দক্ষতা, উদ্যম ও প্রযুক্তিতেই তরুণদের কর্মসংস্থান: এম সাফাক হোসেন


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬, ১২:০০ পিএম
দক্ষতা, উদ্যম ও প্রযুক্তিতেই তরুণদের কর্মসংস্থান: এম সাফাক হোসেন

এম সাফাক হোসেন কমিউনিকেশন স্কিলস ডেভেলপমেন্ট একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক। তিনি একজন কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট ও ট্রেইনার। পরামর্শক হিসেবে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত আছেন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্টটাইম লেকচার দিয়ে থাকেন। দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, তরুণদের স্বপ্ন তৈরি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ব্যবস্থা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, কমিউনিকেশন স্কিল, চাকরির বাজার ও প্রশিক্ষণ নিয়ে তিনি কথা বলেছেন ‘সংবাদ প্রকাশ’-এর সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মামুন রহমান।

সংবাদ প্রকাশ : উচ্চশিক্ষিত হয়েও অনেক তরুণ চাকরি পাচ্ছে না—এর মূল কারণগুলো কী?
এম সাফাক হোসেন : চাকরি না পাওয়ার বড় কারণ হলো পড়ালেখার পাশাপাশি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহারিক বা প্র্যাকটিক্যাল ওরিয়েন্টেশন প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে বাস্তবমুখী ক্যারিয়ার পরিবেশ, কাজের ধরন ও কর্পোরেট কালচার বুঝতে অনেক সময় লাগে। অথচ কোম্পানিগুলো এমন লোক খোঁজে, যে আগে থেকেই নির্দিষ্ট দক্ষতা নিয়ে কাজে নামতে পারে। দুঃখজনকভাবে আমাদের দেশে ‘জিরো থেকে স্কিলড’ করে তোলার প্রক্রিয়া খুব দুর্বল। এশিয়ার অনেক দেশে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ ও প্র্যাকটিক্যাল মেন্টালিটি তৈরি করা হয়, ফলে গ্র্যাজুয়েশন শেষে তারা তুলনামূলকভাবে প্রস্তুত অবস্থায় কর্মজীবনে প্রবেশ করে।

সংবাদ প্রকাশ : শিক্ষা ব্যবস্থা ও চাকরির বাজারের চাহিদার মধ্যে কোথায় সবচেয়ে বড় গ্যাপ তৈরি হয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
এম সাফাক হোসেন : আমার পর্যবেক্ষণে সবচেয়ে বড় গ্যাপ হলো—অনেকে নিজের পটেনশিয়াল বুঝতে পারে না, আর সেই অনুযায়ী দিকনির্দেশনা বা সহযোগিতা পায় না (পরিবার, সমাজ বা প্রতিষ্ঠান—যেখান থেকেই হোক)। দ্বিতীয়ত, এই সময়ে ধৈর্য কমে গেছে; ফোকাস ধরে রাখতে চায় না, দ্রুত ফল চায়। কিন্তু কোনো দক্ষতা ধাপে ধাপে তৈরি হয়—যেমন একটি শিশু জন্মেই দৌড়াতে পারে না। আজকের শিক্ষার্থীদের অনেকেরই এই ধৈর্য ও ধারাবাহিক চর্চার অভাব গ্যাপকে আরও বড় করে।

সংবাদ প্রকাশ : বাংলাদেশে শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের বাস্তব চিত্র আপনি কীভাবে দেখছেন?
এম সাফাক হোসেন : আমি মনে করি আগের তুলনায় এখন বাংলাদেশে অনেক বেশি সুযোগ তৈরি হয়েছে। তবে শুরুর ধাপটা সবসময় কঠিন, আর প্রপার গাইডেন্স না থাকায় অনেকেই সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারে না। সম্ভাবনার রাস্তা আছে, কিন্তু সেখানে ঢুকতে যে প্রস্তুতি দরকার—সেটাতে ঘাটতি থাকে।

সংবাদ প্রকাশ : আজকের চাকরির বাজারে একজন শিক্ষার্থীর জন্য কোন কোন দক্ষতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—একজন প্রশিক্ষক হিসেবে কীভাবে দেখছেন?
এম সাফাক হোসেন : পৃথিবী দ্রুত আধুনিক হচ্ছে, টেকনোলজি-ভিত্তিক নতুন নতুন কাজও তৈরি হচ্ছে। আমার মতে সবকিছুর ওপরে সবচেয়ে জরুরি হলো কমিউনিকেশন স্কিল, কারণ প্রায় সব পেশাতেই যোগাযোগ জড়িত। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমি আইটি, হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ও ট্যুরিজম সেক্টরকে দ্রুত গ্রো করতে দেখছি। পাশাপাশি ডিজিটাল মার্কেটিং, কনটেন্ট ও এআই-ভিত্তিক কাজের চাহিদাও বাড়ছে।

