আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই নির্বাচনের নিরপেক্ষতা, সুষ্ঠতা ও গ্রহণযোগ্যতার উপর নির্ভরশীল আগামী দিনগুলোর বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পথচলা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষ আবারও একটি সুন্দর, সাবলীল, গণতান্ত্রিক, বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছে। সেই স্বপ্নের প্রথম কঠিন ধাপ হিসেবে এই নির্বাচন সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক, অবাধ এবং নিরপেক্ষ হতে হবে। এটিই সত্যিকারের সংসদীয় গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত এবং অপরিহার্য মূলধারা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সাক্ষ্য বহন করে যে, অতীতের নির্বাচনগুলো ছিল নিয়ন্ত্রিত ও কূটকৌশলের খেলা। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে যথেচ্ছাচারের মাধ্যমে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। সাংবিধানিকভাবে নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও সেগুলো কখনো সত্যিকারের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি, জনগণের ন্যায্য অধিকার রক্ষা করতে পারেনি। কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি জনগণের মনে নতুন আশা জাগছে। সকলে বিশ্বাস করছেন, এই সরকার একটি সত্যিকারের সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠা করবে এবং ক্ষমতার কার্যকর ভারসাম্য ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের চিরতরে অবসান ঘটাবে।
আগামী নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম অনেকটা এগিয়ে গেলেও দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। সর্বত্র অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার ছায়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তবুও বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ এই নির্বাচনের জন্য মুখিয়ে আছে। কারণ জনগণ জানে, যতদিন না ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবে, ততদিন এই অস্থিতিশীলতা থেকে মুক্তির পথ খোলা যাবে না। নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভোটারদের সচেতন দায়িত্ববোধ। ভোটাররা কাকে ভোট দেবেন, কেন দেবেন—এই সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রক্তলাল ইতিহাস অতিক্রম করে ক্ষমতার মসনদে বসবে কেমন চরিত্রের মানুষ। আগামী পাঁচ বছরের রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা গঠিত হবে ভোটের মাধ্যমে। ভোটাররা যা চাইবে, তাই-ই হবে বাংলাদেশের ভাগ্য। তাই প্রত্যেক নাগরিকের কাছে ভোটাধিকার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
ভোটাধিকার কেবল সাংবিধানিক সুযোগ নয়, এটি একটি নাগরিক অধিকার এবং সামাজিক-নৈতিক দায়বদ্ধতা। অনেকে ভাবতে পারেন, একটি ভোট দিয়ে দায়িত্ব পালন হয়ে গেল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। এই একটি ভোটের উপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্রমাগত উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক স্থায়িত্ব। প্রতিটি ভোট একটি মূল্যবান আমানত—যাকে ভোট দিচ্ছেন, তাকে আপনি নেতৃত্ব ও দায়িত্বের অধিকার প্রদান করছেন। অনেকে ভাবেন, "আমার একটি ভোট না দিলেও কী ক্ষতি!" কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এক বা দুই ভোটের সামান্য ব্যবধানে নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। ভোট না দিলে আপনি নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মৌলিক অধিকার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করবেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদারিত্ব থেকে সরে যাবেন। তাই প্রত্যেক নাগরিকের প্রতি নৈতিক আহ্বান জানানো হচ্ছে—অনুগ্রহ করে আপনার ভোটাধিকার অবশ্যই প্রয়োগ করুন।
এখন প্রশ্ন উঠছে, কোন ধরনের প্রার্থীকে ভোট দেওয়া উচিত? যোগ্যতার মাপকাঠি কী হবে? একজন সত্যিকারের যোগ্য প্রার্থী চেনার জন্য বিবেচনা করতে হবে তার তাকওয়া ও আল্লাহভীতি, অটুট নৈতিক চরিত্র, সততা ও আমানতদারিত্ব, জ্ঞান-প্রজ্ঞার সমন্বয়, জনসেবামুখী মনোভাব এবং ন্যায়বিচার প্রতি অবিচল অঙ্গীকার। এছাড়াও প্রার্থীর রাজনৈতিক দলের আদর্শ, নির্বাচনী ইশতেহারের বাস্তবসম্মততা, অতীতের কর্মপরিচয় এবং দেশের মাটি ও মানুষের জন্য নিরাপদ ও আস্থাশীল কিনা তা যাচাই করতে হবে। একজন দায়িত্বশীল ভোটার কখনো ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভয়ভীতি, আবেগপ্রবণতা বা নির্বাচনকালীন রঙিন প্রতিশ্রুতির ফাঁদে পড়ে ভোট দিতে পারেন না। বিবেক জাগ্রত রেখে প্রার্থীর পারিবারিক ঐতিহ্য, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, সাধারণ মানুষের সঙ্গে আচরণব্যবহার এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—রাষ্ট্রপরিচালনার মহৎ দায়িত্ব পালনে যোগ্যতা, মানুষের অধিকার আদায়ে আগ্রহ এবং সাম্য-ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পারদর্শিতা বিবেচনা করতে হবে।
যদি আজ একজন দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, সুদখোর, চরিত্রহীন বা কালো টাকার মালিককে ভোট দিয়ে নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পণ করেন, তাহলে কখনোই ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখা সম্ভব নয়। সামান্য অর্থের লোভে বা সাময়িক ক্ষমতার মোহে অযোগ্য প্রার্থীকে ভোট প্রদান করা নিজের পায়ে নিজের কুড়াল মারার সমতুল্য। কারণ কর্ম অনুযায়ী ফল ভোগ করতে হয়—বরের গাছে আঙ্গুর ফল করে না। অযোগ্য প্রার্থী বেছে নিলে অযোগ্য শাসন পাবেন, যোগ্য প্রার্থী বেছে নিলে যোগ্য শাসন লাভ করবেন। হাদিসে এসেছে, "যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে যোগ্য ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও অযোগ্যকে দায়িত্ব অর্পণ করে, সে আল্লাহ, রাসূল এবং মুমিনদের সঙ্গে খিয়ানত করে।" আত্মীয়তা, ব্যক্তিগত স্বার্থ, ভয়, লোভ বা পার্থিব লাভের বশবর্তী হয়ে আমানতের খিয়ানত করা যায় না।
ভোটারদের মধ্যে মতবিরোধ, পছন্দ-অপছন্দ বা তর্ক-বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু তা কোনোভাবেই সহিংসতার পর্যায়ে রূপ নেবে না। আমরা সকলে একেকটি নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা এবং প্রতিবেশী। ভোটের কারণে আমাদের মধ্যে কোনো কলহ বা বিভেদ সৃষ্টি হলে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে। প্রত্যেকের ভোটাধিকার সমুন্নত ও সুরক্ষিত রাখতে ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ শৃঙ্খলাবদ্ধ ও নিরাপদ করতে সকলে সহযোগিতা করবেন। গণতান্ত্রিক চেতনায় জেগে উঠে যোগ্য প্রার্থীকে ভোট প্রদান করে সর্বজনীন, বৈষম্যহীন ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠনের প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশগ্রহণ করুন। আপনার একটি ভোটই স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।








































