বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন আওয়ামী লীগ সমর্থকরা


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ০২:০০ পিএম
বিএনপির দিকে ঝুঁকছেন আওয়ামী লীগ সমর্থকরা

আর মাত্র এক দিন পার হলেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচন ঘিরে ভোটের মাঠে এখন চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ আর নানা হিসাব-নিকাশ। মাঠের প্রধান দুই দল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী ভোটারদের নিজের শিবিরে টানতে নানা কৌশল নিয়ে কাজ করছে। এক্ষেত্রে দুই দলের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে ভোটের মাঠে না থাকা আওয়ামী লীগের বিপুলসংখ্যক কর্মী ও সমর্থক।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকার জন্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারেনি আওয়ামী লীগ। দলটির শীর্ষ নেতারাও দেশছাড়া। অনেকে রয়েছেন কারাবন্দি। এ অবস্থায় মাঠে থাকা আওয়ামী সমর্থক ভোটাররা নিজেদের নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ এবং স্থানীয় বাস্তবতা মিলিয়ে ও টিকে থাকার জন্য আস্থার জায়গা খুঁজে ভোট দেওয়ার চিন্তা করছেন।

তৃণমূলে আওয়ামী সমর্থকদের সক্রিয়তা
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নির্বাচন বর্জনের আহ্বান উপেক্ষা করে তৃণমূলের বড় অংশ ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছে। কোথাও বিএনপি বা জামায়াত প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণা, কোথাও স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন করছেন তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের মাঠে থাকা আওয়ামী কর্মী-সমর্থকদের অংশগ্রহণ বিশ্লেষণে মনে হচ্ছে, তাদের একটি বড় অংশই এবার বিএনপির দিকে ঝুঁকছে। তাই বলে জামায়াত যে আওয়ামী লীগের ভোট একেবারেই পাবে না, তা নয়। তবে আওয়ামী কর্মী-সমর্থকদের যারাই ভোটের মাঠে যাবে, তাদের একটি বড় অংশ বিএনপিকে ভোট দেবে। বিভিন্ন সংস্থা থেকে করা একাধিক জরিপেও আওয়ামী সমর্থকদের একটি বড় অংশ এবার বিএনপিকে ভোট দেবে বলে উঠে এসেছে।

বিএনপির দিকে ঝোঁকার কারণ
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারের ভোটের লড়াইয়ে মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুটি নতুন করে সামনে এসেছে। বিএনপি এ ইস্যুটি সামনে এনেছে। এর পেছনে নির্বাচনী কৌশল জড়িয়ে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিনের বিতর্কের বিষয়। তবে বিএনপি নিজেদের বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে এসেছে। অন্যদিকে, আওয়ামী সমর্থক ভোটারদের কাছেও আবেগের জায়গা মুক্তিযুদ্ধ।

তারা আরও বলছেন, শেখ হাসিনার সরকারের পতনে নেতৃত্ব দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা, যারা পরে এনসিপি গঠন করেন। স্বভাবতই আওয়ামী লীগের সমর্থকদের সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ এনসিপির প্রতি। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ দাবিতে সোচ্চার ছিল জামায়াত, এনসিপিসহ অন্য দলগুলো। পরে গত বছর মে মাসে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করে সরকার। তখন বিএনপি এক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করে।

বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার পক্ষে ছিল না। গত জানুয়ারিতে টাইম ম্যাগাজিনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাইরে রাখার বিষয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি কোনো মন্তব্য না করলেও নীতিগতভাবে তিনি কোনো দল নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন বলে জানান।

এছাড়া রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর পদত্যাগের দাবিতে যখন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীসহ বেশ কয়েকটি সংগঠনের নেতাকর্মীরা আন্দোলনে নামে, সে সময় বিএনপি রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিরোধিতা করে। বিশ্লেষকদের মতে, বেশকিছু ক্ষেত্রে বিএনপির এমন অবস্থানের কারণে আওয়ামী সমর্থক ভোটারদের একটি অংশ তাদের প্রতি তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছে।

আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে আওয়ামী লীগ লাভবান হবে এবং তারা দ্রুত রাজনীতিতে ফিরতে পারবেন। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। সরকার পতনের ঠিক আগে জামায়াতকে নিষিদ্ধ করা হয়। জামায়াতকে শত্রু হিসেবেই বিবেচনা করে আওয়ামী লীগ।