সংবাদ প্রকাশ : একাডেমিক ফলাফল বনাম ব্যবহারিক দক্ষতা—নিয়োগকর্তারা কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন?
এম সাফাক হোসেন : এখন বিশ্বজুড়েই একাডেমিক ফলাফলের চেয়ে দক্ষতাকে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। মেধা ও দক্ষতা—দুটিই গুরুত্বপূর্ণ, তবে ফিল্ড-ওয়ার্ক বা বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে দক্ষতা অনেক বেশি দরকার। সবাই মেধাবী হবে না, কিন্তু দক্ষতা অর্জন করা সম্ভব। মেধা অনেক সময় গাইডলাইন তৈরি করে, আর বাস্তব কাজ পরিচালনায় দক্ষতা বড় ভূমিকা রাখে। আমার মতে, কার কোথায় দুর্বলতা আছে তা ট্রেনিং দিয়ে পূরণ করা উচিত, আর যে যার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তাকে সেই জায়গায় রিসোর্স হিসেবে তৈরি করা দরকার।

সংবাদ প্রকাশ : সফট স্কিল—যেমন যোগাযোগ, উপস্থাপন ও দলগত কাজ—এসবের গুরুত্ব কতটা?
এম সাফাক হোসেন : সফট স্কিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো স্পেসিফিকভাবে ফোকাস করে প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। নির্দিষ্ট দক্ষতার ওপর ফোকাস যত বাড়ে, সেই দক্ষতায় পারদর্শিতাও তত দ্রুত তৈরি হয়।

সংবাদ প্রকাশ : কারিগরি ও দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ কি কর্মসংস্থানে কার্যকর ভূমিকা রাখছে?
এম সাফাক হোসেন : অবশ্যই রাখছে। কারিগরি বা স্কিল-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ সাধারণত ফোকাসড—কাজ বা বিষয়ের ওপর হাতে-কলমে শেখায়। যাদের আগ্রহ আছে এবং যারা পারদর্শী হতে চায়, তাদের জন্য এগুলো খুব কার্যকর। উন্নত দেশগুলোতে অ্যাডভান্স লেভেল পর্যন্ত গভীর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কর্মসংস্থানে অভিজ্ঞতার মূল্য আছে—তবে তার মানে এই নয় যে শিক্ষানবিশদের জায়গা নেই। তাদের সুযোগ তৈরিতে শুধু ইনস্টিটিউশন নয়, কর্পোরেট সেক্টরেরও বড় ভূমিকা থাকা দরকার।

সংবাদ প্রকাশ : বর্তমানে চালু প্রশিক্ষণগুলো কি শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী আপডেট হচ্ছে?
এম সাফাক হোসেন : ব্যক্তিগতভাবে বললে—অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এখনো পিছিয়ে। এই যুগেও অনেক সময় পুরোনো বিষয়েই আটকে থাকি; নতুনত্ব নিয়ে আলোচনা থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ কম। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে ভাবনার পাশাপাশি ইমপ্লিমেন্টেশন জরুরি। প্রশিক্ষক, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি কর্তৃপক্ষ—সব পক্ষকে সমন্বয় করে আপডেটেড কনটেন্ট ও স্ট্যান্ডার্ডে কাজ করতে হবে।

সংবাদ প্রকাশ : শিক্ষার্থীরা কোন ধরনের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ নিলে দ্রুত চাকরির সুযোগ পেতে পারে?
এম সাফাক হোসেন : স্বল্পমেয়াদি না দীর্ঘমেয়াদি—এর চেয়ে বড় বিষয় হলো প্রশিক্ষণের মান। প্রশিক্ষকের শেখানোর দক্ষতা, হাতে-কলমে শেখানোর কৌশল এবং বাস্তবমুখী শিক্ষাদান খুব জরুরি। চাকরির ক্ষেত্রে নিজের দক্ষতা, নিজের অবস্থান বোঝা এবং নিজেকে প্রেজেন্ট করার সক্ষমতা যত ভালো হবে, সুযোগও তত বাড়বে। তাই কমিউনিকেশন ট্রেনিংকে টপ প্রাইওরিটি দিতে বলব।

সংবাদ প্রকাশ : পড়াশোনার পাশাপাশি একজন শিক্ষার্থী কীভাবে নিজেকে চাকরির জন্য প্রস্তুত করতে পারে?
এম সাফাক হোসেন : এটা এখন অনেকটাই নিজের হাতে। এটা টেকনোলজির যুগ—চাইলেই অনলাইনে টিউটোরিয়াল, কোর্স ও রিসোর্স দিয়ে নিজের গ্যাপগুলো পূরণ করা যায়। নিজের ট্যালেন্ট ও দক্ষতা কোন খাতে কাজে লাগবে—রিসার্চ করে বের করাও সহজ। টেকনোলজি ঠিকভাবে ব্যবহার করলে ক্যারিয়ার বাছাই, ভার্চুয়ালি নিজের কাজ উপস্থাপন, এবং নেটওয়ার্কিং তৈরি—সবই তুলনামূলকভাবে সহজ। টিপস হিসেবে বলব—কমিউনিকেশন স্কিল, নিজেকে উপস্থাপনের স্কিল এবং নিজের সম্পর্কে সচেতন হওয়ার স্কিল—এই তিনটি খুব জরুরি।

