নিপাহ ভাইরাস

খেজুরের রস নিয়ে ভয়, আসল ঝুঁকি কতটা?


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৭, ২০২৬, ০৩:০০ পিএম
খেজুরের রস নিয়ে ভয়, আসল ঝুঁকি কতটা?

রাজধানীর নদ্দা এলাকায় ফুটপাতে প্লাস্টিকের বোতলে ভর্তি খেজুরের রস বিক্রি হচ্ছে। বোতলের গায়ে হাতে লেখা ‘রাজশাহী থেকে আনা নিরাপদ রস’। বিক্রেতার সঙ্গে কথা বললে জানা গেল, সারাদিনে মাত্র ৪ লিটার রস বিক্রি হয়েছে। "এখনো ২৫ লিটার ফ্রিজে রাখা আছে," বলে হতাশ কণ্ঠে তিনি জানান। শুধু নদ্দা নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শীতকালে এই ঐতিহ্যবাহী পানীয় নিয়ে বিক্রেতারা ফুটপাতে বসছেন, কিন্তু আগের মতো বিক্রি জমছে না। কারণ একটাই—নিপাহ ভাইরাসের আতঙ্ক। শীতের ভোরে খেজুর গাছ থেকে সরাসরি রস খাওয়ার গ্রামবাংলার চেনা দৃশ্য এখন অনেক ক্ষেত্রে নীরব মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। জনমনে ছড়ানো নিপাহ ভাইরাসের আতঙ্ক সত্যি কতটা? এই ভাইরাস কি মহামারির আকার ধারণ করতে পারে? এই প্রশ্নগুলো স্বাভাবিকভাবেই উঠেছে।

২০০১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে নিপাহ সংক্রমণের ঘটনা ৩৪৭টি রেকর্ড হয়েছে, অর্থাৎ গড়ে বছরে প্রায় ১৫টি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, মৃত্যুহার প্রায় ৭২%। গত দুই বছরে সংখ্যা কমেছে: ২০২৪ সালে ২টি কেস (২ জন মৃত্যু), ২০২৫ সালে জানুয়ারি-আগস্টে ৪টি কেস (সবাই মৃত্যুবরণ করেন)। আইইডিসিআরবি জানায়, ২০২৩ সালে ১৪ জন আক্রান্তের মধ্যে ১০ জন মারা যান। উল্লেখ্য, সব ক্ষেত্রেই খেজুরের রস পানের ইতিহাস পাওয়া যায়নি। ২০২৫ সালে ৩৫ জেলায় ভাইরাস শনাক্ত, ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাটে সবচেয়ে বেশি। ২০২৪ সালে ভোলায়ও প্রথমবার সংক্রমণ দেখা দেয়।

নিপাহ ভাইরাসে কোনো টিকা বা ওষুধ নেই—প্রতিরোধই একমাত্র পথ। আইইডিসিআরবির সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, "খেজুরের রস ফুটিয়ে পান করুন। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ভাইরাস বাঁচতে পারে না। ফুটিয়ে ঠান্ডা করে খান, পিঠা বা গুড় বানান। কাঁচা রস কোনোভাবেই খাবেন না। বিক্রেতারা কাঁচা রস ফুটানো বলে বিক্রি করলে দায় কে নেবে?" লক্ষণ: প্রথমে সাধারণ জ্বর, দ্রুত মস্তিষ্ক প্রদাহ। চিকিৎসক বলছেন, আক্রান্তকে আলাদা রাখুন, উপসর্গ দেখা দিলে অবিলম্বে হাসপাতালে যান।

নিপাহর প্রধান বাহক ফলভুক বাদুড় (Pteropus species)। এরা অসুস্থ না হয়েও লালা, মূত্র বা মলের মাধ্যমে ভাইরাস ছড়ায়। রাতে খেজুর গাছের ঝুলানো হাঁড়িতে রস খাওয়ার সময় এগুলো মিশে যায়। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় বলা হয়েছে, কাঁচা রসে নিপাহ ছাড়াও রিওভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি রয়েছে। পরিবেশবিদ ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, "বন ধ্বংস, দ্রুত নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তন বাদুড়কে মানুষের কাছে নিয়ে আসছে। এটি প্রাণী থেকে মানুষে রোগ ছড়ানোর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।" জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ ড. এমএ আজিজ বলছেন, "শীতের খাদ্যাভাব, তাপমাত্রা হ্রাস ও আবাসসংকোচন বাদুড়ের ভাইরাস নিঃসরণ বাড়ায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৌসুমের বাইরেও সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। নিপাহ এখন বহুমুখী হুমকিতে পরিণত হচ্ছে।"

নিপাহ বাংলাদেশে ২০০১ সালে প্রথম শনাক্ত হয়। ডিসেম্বর-মে মাসে সংক্রমণ বেশি। ২০২৫ সালে অ-মৌসুমি কেস (আগস্টে নওগাঁয়) দেখা গেছে। আইইডিসিআরবি জানায়, ২০২৫ সালে ৪ জন আক্রান্তের সবাই মারা যান (মৃত্যুর হার ১০০%)। নিপাহ শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা নয়, পরিবেশগত সতর্কতার সংকেত। ঐতিহ্য রক্ষায় সতর্কতা অবলম্বন করাই একমাত্র পথ।

Link copied!