সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, যা প্রার্থীদের জনসভা, পথসভা ও দোয়ারে দোয়ারে প্রচারের পাশাপাশি ভোটারদের সঙ্গে সহজ যোগাযোগের সুযোগ দিচ্ছে। বাংলাদেশে ফেসবুক সবচেয়ে জনপ্রিয় এই মাধ্যম, যেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিজস্ব পেজ ও অ্যাকাউন্ট রয়েছে। কৌতূহলের বিষয় হলো, এই প্রার্থীদের মধ্যে ফেসবুকে কার অনুসারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রধান দলগুলোর নেতাদের মধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ফেসবুক পেজে ৫৬ লাখ অনুসারী রয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের পেজে ২৩ লাখ এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের পেজে ১২ লাখ অনুসারী। দলের প্রধান নেতাদের বাইরেও অনেক নেতা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর লাখ লাখ অনুসারী রয়েছে, যেমন স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারার অনুসারী ৭১ লাখেরও বেশি।
বিশ্লেষকদের মতামত
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারী বেশি থাকলে প্রচারে সুবিধা হয় এবং প্রার্থীর নিজস্ব পরিচিতি তৈরি করা সহজ হয়। তবে অনুসারীর সংখ্যা বেশি মানেই ভোটে সাফল্যের নিশ্চয়তা নেই; এটি কেবল একটি প্রচারের উপায় হিসেবে কাজ করে। ২০০৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বারাক ওবামা ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউবসহ সকল প্ল্যাটফর্মে প্রচার চালিয়ে ‘ইয়েস উই ক্যান’ ভিডিও ভাইরাল করে অভূতপূর্ব সাফল্য দেখান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের সঙ্গে বিভিন্ন দেশে নির্বাচনী প্রচারে এর ব্যবহার বেড়েছে, পাশাপাশি কৌশল ও অপকৌশলও বাড়ছে। বাংলাদেশে এবার এআই ব্যবহার করে ভিডিও-ছবি তৈরি করে প্রচার-অপপ্রচার চলছে। ডিজিট্যালি রাইটসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, এর সুবিধা অল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানো, কিন্তু অসুবিধা ধর্মীয় বিদ্বেষ ও সহিংসতা দ্রুত ছড়ানোর ঝুঁকি। তিনি আরও বলেন, অনুসারী বেশি হলেও স্থানীয় মাঠের রাজনীতির প্রভাবই চূড়ান্ত নির্ধারক।
বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর জরিপে জানা গেছে, দেশের ৫৬% এর বেশি পরিবারের সদস্য ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। হ্যাশমেটার তথ্যমতে, ফেসবুক ব্যবহারকারী সাড়ে ৪ কোটির বেশি, টিকটক ১.৮ কোটি এবং ইউটিউব সাড়ে ৩ কোটি। এবারের নির্বাচনে ভোটার ১২.৭৭ কোটি এবং ১০৯৯৪ প্রার্থী রয়েছে; প্রচার চলছে ২৩ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত, ভোট ১২ ফেব্রুয়ারি।
দলীয় নেতাদের বিস্তারিত
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ভেরিফায়েড পেজ (২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে সক্রিয়) থেকে খালেদা জিয়া, জাইমা রহমান ও বিএনপির পেজ অনুসরণ করা হয়; তাঁর নির্বাচনী কার্যক্রম প্রচার চলছে। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের (ঠাকুরগাঁও-১) ৯.৫ লাখ এবং সালাহউদ্দিন আহমদের (কক্সবাজার-১) ২.১৮ লাখ অনুসারী। বিএনপির পেজে ৪৮ লাখ অনুসারী।
জামায়াত আমির শফিকুর রহমান (ঢাকা-১৫) এর পেজ (২০১৫ সালের এপ্রিল থেকে) থেকে শুধু দলের পেজ অনুসরণ; তাঁর প্রচার চলছে। সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের (খুলনা-৫) ৫.৩ লাখ এবং নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ তাহেরের ২.৭৬ লাখ অনুসারী। জামায়াতের পেজে ৩১ লাখ।
এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের (ঢাকা-১১) পেজ (২০২৪ সেপ্টেম্বর থেকে) এবং আরেকটি আইডিতে মোট ২৬ লাখ অনুসারী; প্রচার চলছে। সদস্যসচিব আখতার হোসেনের ৩.৩৩ লাখ, দক্ষিণাঞ্চলের হাসনাত আবদুল্লাহর ৩৪ লাখ এবং উত্তরাঞ্চলের সারজিস আলমের ৩১ লাখ অনুসারী। দলের পেজে ১৫ লাখ।
জোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনুসারী
নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার (ঢাকা-১৮, বগুড়া-২) পেজে (২০১৯ মার্চ থেকে) ২.৩৭ লাখ অনুসারী। বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থের (ভোলা-১) পেজে (২০০৯ জানুয়ারি থেকে) ৩২ লাখ। গণসংহতির জোনায়েদ সাকিরের (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬) ৩.৩৬ লাখ, গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হকের (পটুয়াখালী-৩) পেজে (২০২০ জানুয়ারি থেকে) ৯.৭৫ লাখ, এনডিএম-এর ববি হাজ্জাজের (ঢাকা-১৩) ৬.৬১ লাখ এবং এবি পার্টির মজিবুর রহমান মঞ্জুর (ফেনী-২) ৯৪ হাজার অনুসারী।
স্বতন্ত্র তাসনিম জারার (ঢাকা-৯) পেজ (২০১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে) সবচেয়ে এগিয়ে ৭১ লাখ+ অনুসারী; এনসিপি ছাড়ার পর ক্রাউডফান্ডিং করে ৪৭ লাখ টাকা সংগ্রহ করেন। রুমিন ফারহানার (ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২) ৭.২৯ লাখ অনুসারী। নারী প্রার্থীদের মধ্যে সানজিদা ইসলাম তুলির (ঢাকা-১৪) ৫৮ হাজার, দিলশানা পারুলের (ঢাকা-১৯) ৬৪ হাজার, জলি তালুকদারের (নেত্রকোনা-৪) ৭ হাজার এবং মনীষা চক্রবর্তীর (বরিশাল-৫) ৩৪ হাজার অনুসারী।
ফলোয়ার বেশি প্রার্থীরা প্রতিদিন সক্রিয়, ভোটারসঙ্গ যাত্রা ও পরিকল্পনা ভিডিও পোস্ট করে প্রচার চালাচ্ছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মাহদী জাহিন বলেন, অনুসারী সংখ্যার চেয়ে প্রচার কৌশলই গুরুত্বপূর্ণ; অনুসারী বেশি হলেও ভোট জয়ের নিশ্চয়তা নেই। তরুণরা সক্রিয়তায় এগিয়ে থাকলেও প্রবীণ নেতারাও এখন ফেসবুক ব্যবহার করছেন।



















