নির্বাচনে ভোট দিতে যা জানা জরুরি


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৩:০৪ পিএম
নির্বাচনে ভোট দিতে যা জানা জরুরি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এসেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এবারের নির্বাচনে একটি নয়, দিতে হবে দুটি ভোট। সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার পাশাপাশি ভোটাররা দেবেন গণভোটও। নির্বাচনী ব্যালটে যেখানে বিভিন্ন দলের প্রতীক থাকে, সেখানে গণভোটে থাকবে দুটি অপশন—'হ্যাঁ' অথবা 'না'। এই ভোটের মাধ্যমে ভোটাররা তাদের মত জানাবেন।

ভোট দেওয়া শুধু ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের বিষয় নয়; এটি দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। নতুন ভোটারদের কাছে এই অভিজ্ঞতা যেমন আনন্দের, তেমনি দায়িত্বেরও। নাগরিক অধিকার প্রয়োগের এই মুহূর্তকে অর্থবহ করতে হলে আগে থেকেই কিছু বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন।

ভোটার আইডি যাচাই করুন
ভোট দিতে হলে অবশ্যই ভোটার তালিকায় আপনার নাম থাকতে হবে এবং সঙ্গে রাখতে হবে জাতীয় পরিচয়পত্র বা ভোটার স্লিপ। তাই ভোটের দিন যাওয়ার আগে তালিকায় নাম আছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট বা হটলাইনে যোগাযোগ করে নিজের নাম ও ভোটকেন্দ্র সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। জাতীয় পরিচয়পত্র হারিয়ে গেলেও ভোটার স্লিপ দিয়ে ভোট দেওয়া সম্ভব, তবে উভয়ের যেকোনো একটি অবশ্যই সঙ্গে রাখতে হবে।

প্রার্থীদের সম্পর্কে জানুন
ভোট দেওয়ার আগে প্রার্থীদের কর্মসূচি, নীতিমালা ও আগের কাজকর্ম সম্পর্কে ধারণা নেওয়া জরুরি। শুধু পরিচিতি বা জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর না করে নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রিন্ট মিডিয়ার তথ্য যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই শ্রেয়। প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহার পড়ুন এবং তাদের অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করুন। কোন প্রার্থী আপনার এলাকার উন্নয়নে কী ধরনের পরিকল্পনা রেখেছেন, তা জানা থাকলে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সুবিধা হবে। মনে রাখবেন, আপনার একটি ভোটই পারে দেশের গতিপথ পরিবর্তন করতে।

ভোটকেন্দ্রে যা নিয়ে যাবেন
ভোটকেন্দ্রে যেতে অতিরিক্ত কিছু প্রয়োজন নেই। জাতীয় পরিচয়পত্র বা ভোটার স্লিপ থাকলেই যথেষ্ট। অপ্রয়োজনীয় জিনিস, বড় ব্যাগ বা স্মার্টফোন সঙ্গে না নেওয়াই ভালো। তবে প্রয়োজনে পানির বোতল নেওয়া যেতে পারে, বিশেষত যদি লম্বা লাইনে দাঁড়াতে হয়। ভোটকেন্দ্রে কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যাজ, স্টিকার বা পোশাক পরা নিষিদ্ধ। সাদামাটা পোশাক পরে যাওয়াই উত্তম। বয়স্ক বা প্রতিবন্ধী ভোটারদের সঙ্গে একজন সহায়ক থাকতে পারেন, তবে তাকেও নিয়ম মেনে চলতে হবে।

ভোটের দিনের প্রস্তুতি
ভোটকেন্দ্র কোথায়, ভোটের সময়সূচি কী এবং কীভাবে সেখানে পৌঁছাবেন—এসব বিষয় আগে থেকেই পরিকল্পনা করে রাখলে ঝামেলা কমে। সাধারণত সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলে। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য যানবাহনের ব্যবস্থা আগেই করে রাখুন। সকাল বা দুপুরের দিকে ভোটকেন্দ্রে ভিড় কম থাকে, তাই ওই সময়ে গেলে কম অপেক্ষা করতে হবে। লাইনে দাঁড়ানোর নিয়ম বা কেন্দ্রের ভেতরে কী নেওয়া যাবে, তা জানা থাকলে চাপও কম অনুভূত হবে। মনে রাখবেন, ভোট শেষ হওয়ার সময়ের আগে লাইনে থাকলে আপনি ভোট দিতে পারবেন।

