দেশের মোট সংসদীয় আসনগুলোর মধ্যে ৭৮টিতে বিএনপির বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন। বলা হচ্ছে, এসব আসনে দলীয় প্রার্থীরা চাপে থাকবেন। কিন্তু এর মধ্যে ৩৮টি আসন পাওয়া গেছে, যেগুলো বিএনপির বিদ্রোহী কিংবা দলীয় উভয় প্রার্থীর জন্যই চাপের কারণ।
সর্বশেষ অংশ নেওয়া ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি এসব আসনের ৩৫টিতে জিততেই পারেনি। প্রতিবারই জয়ী হয়েছেন বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কিংবা জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থীরা। বিএনপি জিতেছিল ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে। কিন্তু তা একটানা ছিল না।
দোদুল্যমান আসনে কঠিন পরীক্ষা
নির্বাচনগুলোর ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১৯৯৬ সালে এসব আসনের অধিকাংশে হারলেও ২০০১ সালে জিতেছে। আবার ১৯৯৬ সালে জেতা আসনে ২০০১ সালে হেরেছে। ফলে দোদুল্যমান এসব আসন এবারের নির্বাচনেও বিএনপির দলীয় ও বিদ্রোহীদের জন্য কঠিন পরীক্ষার ক্ষেত্র হতে পারে।
সম্প্রতি দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে ১৬৭টির তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছে সমকাল। এর মধ্যে বিএনপির বিদ্রোহী সংবলিত ওই ৩৮টি আসন পাওয়া গেছে। আসনগুলোর মধ্যে কেবল একটিতে (সিলেট-৫) বিএনপি ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রার্থী দেয়নি। শুধু ২০১৮ সালে প্রার্থী ছিল না আটটিতে।
১৯৯৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত (২০১৪ বাদে) নির্বাচনগুলোতে ভোট প্রাপ্তিতে এসব আসনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল আওয়ামী লীগ। তৃতীয় স্থানে ছিল জাতীয় পার্টি। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে এই ৩৮টি আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা ভোট পেয়েছিলেন সর্বনিম্ন দুই হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার পর্যন্ত।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি ও ভোটের ভাগাভাগি
এবার আওয়ামী লীগ না থাকায় তাদের সমর্থকদের ভোট অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে ভাগাভাগি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য এই ভোটের ভাগাভাগিতে ৩৮টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহীরা কৌশলেও পরিণত হতে পারেন।
আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট কোন দলে যাবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। কিন্তু বিএনপির দলীয় প্রার্থীর পাশাপাশি বিদ্রোহীরাও আসনের মোট প্রদত্ত ভোটে ভাগ বসালে অন্য কোনো দলের পক্ষে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট এককভাবে পাওয়ার সম্ভাবনা কম বললেই চলে। এই ভাগাভাগিতে কোথাও বিদ্রোহীরা জয়ের দিকে এগিয়ে গেলে সেটি পরোক্ষভাবে বিএনপিরই আসন পুনরুদ্ধার হিসেবে গণ্য হবে।
বিদ্রোহীদের ক্ষেত্র ও চিত্র
৩৮টির মধ্যে কেবল এক উপজেলা নিয়ে গঠিত এমন ১৬টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। জামায়াতের একটিও নেই। আর দুই উপজেলাবিশিষ্ট আসনের ১৯টিতে বিদ্রোহীদের সঙ্গে ভোট ভাগাভাগি করবেন বিএনপির দলীয় প্রার্থীরা। জামায়াতের ক্ষেত্রে এমন আসন মাত্র একটি। তিন উপজেলাকেন্দ্রিক তিনটি আসনে বিদ্রোহীদের সামলাবে বিএনপি।
এই ৩৮টির মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিদ্রোহী ঢাকা বিভাগে ১২টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ময়মনসিংহে আটটি। জামায়াতের বিদ্রোহী প্রার্থী আছে কেবল এক উপজেলাকেন্দ্রিক ময়মনসিংহ-৬ আসনে।
ময়মনসিংহ-৬: দ্বৈত বিদ্রোহের জটিলতা
২০০১ সালের নির্বাচনে ময়মনসিংহ-৬ আসনে বিএনপির নিজস্ব প্রার্থী ছিল না। দলটির নেতৃত্বাধীন জোটের হয়ে মনোনয়ন পেয়েছিলেন জামায়াতের জসিমউদ্দিন। কিন্তু জোটের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে গিয়ে প্রার্থী হন বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার শামসুদ্দিন। প্রাপ্ত ভোটের হিসাবে জামায়াতের প্রার্থী তৃতীয় হন, আওয়ামী লীগের মোছলেম উদ্দিন দ্বিতীয় এবং প্রথম হন স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী শামসুদ্দিন।
