১৮০ কার্যদিবস নিয়ে বিভ্রান্তি

ভোটের ঠিক কতদিন পর নতুন সরকার?


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২, ২০২৬, ১২:২৩ পিএম
ভোটের ঠিক কতদিন পর নতুন সরকার?

গণভোটের ফলাফল যা-ই হোক, সংসদ নির্বাচনের পরপরই নতুন সরকার গঠিত হবে। তবে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে আগামী সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ প্রথম অধিবেশন থেকে পরবর্তী ১৮০ কার্যদিবস একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করবে—এই বিধানকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি।

গত ১৭ অক্টোবর রাজনৈতিক দলগুলো ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ সই করে। এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে গত ১৩ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করেন। আদেশের ৭(গ) ধারায় বলা হয়েছে—গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদ প্রথম অধিবেশন শুরুর দিন থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কারের কাজ শেষ করবে, এরপর পরিষদ বিলুপ্ত হবে।

এই ১৮০ কার্যদিবসকে কেউ কেউ ১৮০ দিন হিসেবে ধরে নিয়ে ব্যাখ্যা করছেন যে নির্বাচনের পর দীর্ঘ সময় অন্তর্বর্তী সরকারই ক্ষমতায় থাকবে। এক পর্যায়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে জানিয়েছে—নির্বাচনের পরপরই তারা নবগঠিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করবে।

কার্যদিবসের হিসাবে ১৮০ মানে ক্যালেন্ডারের ছয় মাস নয়
দেশের সংসদগুলোর নজির বলছে, কার্যদিবসের হিসাব ক্যালেন্ডারের দিন গণনার সঙ্গে মেলে না। একাদশ জাতীয় সংসদে মোট ২৩২ কার্যদিবস সংসদ চলে। অন্যান্য সংসদও সাধারণত ২০০ থেকে ২৫০ কার্যদিবস চলেছে।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ ১৮০ কার্যদিবস পর্যন্ত চলতে পারবে। একই সঙ্গে পরিষদের জন্য সংসদের কার্যপ্রণালি বিধি প্রযোজ্য হবে। ফলে ক্যালেন্ডার ধরে ছয় মাস বা ১৮০ দিন নয়—অধিবেশনভিত্তিক কার্যদিবস গণনায় কয়েক বছরের মধ্যে গিয়ে ১৮০ কার্যদিবস পূর্ণ হতে পারে। এছাড়া এক অধিবেশন শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে পরবর্তী অধিবেশন আহ্বান করাও বাধ্যতামূলক।

সংবিধান সংস্কার পরিষদ কীভাবে চলবে
সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত এমপিদের নিয়েই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। এমপিরা একই সঙ্গে সংসদ এবং পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। সংসদ নিয়মিত আইন প্রণয়ন, বাজেট, বিতর্কসহ স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে, আর পরিষদ শুধুমাত্র সংবিধান সংস্কারের কাজ করবে—এটাই আদেশের কাঠামো।

জুলাই সনদ প্রণয়ন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক সহসভাপতি এবং বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ সমকালকে বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরপরই নবনির্বাচিত এমপিরা শপথ নেবেন। এরপরই নতুন সরকার গঠিত হবে।

ভোটের কতদিন পর সরকার: আগের নজির
১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম সংসদের নির্বাচন হয়, নতুন সরকার গঠিত হয় ২১ জুন।

২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম সংসদ নির্বাচন হয়, নতুন সরকার গঠিত হয় ১০ অক্টোবর।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম সংসদ নির্বাচন হয়, এক সপ্তাহ পর ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি নতুন সরকার গঠিত হয়। পরবর্তী তিনটি নির্বাচনেও ভোটের পর এক সপ্তাহের মধ্যে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর শপথের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিদায় নেয়।

সরকার গঠনে সবচেয়ে বেশি সময় লেগেছিল ১৯৯১ সালের পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে। সেবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ভোটের ২১ দিন পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া। কারণ, ওই নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। ১৪৩ আসনের বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর ১৮ এমপির সমর্থনে সরকার গঠন করে।

এমপিদের শপথ: নিয়ম ও নজির
নিয়ম অনুযায়ী ভোটের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচিত এমপিদের নাম গেজেট আকারে প্রকাশ করবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচিতদের পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে শপথ নিতে হয়; না নিলে সদস্যপদ বাতিল হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শপথ না নেওয়ায় তার সদস্যপদ বাতিল হয়েছিল।

বাস্তবে সাধারণত গেজেট প্রকাশের দুই-তিন দিনের মধ্যেই এমপিরা শপথ নেন। যেমন, অষ্টম সংসদের এমপিরা ভোটের এক সপ্তাহ পর ২০০১ সালের ৭ অক্টোবর শপথ নেন। নবম সংসদের এমপিরা ভোটের পাঁচ দিন পর ৪ জানুয়ারি শপথ নিয়েছিলেন।

এই নজির ধরে ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটের পর তিন-চার দিনের মধ্যে গেজেট প্রকাশ হতে পারে। এরপর দুই-তিন দিনের মধ্যে শপথ অনুষ্ঠিত হতে পারে। কোনো দল স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে শপথের দিনই সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রক্রিয়াও এগোতে পারে।

অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, এবারও রীতি ভাঙার কারণ নেই। নির্বাচনের পর ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যেই নতুন সরকার গঠিত হবে। অন্তর্বর্তী সরকার আরও ১৮০ দিন ক্ষমতায় থাকবে—এ দাবি ভুল ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

কেন ১৮০ কার্যদিবসের পরিষদ—এবং কোথায় অনিশ্চয়তা
সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনের ফল প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের অধিবেশন আহ্বান করতে হয়। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে পরিষদের ক্ষেত্রেও একই বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে। এমপিরা সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পরপরই পরিষদের সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন। পরিষদের প্রথম অধিবেশনে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের আদলে সভাপ্রধান ও উপপ্রধান নির্বাচিত হওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার সমকালকে বলেন, সংসদ যেভাবে চলে, পরিষদও সেভাবেই চলবে। সংসদ সরকারের স্বাভাবিক কাজ করবে, আর পরিষদ সংবিধান সংস্কারের কাজ করবে। এর সঙ্গে সরকার গঠনের সম্পর্ক নেই—তাই নির্বাচনের পরপরই নতুন সরকার গঠিত হবে।

তবে আরেকটি জায়গায় অনিশ্চয়তার কথা উঠছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, সংসদের প্রথম ৩০ দিনের মধ্যে এই অধ্যাদেশ উত্থাপন ও পাস না হলে তা বাতিল হয়ে যাবে। ফলে ১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট হলেও এর স্থায়িত্ব নির্ভর করবে পরবর্তী সংসদের সিদ্ধান্তের ওপর। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও অধ্যাদেশ পাস না হলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হবে কি না—তা নিয়ে অস্পষ্টতা থেকে যাচ্ছে।

আর গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে জুলাই সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলো বাস্তবায়নের আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে না। যদিও বিএনপি, জামায়াতসহ স্বাক্ষরকারী দলগুলো বলছে—তারা সনদ অনুসরণ করবে। এনসিপি এখনও জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেনি।

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!