মাঠপর্যায়ে প্রচারণায় আওয়ামী নেতারা
চলতি মাসের শুরুতে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহপ্রচার সম্পাদক সুনন্দন দাস রতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের বিএনপির প্রার্থী মেজর জেনারেল (অব.) শরীফ উদ্দীনের পক্ষে ভোট চাচ্ছেন।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি বিকেলে আওয়ামী লীগের সাবেক ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমানের মালিকানাধীন এনাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ডা. এবং তার স্ত্রী রৌশন আরা লাভলী ও শ্যালক সাইফুল ইসলামকে ঢাকা-১৯ (সাভার-আশুলিয়া) আসনের বিএনপি প্রার্থী ডা. দেওয়ান সালাউদ্দিন বাবুর পক্ষে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।

৫ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী-৪ আসনে বাগমারা উপজেলায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. আব্দুল বারীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোয় আওয়ামী লীগ নেতা মহিদুল ইসলাম ও তেলিপুকুর গাঙ্গোপাড়া বাজারে এনামুল হককে মারধর করা হয়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা সাতক্ষীরায় একাধিক নির্বাচনী আসনে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অনেকেরই দেখা মিলছে জামায়াত প্রার্থীর প্রচারণায়।

অর্থাৎ সারাদেশে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্বাচনী মাঠে থাকার বিষয়টি এখন স্পষ্ট। সরাসরি ভোটে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকরা অনেক আসনের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে—সেটিও এখন পরিষ্কার।

বিশেষজ্ঞদের মতামত
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, বিএনপি ও জামায়াত কোনোটাই আদর্শিক জায়গা থেকে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যায় না। কিন্তু তারপরও আওয়ামী কর্মী-সমর্থকরা ভোট দিতে যাবেন। তাহলে ভোট কাকে দেবেন? হয় ইসলামপন্থিদের দিতে হবে, নইলে সেক্যুলারদের কাছাকাছি আছে, এমন কাউকে দিতে হবে। এ অবস্থায় তারা মধ্যপন্থি হিসেবে বিএনপিকে অধিকতর পছন্দ করবে।

তিনি আরও মনে করেন, আওয়ামী লীগের আদর্শিক লড়াইটা মূলত জামায়াতের সঙ্গে। ভবিষ্যতেও তাদের সেই লড়াই করতে হবে। সে কারণে টিকে থাকার জন্য মধ্যপন্থা হিসেবে আওয়ামী কর্মী-সমর্থকরা বিএনপিকেই বেছে নেবে। তবে ৫ আগস্টের পর যেসব নেতাকর্মীকে জামায়াত শেল্টার দিয়েছে, তারা হয়তো জামায়াতকে ভোট দিতে পারে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ভোটার তার পছন্দের দলকে ভোট দেবে, সে আওয়ামী লীগ হতে পারে, বিএনপি হতে পারে জামায়াত বা অন্য যেকোনো দল। সবচেয়ে বড় রেজাল্ট হচ্ছে ভোটের দিন ভোট প্রয়োগ করার পরে যখন এটা রেজাল্ট প্রকাশ হবে তখন।

জরিপে আওয়ামী ভোটের গন্তব্য
দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসন থেকে ৪১ হাজার ৫০০ জনের মতামত নিয়ে এমিনেন্স অ্যাসোসিয়েটস ফর সোশ্যাল ডেভেলপমেন্টের (ইএএসডি) করা এক জাতীয় জনমত জরিপের তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগের সমর্থনকারীদের মধ্যে যারা ভোট দিতে যাবেন, তাদের ৮০ শতাংশই বিএনপিকে ভোট দেবেন। বিপরীতে জামায়াত জোট পাবে মাত্র ১৫ শতাংশ ভোট।

জরিপের সামগ্রিক ফলে দেখা যায়, ৬৬ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটারের পছন্দ বিএনপি। নারী ভোটারদের মধ্যে বিএনপির জনপ্রিয়তা আরও বেশি—৭১ দশমিক ১ শতাংশ। আঞ্চলিক বিশ্লেষণে চট্টগ্রামে ৭৬ দশমিক ৮ শতাংশ এবং সিলেটে ৭৫ দশমিক ৬ শতাংশ সমর্থন নিয়ে বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে।

কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন (সিআরএফ) এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপেনিয়ন স্টাডিজের যৌথ জরিপে দেখা গেছে, আগে আওয়ামী লীগকে ভোট দিতেন এমন ভোটারদের ৪৭ দশমিক ৯ শতাংশ বা প্রায় ৪৮ শতাংশ এখন বিএনপিকে পছন্দ করছেন। ২৯ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার জামায়াতকে এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার এনসিপিকে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছেন। গত ৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে জরিপের এই তথ্য তুলে ধরা হয়। সারাদেশের ১১ হাজার ৩৮ জন ভোটারের মধ্যে স্তরভিত্তিক দ্বৈবচয়ন পদ্ধতিতে এই জরিপ করা হয়।

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!