকেট–সংকটকে তিনি ‘দুর্ভাগ্যজনক এবং অপ্রয়োজনীয়’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি দুই দেশের জনমনে অযথা প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে, যা সার্বভৌমত্ব, আত্মসম্মান ও পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। খালেদা জিয়ার শোকের সময় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের ঢাকা সফরকে তিনি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছেন।
দ্য উইকের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার ‘ফ্যাক্টর’ ভবিষ্যতে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে কতটা গুরুত্বপূর্ণ থাকবে—এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, শেখ হাসিনা নিঃসন্দেহে একটি ফ্যাক্টর, তবে তা অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। তাঁর মতে, শেখ হাসিনা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে এবং সব ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করে বর্তমান সংকটের জন্ম দিয়েছেন। দীর্ঘ মেয়াদে তিনি আর রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক থাকবেন না বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ভারত–বাংলাদেশের সম্পর্ককে শেখ হাসিনার ঊর্ধ্বে উঠে, জনগণের স্বার্থ ও ভবিষ্যৎকে সামনে রেখে এগিয়ে নিতে হবে।
ছাত্রদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)–র সঙ্গে বিএনপি শেষ পর্যন্ত কেন জোটে যায়নি—এ প্রশ্নের উত্তরে বিএনপি মহাসচিব জানান, আলাপ–আলোচনা সত্ত্বেও আসনে সমঝোতা সম্ভব হয়নি। এনসিপি অনেক বেশি আসন দাবি করেছিল, যা বিএনপির পক্ষে ছাড় দেওয়া বাস্তবসম্মত ছিল না। তিনি বলেন, ঐ সব আসনে বিএনপি তাদের প্রার্থীদের জয়ের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী; কিন্তু একেবারে নতুন প্রতীকে এনসিপির প্রার্থীরা সেই পর্যায়ের জনসমর্থন পাবে কি না, সে বিষয়ে সন্দেহ ছিল। বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতিতে দলীয় প্রতীকের গুরুত্ব যে কতটা বেশি, তা উল্লেখ করে তিনি ব্যাখ্যা করেন, এ কারণেই সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি।
১৯৭১ সালের গণহত্যার অমীমাংসিত প্রশ্ন এখনো ঝুলে থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ কি পাকিস্তানের প্রতি অতিরিক্ত নরম আচরণ করছে—দ্য উইকের এমন প্রশ্নে মির্জা ফখরুলের জবাব ছিল স্পষ্ট। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের গণহত্যার জন্য পাকিস্তানকে অবশ্যই আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইতে হবে; এ বিষয়ে বিএনপির অবস্থান সুস্পষ্ট এবং এতে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।
জাতীয় নির্বাচনে নিজেদের জয়ের সম্ভাবনা প্রসঙ্গে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভোটাররা এখন তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেতে উদগ্রীব; দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও দমন–পীড়নের অভিজ্ঞতা থেকে তারা মুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচনের একটি বাস্তব বিকল্প চায়। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে ভবিষ্যতে কোনো জোট বা সরকার–গঠনের সমীকরণ থাকবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি সরাসরি ‘না’ বলেন। তাঁর ভাষায়, যদি বিএনপি সরকার গঠন করতে পারে, তাহলে শুধুমাত্র আন্দোলনের সঙ্গী দলগুলোকে নিয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গড়ে তোলার পরিকল্পনা তাদের আছে, যেখানে জামায়াতে ইসলামীর থাকার কোনো সুযোগ নেই।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং তাঁর ঘোষিত ‘৩১ দফা’ সংস্কার এজেন্ডা নিয়েও কথা বলেন মির্জা ফখরুল। তিনি জানান, এই সংস্কার কর্মসূচি বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি করেছে। বিএনপির যে ভবিষ্যৎ রূপরেখা তারা তুলে ধরছেন, তার মধ্যে আছে—প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদকে সর্বোচ্চ দুই টার্মে সীমিত করা, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং দেড় বছরের মধ্যে এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি। তাঁর দাবি, এই এজেন্ডাই প্রমাণ করে বিএনপি কেবল ক্ষমতা পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রপরিচালনায় কাঠামোগত পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে সামনে এগোতে চায়।

