এবার আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াত উভয় দলের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে। বিএনপির দলীয় ও উপজেলা শাখার আহ্বায়ক আখতারুল আলমের বিদ্রোহী হয়েছেন উপজেলা মহিলা দলের সাবেক সভাপতি আখতার সুলতানা। তিনি সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার শামসুদ্দিন আহমেদের স্ত্রী। অপরদিকে জামায়াতের কামরুল হাসানের বিদ্রোহী হয়েছেন জেলা শাখার বহিষ্কৃত আমির জসিম উদ্দিন। ফলে আসনটির চার লাখ ১২ হাজার ৮৪৩টি ভোটে ভাগ বসাতে পারেন সম্ভাব্য মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর দুই বিদ্রোহী।
সিলেট-৫: জোট রাজনীতির জটিলতা
দুই উপজেলাকেন্দ্রিক আসনগুলোর মধ্যে সিলেট-৫ (কানাইঘাট, জকিগঞ্জ)-এ বিএনপি জোটের পক্ষে জামায়াত ২০০১ সালে জয়ী হয়েছিল। দলটির ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী পেয়েছিলেন ৭৭ হাজার ৭৫০ ভোট। আওয়ামী লীগের হাফিজ আহমেদ মজুমদার ৫২ হাজার ৮৮৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয় হন। বিএনপি কেবল ১৯৯৬ সালে প্রার্থী দিয়েছিল। সেবার দলটির মনোনীত এম এ মতিন চৌধুরীর অবস্থান ছিল সপ্তম। মোট প্রদত্ত এক লাখ ১৯ হাজারের মধ্যে পেয়েছিলেন মাত্র চার হাজার ৮৬০ ভোট।
এবার বিএনপি আসনটি শরিক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কাছে ছেড়ে দিয়েছে। তাদের প্রার্থী উবায়দুল্লাহ ফারুক। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রদত্ত দুই লাখ ৪০ হাজারের মধ্যে ৮৬ হাজার ভোট পেয়ে দলটি দ্বিতীয় হয়েছিল। প্রথম হওয়া আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট ছিল এক লাখ ৩৯ হাজার ৭৩৫টি। বিএনপি জোটের বিদ্রোহী হয়েছেন জেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সহসভাপতি মামুনুর রশীদ (চাকসু মামুন)। অপরদিকে জামায়াতও এ আসনটি তাদের জোটসঙ্গী খেলাফতে মজলিসকে ছেড়ে দিয়েছে। তাদের প্রার্থী আবুল হাসান। ফলে ইসলামপন্থি দলগুলোর বিপরীতে বিএনপির বিদ্রোহী নিজেই চাপে থাকতে পারেন।
পিরোজপুর-২: জাতীয় পার্টির শক্ত ঘাঁটি
১৯৯৬-পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে বিএনপি একবারও জেতেনি এমন আসন পিরোজপুর-২ (ভান্ডারিয়া, কাউখালী, নেছারাবাদ)। আসনটিতে তিনবার জিতেছেন জাতীয় পার্টির (মঞ্জু) আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। আওয়ামী লীগ কেবল একবার জিতেছিল ২০০৮ সালে। বিএনপির অবস্থান বেশির ভাগ সময়ই দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল। এবার তাদের দলীয় ও বিদ্রোহী প্রার্থীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে জাতীয় পার্টির (জেপি) মাহিবুল হোসেন ও জামায়াতের শামীম সাঈদীর (দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে) বিপক্ষে। ফলে বিএনপির দলীয় কিংবা বিদ্রোহী উভয়ের জন্যই এ আসনে চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে।
বিদ্রোহী সংবলিত আসনগুলো
এক উপজেলাভিত্তিক আসনগুলোতে বিএনপির বিদ্রোহী রয়েছে নোয়াখালী-৬, কুমিল্লা-৭, নারায়ণগঞ্জ-১, নারায়ণগঞ্জ-২, নারায়ণগঞ্জ-৩, নারায়ণগঞ্জ-৪, টাঙ্গাইল-৩, টাঙ্গাইল-৪, টাঙ্গাইল-৫, কুষ্টিয়া-১, ময়মনসিংহ-৩, ময়মনসিংহ-৬, ময়মনসিংহ-৭, ময়মনসিংহ-৯, ময়মনসিংহ-১০ এবং নাটোর-৩ আসনে।
দুই উপজেলাভিত্তিক আসনগুলোতে বিএনপির বিদ্রোহী রয়েছে হবিগঞ্জ-১, হবিগঞ্জ-৪, সিলেট-৫, পিরোজপুর-২, পটুয়াখালী-৩, বরিশাল-১, নোয়াখালী-২, কুমিল্লা-২, মানিকগঞ্জ-৩, কিশোরগঞ্জ-১, কিশোরগঞ্জ-৫, নেত্রকোনা-৩, ময়মনসিংহ-১, ময়মনসিংহ-২, পঞ্চগড়-২, নীলফামারী-৪, রাজশাহী-৫, নাটোর-১ ও পাবনা-৪ আসনে।
তিন উপজেলাবিশিষ্ট আসনগুলোর মধ্যে রাজবাড়ী-২, মানিকগঞ্জ-১ ও পাবনা-৩ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী রয়েছে।






























