ইরানের উপকূল ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে সামরিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। অনেক বিশেষজ্ঞের ধারণা, তেহরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলার পরিকল্পনারই ইঙ্গিত দিচ্ছে ওয়াশিংটনের এই তৎপরতা। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলছেন, তিনি ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে যেতে চান এবং সম্ভাব্য নতুন এক পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে আলোচনায় বসার পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে।
এই ঘোষণার আগেই পারমাণবিক শক্তিচালিত বিশাল বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ আরব সাগরে গিয়ে অবস্থান নেয়। সাম্প্রতিক সময়ে ওই এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক শক্তি জড়ো করেছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে এই রণতরী। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, ট্রাম্প কি ইরান সরকারকে চাপে রাখতে এবং ভয় দেখাতেই উপকূলজুড়ে এ ধরনের বড় সামরিক সমাবেশ ঘটাচ্ছেন, নাকি এর আড়ালে কোনো বড় অভিযানের প্রস্তুতি চলছে।
আগেও এমন উদাহরণ আছে। গত বছরের জুনে টানা ১২ দিনের ইরান–ইসরায়েল সংঘাতের সময়ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের বৈশ্বিক সামরিক সক্ষমতার বড় অংশ এ অঞ্চলে নিয়ে এসেছিল। তখন ওয়াশিংটন মিত্র ইসরায়েলের পক্ষে দাঁড়িয়ে ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় ভয়াবহ বোমা হামলা চালায়। এর কিছুদিন পর ক্যারিবীয় সাগরেও বিপুল অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধজাহাজ জড়ো করে যুক্তরাষ্ট্র; কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ভেনেজুয়েলার নৌযানে হামলা শুরু হয়, যেগুলোকে তারা মাদক পাচারের অভিযোগে টার্গেট করেছিল, যদিও তার পক্ষে স্পষ্ট প্রমাণ দেখাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সরাসরি নিউইয়র্কে নিয়ে যাওয়া হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিকে ইরানে শুরু হয় ব্যাপক বিক্ষোভ। অভিযোগ ওঠে, আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেন এবং বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বার্তা দেন, ‘সহায়তা আসছে’। তিনি হুমকি দেন, বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চলতি মাসের শুরুতে ইরান সরকার সম্ভাব্য মৃত্যুদণ্ড কার্যকর থেকে সরে আসার আশ্বাস দিলে ট্রাম্পের সুর কিছুটা নরম হয়। পরে বিক্ষোভ স্তিমিত হয়ে এলে তিনি দাবি করেন, তাঁর চাপের কারণেই মৃত্যুদণ্ড স্থগিত হয়েছে, যদিও তেহরান সেই দাবি অস্বীকার করেছে। তবুও ইরান উপকূলে অস্বাভাবিক সামরিক সমাবেশ আর ট্রাম্পের কড়া ভাষার কারণে বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করছেন—পরিস্থিতি যেকোনো সময় সরাসরি হামলার দিকে গড়াতে পারে।
গত বৃহস্পতিবার ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’–এ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, এসব অস্ত্র ও বাহিনী মূলত “সতর্কতা” হিসেবে মোতায়েন করা হয়েছে—প্রয়োজনে ব্যবহার করা হতে পারে। তাঁর ভাষায়, ‘আমাদের বিশাল একটি নৌবহর ওই দিকে যাচ্ছে, হয়তো আমাদের এটি ব্যবহার করতে হবে না।’ তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র এমন আক্রমণ চালাবে, যা গত জুনের হামলাকেও তুচ্ছ করে দেবে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান
সাম্প্রতিক ঘোষণায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, আঞ্চলিক ‘নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখতে পারমাণবিক শক্তিচালিত যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন বিমানবাহিনী (AFCENT) তাদের ঘাঁটিগুলোতে কয়েক দিনব্যাপী প্রস্তুতিমূলক যুদ্ধ মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে, যার লক্ষ্য দ্রুত সেনা ও অস্ত্র মোতায়েনের সক্ষমতা বাড়ানো।
২০২৪ সাল থেকে একটানা এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বেড়েই চলেছে। ২০২৫ সালের জুন নাগাদ মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৪০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন ছিল বলে জানা যায়। বাহরাইন, মিশর, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরাত মিলিয়ে অন্তত আটটি স্থায়ী ঘাঁটি এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। ২০২৫ সালের ২৩ জুন ইরান কাতারের আল-উদেইদ মার্কিন বিমানঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়, তার ঠিক একদিন আগে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র।