সংবাদ প্রকাশ : ইংরেজি ও তথ্যপ্রযুক্তি দক্ষতা ছাড়া কি এখন ভালো চাকরি কল্পনা করা যায়?
এম সাফাক হোসেন : ইংরেজি হলো বিশ্বের কমন ভাষা, তাই যোগাযোগের জন্য এটা কাজে আসে। ভাষাগত দক্ষতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে একই সঙ্গে দেখা যায়, ইউরোপ, চীন, জাপান, আরব দেশগুলো নিজেদের ভাষাকেও খুব গুরুত্ব দেয়। যার ভাষা চর্চা ও যোগাযোগ দক্ষতা যত ভালো, তার কর্মসংস্থানের সুযোগও তত বাড়ে।

সংবাদ প্রকাশ : ফ্রিল্যান্সিং ও আউটসোর্সিং—এগুলো কি শিক্ষার্থীদের জন্য টেকসই কর্মসংস্থানের পথ হতে পারে?
এম সাফাক হোসেন : উন্নত দেশগুলোতে ফ্রিল্যান্সিং অনেক বেশি। শিক্ষার্থী হোক বা উদ্যোক্তা—টেকসইভাবে টিকে থাকা নির্ভর করে ব্যক্তির দক্ষতা, ইচ্ছাশক্তি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ওপর।

সংবাদ প্রকাশ : শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্যোক্তা মানসিকতা গড়ে তুলতে কী ধরনের নীতিগত সহায়তা দরকার?
এম সাফাক হোসেন : উদ্যোক্তা হতে হলে আগে ধৈর্য ধরার অভ্যাস থাকতে হবে—সফলতা আসতে সময় লাগে। পাশাপাশি লক্ষ্য নির্ধারণ, প্ল্যান অব অ্যাকশন, মানি ম্যানেজমেন্ট—এসব দক্ষতা জরুরি। কোনো উদ্যোগ নেওয়ার আগে গ্রাউন্ড স্টাডি ও ফিজিবিলিটি স্টাডি করাও খুব প্রয়োজন।

সংবাদ প্রকাশ : আগামী কয়েক বছরে কোন খাতে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তৈরি হবে?
এম সাফাক হোসেন : আগামী বছরগুলোতে ট্রান্সপোর্ট, হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ট্যুরিজম এবং ডিজিটালাইজেশন-ভিত্তিক কাজ আরও বাড়বে। ট্যুরিজমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে ব্যবসা ও চাকরির সুযোগ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সংবাদ প্রকাশ : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশন—চাকরির বাজারে ঝুঁকি নাকি সুযোগ?
এম সাফাক হোসেন : আমি এটাকে সুযোগ হিসেবেই দেখি। অনেকে মনে করেন মেশিন কাজ করলে মানুষের কাজ কমে যাবে—বিষয়টি একপেশে। অটোমেশনের ফলে মেইনটেন্যান্স, প্রোডাকশন, অপারেশন, মাল্টিটাস্কিং—এসব ক্ষেত্রে নতুনভাবে জনবল দরকার হয়। মেশিন পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনাতেও মানুষের ভূমিকা থাকে, ফলে বহু জায়গায় কর্মসংস্থান বাড়ে।

সংবাদ প্রকাশ : শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে সরকারের কোন উদ্যোগগুলো আরও জোরদার করা প্রয়োজন?
এম সাফাক হোসেন : কর্মসংস্থান তৈরিতে সরকারের বড় ভূমিকা আছে। অনেক দেশে রাষ্ট্র আইডিয়া বা প্রজেক্টকে স্পন্সর করে; লাভজনক পর্যায়ে গেলে সরকার অংশীদারিত্ব বা লভ্যাংশ পায়। আমাদের দেশে এমন কাঠামো এখনো যথেষ্ট বাস্তবমুখী হয়নি। দেশীয় উন্নয়নমূলক আইডিয়া নিয়ে অলিম্পিয়াড/কম্পিটিশন হয়, কিন্তু উল্লেখযোগ্য ইমপ্যাক্ট কম দেখা যায়। সরকারিভাবে উদ্যোক্তা বিনিয়োগ স্কিম এবং কাঠামোগত স্পন্সরশিপ/সাপোর্ট সিস্টেম শক্ত করা দরকার—এতে কর্মসংস্থান বহু গুণ বাড়বে।

সংবাদ প্রকাশ : যারা পড়াশোনা শেষ করেও চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ছে—তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
এম সাফাক হোসেন : ইন্টারনেট ও নেটওয়ার্কিংয়ের মতো রিসোর্স কাজে লাগিয়ে নিজের দক্ষতা অন্যদের সামনে তুলে ধরতে হবে। নিজের দুর্বলতা কীভাবে সুযোগে রূপান্তর করা যায়, সেটাও ভাবতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আত্মবিশ্বাস তৈরি করা এবং নিয়মিত চর্চা চালিয়ে যাওয়া।

সংবাদ প্রকাশ : সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।
এম সাফাক হোসেন : আপনাকেও ধন্যবাদ।

কথাপ্রকাশ বিভাগের আরো খবর

Link copied!