রাজনীতির ভাষা, কৌশল ও ক্ষমতার ভারসাম্য আমূল বদলে দিয়েছে ‘ডিজিটাল বিপ্লব’। একসময় রাজনৈতিক প্রচারণা বলতে বোঝানো হতো মাঠে-ময়দানে সভা, পোস্টার, দেয়াললিখন কিংবা টেলিভিশন ও পত্রিকার বিজ্ঞাপন। কিন্তু গত এক দশকে ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার (বর্তমানে এক্স) ও টিকটক রাজনৈতিক যোগাযোগের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
ফলে নির্বাচনী মাঠে প্রার্থীদের বক্তব্য, আচরণ এমনকি ব্যক্তিগত মুহূর্তও এখন এই প্ল্যাটফর্মগুলোর কড়া নজরদারিতে রয়েছে। সামান্য অসাবধানতা, অসংলগ্ন মন্তব্য বা অশোভন আচরণ মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে তীব্র সমালোচনা ও ট্রোলিংয়ের মুখে পড়ছে প্রার্থীরা। একদিকে কেউ কেউ পরিস্থিতি সামাল দিতে সংযম ও নীরবতার কৌশল বেছে নিচ্ছেন, অন্যদিকে অনেকেই উত্তেজিত প্রতিক্রিয়ায় পরিস্থিতি জটিল করে ফেলছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বর্তমান রাজনীতিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সহায়ক নয়, বরং নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। প্রার্থীরা কী বলবেন, কীভাবে বলবেন, কখন বলবেন—প্রায় সবকিছুই এখন অনেকাংশে অনলাইন প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভরশীল।
ডাকসু নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য ভাইরাল
সম্প্রতি বরগুনা-২ আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী ডা. সুলতান আহমেদের নির্বাচনী জনসভায় বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া ইউনিয়নের কাটাখালি এলাকায় দলের বহিষ্কৃত সহকারী সেক্রেটারি মো. শামীম আহসান উচ্ছৃঙ্খল, বিদ্বেষমূলক ও মানহানিকর বক্তব্য দেন। তিনি দাবি করেন, "একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ছিল মাদকের আড্ডা ও বেশ্যাখানা।"
এই বক্তব্যের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এলাকায় জামায়াতের পোস্টার ছেঁড়া হয়েছে, কর্মীরা নানা প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। প্রার্থী ডা. সুলতান আহমেদ কয়েকদিন প্রকাশ্যে আসতে পারেননি। নির্বাচনী কর্মী জানান, এই ঘটনা তাদের প্রচারণায় বড় ধাক্কা।
নাসির পাটোয়ারীর অসংলগ্ন বক্তব্য
ঢাকা-৮ আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী প্রচারণা শুরুতেই বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে কঠোর নিশানা করেন। তার অসংলগ্ন বক্তব্যের ছোট ছোট ভিডিও ক্লিপ দ্রুত ভাইরাল হয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য ও কটূক্তির জন্ম দেয়। এই ভিডিওগুলো তার ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি নয়, পুরো নির্বাচনী প্রচারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
বিপরীতে মির্জা আব্বাস তুলনামূলকভাবে সংযত অবস্থান নিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে ব্যঙ্গচিত্র, মিম ও সম্পাদিত ভিডিও ছড়ানো হলেও তিনি তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি। একাধিক নির্বাচনী সভায় তিনি বলেছেন, "সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন দেখি না। অনলাইন বিতর্কে না জড়িয়ে সরাসরি জনগণের সঙ্গে কথা বলতে চাই।"
তবে তার ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, অনলাইন সমালোচনার প্রভাব মাঠেও পড়েছে। ভোটারদের সঙ্গে আলোচনায় এসব প্রসঙ্গ বারবার উঠছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কার্যত প্রার্থীদের জন্য ‘ধৈর্যের পরীক্ষা’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন অনানুষ্ঠানিক আদালত—যেখানে অভিযোগ ওঠে, রায় হয় এবং শাস্তি কার্যকর হয় খুব দ্রুত।