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের সামরিক সক্ষমতা
ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন কার্যত একটি ভাসমান বিমানঘাঁটি। এতে ছয় থেকে সাত হাজার নাবিক ও সেনা অবস্থান করতে পারেন। এটি মার্কিন নৌবাহিনীর ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ–৩’-এর মূল প্ল্যাটফর্ম। প্রায় ৩৩৩ মিটার লম্বা এ রণতরী বিশ্বের বৃহত্তম যুদ্ধজাহাজগুলোর একটি, যা পারমাণবিক শক্তিতে চলে এবং দীর্ঘ সময় জ্বালানি ছাড়াই সমুদ্রে থাকতে পারে।
এ রণতরীকে ঘিরে থাকে অন্তত তিনটি দ্রুতগতির ডেস্ট্রয়ার, যেগুলো টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম এবং শত্রুর ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার জন্য উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সজ্জিত। সাধারণত এর সঙ্গে একটি ক্রুজার, একটি আক্রমণধর্মী সাবমেরিন এবং একটি লজিস্টিক সাপোর্ট জাহাজও থাকে। এ নৌবহরের বিমান উইং–এ থাকে প্রায় ৬৫টি যুদ্ধবিমান, যা আকাশ ও স্থল—দুই ধরনের আক্রমণেই ব্যবহার করা যায়।
গত জুনের ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’
২০২৫ সালের ২২ জুন রাতে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামের অভিযানে প্রায় চার হাজার মার্কিন সেনা ইরানের ফোর্দো, নাতাঞ্জ ও ইসফাহানে অবস্থিত তিনটি পারমাণবিক কেন্দ্রে একযোগে হামলা চালায়। পাহাড়ের গভীরে থাকা এসব স্থাপনাকে ধ্বংস করতে ব্যবহার করা হয় বিশেষ বাংকারবিধ্বংসী বোমা, যেগুলো বি–২ স্টেলথ বোমারু বিমানের মাধ্যমে ফেলা হয়। ওই হামলায় পারমাণবিক অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়, আর এটিই ছিল ইরানের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি বড় আকারের আক্রমণ।
আবার কি হামলার পথে যুক্তরাষ্ট্র?
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বর্তমান সামরিক সমাবেশ ও মহড়া ইঙ্গিত দিচ্ছে—ইরানে দ্বিতীয় দফা আঘাতের পথ খুলে রাখা হচ্ছে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের গবেষক এলি গেরানমায়েহ মনে করেন, ট্রাম্প যদি নতুন হামলা চালান, তা তিনি হয়তো ‘সাধারণ মানুষকে রক্ষার অভিযান’ হিসেবে উপস্থাপন করবেন। তবে এমন যেকোনো পদক্ষেপের ঝুঁকি অনেক, কারণ ইরান নিজের অস্তিত্ব হুমকিতে দেখলে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও সেনাদের ওপর পাল্টা আঘাত হানতে পারে, যা নির্বাচনের বছরে ট্রাম্পের জন্য বড় রাজনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
এ ছাড়াও ইরান উপসাগর ও আশপাশের তেলক্ষেত্রকে টার্গেট করে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, আন্তর্জাতিক নৌপথ বন্ধের হুমকি তৈরি করতে পারে বা সরাসরি ইসরায়েলের দিকে আঘাত ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গেরানমায়েহ বলেন, গত জুনের হামলার পর ইরান সরাসরি সর্বাত্মক যুদ্ধে জড়াতে চায়নি; কিন্তু এবার তাদের প্রতিক্রিয়া কী হবে, সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা নেই।
অন্যদিকে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলি ভায়েজ মনে করেন, সব প্রস্তুতি সত্ত্বেও খুব দ্রুত বড় ধরনের হামলা হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম। তাঁর বিশ্লেষণ, অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ আপাতত নিয়ন্ত্রণে আসায় এবং এ ধরনের অভিযানের বিপুল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খরচ বিবেচনায় ওয়াশিংটন এখনই শেষ সিদ্ধান্তে যেতে চাইবে না; তাছাড়া হামলার কৌশলগত লক্ষ্যও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয়।
ভায়েজ সতর্ক করে বলেন, যেকোনো সামরিক সংঘাতের চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে ইরানের প্রায় নয় কোটি সাধারণ মানুষকে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার টিকে গেলেও তারা আরও কঠোর কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠতে পারে এবং পুরো অঞ্চলে আরও আক্রমণাত্মক নীতি গ্রহণ করতে পারে। সেই অর্থে, ইরানকে ভয় দেখাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সংঘাতের দরজা খুলে ফেলতে পারে, যার ফলাফল কারো নিয়ন্ত্রণেই থাকবে না।






