নিজের ভোটকেন্দ্র জেনে নিন
নির্ধারিত ভোটকেন্দ্রের অবস্থান আগে থেকেই নিশ্চিত করা জরুরি। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম বা স্থানীয় নির্বাচন অফিস থেকে কেন্দ্রের ঠিকানা ও সময়সূচি জেনে নেওয়া যায়। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর দিয়ে খুব সহজেই ভোটকেন্দ্র খুঁজে বের করা সম্ভব। এছাড়া মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমেও এই তথ্য পাওয়া যায়। এতে অযথা দেরি বা বিভ্রান্তি এড়ানো সম্ভব। ভুল ভোটকেন্দ্রে গেলে ভোট দেওয়া যাবে না, তাই এই বিষয়ে অবশ্যই সতর্ক থাকুন।

ভোটদানের প্রক্রিয়া
ভোটার যাচাই থেকে শুরু করে ভোট দেওয়ার প্রতিটি ধাপ সম্পর্কে ধারণা থাকলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। প্রথমে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হবে। নির্বাচনকর্মী আপনার পরিচয়পত্র যাচাই করে আপনার আঙুলে অদৃশ্য কালি দেবেন। এরপর আপনাকে ভোটিং বুথে নিয়ে যাওয়া হবে। ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) আপনার পছন্দের প্রার্থীর প্রতীকে বোতাম চাপতে হবে। এরপর গণভোটের জন্য আলাদা মেশিনে 'হ্যাঁ' বা 'না' ভোট দিতে হবে। ব্যালট পেপারের ক্ষেত্রে সিল মেরে ভোট দিতে হবে। ভোট দেওয়ার পর মেশিন বা ব্যালট বক্স থেকে সিল করা ব্যালট বের করে নির্ধারিত বক্সে ফেলতে হবে।

ভোটকেন্দ্রে ছবি তোলা নিষিদ্ধ
ভোট দেওয়ার পর বাইরে সেলফি তোলা গেলেও ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ছবি তোলা, ভিডিও করা বা সোশ্যাল মিডিয়ায় চেক-ইন দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফোন সঙ্গে থাকলে কেন্দ্রের ভেতরে ঢোকার আগে সেটি বন্ধ রাখতে হবে। এই নিয়ম ভঙ্গ করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। গোপন ভোটের নীতি রক্ষার জন্যই এই নিষেধাজ্ঞা। তবে ভোটকেন্দ্রের বাইরে 'আমি ভোট দিয়েছি' স্টিকার নিয়ে ছবি তোলা উৎসাহিত করা হয়, যা ভোটদানে অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।

গোপনীয়তা রক্ষা করুন
ভোট দেওয়ার সময় গোপনীয়তা বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আপনি কাকে ভোট দিচ্ছেন, তা সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। কেউ জোর করে জানতে চাইলে বা ভোট দিতে বাধ্য করলে তা আইনত অপরাধ। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন কর্মকর্তা বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করুন। ভোটিং বুথে শুধুমাত্র আপনি একা থাকবেন, কেউ আপনাকে দেখতে পারবে না। এই গোপনীয়তাই গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি।

সচেতনতাই মূল চাবিকাঠি
ভোট মানে শুধু একটি বোতাম চাপা বা সিল দেওয়া নয়—এটি নিজের মত প্রকাশ এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। সচেতনতা ও প্রস্তুতি থাকলে প্রথম ভোটের অভিজ্ঞতাও হয়ে উঠতে পারে আরও আত্মবিশ্বাসী ও অর্থবহ। মনে রাখবেন, আপনার ভোট আপনার কণ্ঠস্বর। এই অধিকার যথাযথভাবে প্রয়োগ করে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখুন। নির্বাচনে অংশগ্রহণ শুধু দায়িত্ব নয়, এটি গর্বেরও বিষয়। তাই আগামীকাল ভোটকেন্দ্রে যান এবং দেশের ভবিষ্যৎ গড়ায় আপনার ভূমিকা রাখুন।

Link copied!