এআই ও ভুয়া কনটেন্টের বিস্তার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে ভুয়া ছবি-ভিডিও নির্বাচনী মাঠে বিষাক্ততা ছড়াচ্ছে। ফ্যাক্ট চেকার মেহেদী হাসান আকাশ বলেন, "সম্প্রতি বিএনপির বিরুদ্ধে ছড়ানো একটি ছবি সম্পূর্ণ এআই জেনারেটেড। আলাদা ছবি ও হোটেলের দৃশ্য কৃত্রিমভাবে যুক্ত করা হয়েছে।"
সাধারণ নির্বাচনী প্রচারণার ভিডিওতে পরে ভুয়া ভয়েসওভার যুক্ত করে ‘চাঁদাবাজ’ স্লোগান শোনানো হচ্ছে। জাইমা রহমানের নামে এআই ভিডিওতে জন্মদিনে ২০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রলোভন দেখানো হয়েছে। ‘উত্তরবঙ্গ টেলিভিশন’ পেজ থেকে জামায়াতের পক্ষে ৩৫টি এআই ভিডিও ছড়ানো হয়েছে।
জামায়াত আমিরের এক্স পোস্ট কেলেঙ্কারি: গত ৩১ জানুয়ারি এক্সে জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে পোস্ট হয়, "আধুনিকতার নামে নারীদের ঘরের বাইরে ঠেলে দেওয়া হলে তারা শোষণ ও পতিতাবৃত্তির মুখে পড়ে।" তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর জামায়াত দাবি করে অ্যাকাউন্ট হ্যাক হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের প্রমাণ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে জামায়াত।
রিউমার স্ক্যানারের উদ্বেগজনক তথ্য
২০২৫ সালে রাজনীতি বিষয়ক ২,২৮১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। জানুয়ারি মাসেই ৫৭৭টি, যার ৪৬৯টি রাজনৈতিক (৮১%)। ফেসবুকে ৫২৯টি ছড়িয়েছে। বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে সমান অপতথ্য (২৩৮টি করে)। এআই কনটেন্ট ১৪১টি, যার ১১টি ডিপফেক। গণমাধ্যমের নামে ভুয়া ফটোকার্ড বেড়েছে।
তারেক রহমানের পায়ে বসা রাকিবের ছবি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়েছে। বিভিন্ন প্রার্থীর অর্থ বিতরণের ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে—কোথাও সত্যি, কোথাও পুরোনো ছবি।
ভুয়া জরিপে ভোটার বিভ্রান্তি
আল-জাজিরা, বিবিসি, রয়টার্সের নামে ভুয়া জরিপ ছড়ানো হচ্ছে। জুলাই-অক্টোবরে ১৮টি ফ্যাক্টচেক প্রকাশিত হয়েছে। রিউমার স্ক্যানারের জরিপে শিক্ষার্থীদের ৪৭% বলছেন, অপতথ্য বিভাজন-সহিংসতা উস্কে দেয়। ৭০% ইসির ভূমিকায় অসন্তুষ্ট।
ইসি উদ্বিগ্ন কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেই
প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন এআই অপপ্রচারে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে ইসির কাজ সীমিত পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিং সেলে আটকে আছে। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশে এআই দিয়ে বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট নিষিদ্ধ হলেও কেউ শাস্তি পায়নি।
নারী প্রার্থীদের দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ
নারী প্রার্থীরা কম খরচে ভোটারদের কাছে পৌঁছালেও অনলাইন হয়রানি ও লিঙ্গবিদ্বেষের শিকার হচ্ছেন। নারীপক্ষের জাহানারা খাতুন বলেন, "অনলাইন সহিংসতা নারীদের আত্মসংযমী করে তুলছে।"
মনোবিশেষজ্ঞ মনিরা রহমান: "অনলাইন অবমাননা শুধু রাজনৈতিক শালীনতা নয়, গণতান্ত্রিক চর্চাকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।"
বিশ্লেষক ড. লিপিকা বিশ্বাস: "ডিজিটাল যুগে নির্বাচন মানেই ভাইরাল কনটেন্ট। মিথ্যা তথ্য ভোটার ও প্রার্থীদের উভয়কেই ক্ষতি করছে। দলগুলো ফ্যাক্ট-চেক করে মিথ্যা তথ্যের খণ্ডন করবে এবং নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে হবে।"
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ৮ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর মধ্যে ৭০% সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় কিন্তু তথ্য যাচাইয়ে অভ্যস্ত নয়। একটি মিথ্যা ভিডিও কোটি মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। সোশ্যাল মিডিয়া গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য হুমকি না হয়ে সুযোগ হতে হলে সচেতনতা ও জবাবদিহি জরুরি।






































