বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার বাইরে উত্তর দিকে এগোচ্ছিল তারেক রহমানের বুলেটপ্রুফ প্রচারণা বাস। প্রতি কয়েক মাইল পরপর গাড়ির গতি কমানো হচ্ছিল যাতে অপেক্ষমাণ সমর্থকেরা তাকে কাছ থেকে দেখতে পারেন। রাজনীতিকের বহর সামনে যেতেই উল্লাসিত সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে সেলফি তুলতে থাকেন। পোশাক কারখানার জানালায় জড়ো হচ্ছিলেন নারী শ্রমিকেরা। চার ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রাপথজুড়ে ময়মনসিংহে পৌঁছানো পর্যন্ত ভিড়ের দিকে রাজকীয় ভঙ্গিতে হাত নাড়তে থাকেন তিনি। ফিরতি পথেও চার ঘণ্টার বেশিরভাগ সময় একইভাবে হাত নাড়ানোর কথা।
বিখ্যাত এক রাজনৈতিক পরিবারের উত্তরসূরি ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন তিনি। বিপ্লবের পর প্রথম নির্বাচন হিসেবে এটি গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের সুযোগ। ১৮ মাস আগে জেন-জি বিপ্লবে তরুণ বিক্ষোভকারীরা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের রক্তক্ষয়ী ও দুর্নীতিগ্রস্ত শাসনের অবসান ঘটায়। এতে আইনশৃঙ্খলা উন্নতি, বিনিয়োগকারীদের আশ্বাস এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের আশা জাগে। তবে বিপ্লবীরা যে ব্যাপক রাজনৈতিক সংস্কারের স্বপ্ন দেখেছিলেন, তা এই নির্বাচনে পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা কম।
২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আর কোনো প্রকৃত নির্বাচন হয়নি। ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের প্রায় ৪০% কখনো সত্যিকারের ভোট দেননি। ঢাকার থিংকট্যাংক বিআইপিএসএসের শাফকাত মুনির বলেন, ‘জীবনের দুই দশকে আমার ভোটের কোনো মূল্য ছিল না।’ এবার রাজধানীর সড়ক ব্যানারে ছেয়ে গেছে, নতুন বিধি মেনে সাদা-কালো রঙে। নির্বাচন তদারকি অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ দায়িত্ব, যা নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস পরিচালনা করছেন। অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করায় প্রশংসিত হলেও সংস্কার সীমিত। সরকার উচ্চকক্ষ গঠন ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছরে সীমাবদ্ধ করার প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা নির্বাচন দিনে গণভোটে আসবে। শিক্ষাবিদ আলী রিয়াজ বলেন, ‘সবাই প্রত্যাশা করেছিল দলগুলো চিৎকার করবে, কিন্তু সবাই সমর্থন দিয়েছে।’
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ, ছাত্র আন্দোলন একক শক্তি হয়নি। লাভবান বিএনপি ও জামায়াত। জামায়াত হাসিনার আমলে নিষিদ্ধ ছিল, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়। ৯০% মুসলিম দেশে ধর্মীয় মূল্যবোধ আকর্ষণীয়, কিন্তু শহুরে মধ্যবিত্তে আতঙ্ক। একজনও নারী প্রার্থী নেই, নারীদের কর্মঘণ্টা সীমিত করার বক্তব্য রয়েছে। সংসদে কখনো ১৮-এর বেশি আসন না পাওয়া দলটি দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের থমাস কিয়ান বলেন, ‘জামায়াতের সমর্থন ধর্মের জন্য নয়।’ তারা সংযত শাসনের দাবি করে, কিন্তু নীতিগুলো ব্যয়বহুল বলে সমালোচিত। এটি তারেক রহমানের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
জরিপে বিএনপি এগিয়ে। খালেদা জিয়া ও জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক, ১৯৯০-২০০০-এর দশকে ক্ষমতায় ছিলেন বিএনপি। ২০০৬-এর নির্বাচন কারচুপিতে সেনা হস্তক্ষেপ করে। তারেক মায়ের সরকারে ক্ষমতার কেন্দ্র ছিলেন। মার্কিন তারবার্তায় তাকে দুর্নীতিগ্রস্ত বলা হয়, ঘুস দাবির জন্য কুখ্যাত। হাসিনার আমলে মামলা হয়, তিনি লন্ডনে ১৭ বছর নির্বাসনে থাকেন। গত ডিসেম্বর দেশে ফিরে বিচারে সাজা বাতিল হয়। প্রচারণায় অতীত অস্বীকার করে বলেন, শেষ শাসনামলে দুর্নীতি দমন হয়েছে, হাসিনার মামলা সাজানো।
ক্ষমতায় গেলে বিনিয়োগে কর্মসংস্থান, তরুণদের বিদেশে প্রশিক্ষণ, ২০ হাজার কিমি খাল খনন, বছরে ৫ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দেন। ট্রাম্পের সঙ্গে বোঝাপড়া ভালো হবে বলে মনে করেন। বাকস্বাধীনতা, শৃঙ্খলা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোরতা এবং ২০২৪ বিপ্লব হত্যাকাণ্ডের বিচারের কথা বলেন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার নয় বলে আশ্বাস দেন। ব্যবসায়ী ও উদারপন্থীরা সমর্থন দিচ্ছেন, লন্ডন থেকে ফেরা তারেক আগের থেকে আলাদা বলে মনে হচ্ছে।
স্থানীয় বিশ্লেষক বলেন, বিকল্পগুলো আকর্ষণীয় নয়—হয় অগ্রগামী সরকার, নয় ‘হালকা তালেবান’। জামায়াতের উত্থান ও তারেকের দলীয় শক্তি নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ গঠন করবে।




































