ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণে আর মাত্র ১১ দিন বাকি। শুরুতে নানা শঙ্কা থাকলেও তফসিল ঘোষণার পর দেশজুড়ে পাল্টে গেছে নির্বাচনী চিত্র; শহর থেকে গ্রাম—সব জায়গায় লেগেছে প্রচারের রং, দিন-রাত ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা। রাস্তায় রাস্তায় মাইকিং, পাড়া-মহল্লায় জনসভা আর উঠান বৈঠকে যেন দম ফেলার ফুরসত নেই কারও।
দীর্ঘদিন পর হতে যাওয়া এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। ইতোমধ্যে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তাদের ইশতেহার প্রকাশ করেছে; অদূরেই বিএনপি এবং ৩ ফেব্রুয়ারি জামায়াতে ইসলামী তাদের ইশতেহার ঘোষণা করবে বলে জানানো হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতার ঘটনা থাকলেও সার্বিক চিত্রে শঙ্কার চেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে এক ধরনের নির্বাচনী উৎসবের আমেজ।
রাজধানী থেকে প্রত্যন্ত জনপদ পর্যন্ত এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ‘ভোট’। দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই জমে উঠছে প্রচার-প্রচারণা; বড় রাজনৈতিক দল থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী—সবার কর্মতৎপরতায় মুখর জনপদ। দরজায় দরজায় গিয়ে ভোটারদের নানা প্রতিশ্রুতি শোনাচ্ছেন প্রার্থীরা, উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা ইস্যু বিভিন্ন এলাকায় প্রচারের প্রধান সুর হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল প্রচারযুদ্ধ; সমালোচনা আর পাল্টা সমালোচনায় শীর্ষ নেতাদের বাকযুদ্ধও সমান তালে চলছে।
ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ থেকে শুরু করে টিকটক ও শর্ট ভিডিও প্ল্যাটফর্ম—সব জায়গাতেই জোরালো প্রচারণা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা। চায়ের দোকান, বাসস্ট্যান্ড, বাজার—সবখানেই ভোট এখন আলোচনার শীর্ষ বিষয়; কেউ উন্নয়নের ধারাবাহিকতা চান, কেউ আবার পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি তুলছেন। প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণদের মধ্যেও উৎসাহ চোখে পড়ার মতো, অন্যদিকে শান্তিপূর্ণ ভোট নিশ্চিত করতে প্রশাসন নিরাপত্তা ও নজরদারি জোরদার করেছে।
নির্বাচনী হাওয়া এখন কেবল জনসভা বা মিছিলেই সীমাবদ্ধ নেই। পাড়া-মহল্লার চায়ের আড্ডা থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি অফিস–আদালত, সর্বত্রই আলোচনায়—কে হচ্ছেন আগামী দিনের জনপ্রতিনিধি। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চায়ের দোকানগুলো পরিণত হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে; ভোটারদের আলোচনায় উঠে আসছে প্রার্থীদের অতীত কার্যক্রম আর ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি। সংসদ সদস্য পদপ্রার্থীরা কার্যত নাওয়া-খাওয়া ভুলে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছেন মাঠ-ঘাটে, কখনো উঠান বৈঠক, কখনো পথসভা, কখনো আবার দুর্গম জনপদে সরাসরি গণসংযোগে ব্যস্ত।
ইশতেহারে ছক কষছে দলগুলো
ক্ষমতায় গেলে কী করবে—তা জানাতে নির্বাচনের আগে দলগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ইশতেহার ঘোষণা। ইতোমধ্যে এনসিপি ৩৬ দফা ইশতেহার প্রকাশ করেছে। বিএনপি এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও তাদের ইশতেহার চূড়ান্ত করেছে; দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, খুব শিগগিরই তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে। জামায়াতের ক্ষেত্রে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহকে সম্ভাব্য সময় হিসেবে ধরা হয়েছে, যেখানে তৃণমূলে সফর শেষ করে কেন্দ্রীয় নেতারা ইশতেহার নিয়ে মাঠে নামবেন বলে জানানো হয়েছে।
ডিজিটাল প্রচার আর প্যারোডির দাপট
পোস্টার টানানো নিষিদ্ধ থাকায় এবারের নির্বাচনে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে ডিজিটাল প্রচারণা। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা ফেসবুক পেজ, লাইভ, গ্রাফিক পোস্ট, শর্ট ভিডিও এবং অনলাইন বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিজেদের বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন ভোটারের কাছে। বিশেষ করে শহরের তরুণ ভোটার এবং প্রবাসী সমর্থকদের কাছে পৌঁছতে এই ডিজিটাল ক্যাম্পেইনকে বড় ভরসা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তুলনামূলক কম খরচে, সৃজনশীল কনটেন্টের মাধ্যমে স্মার্ট প্রচারে ব্যস্ত অনেক প্রার্থী।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে ডিজিটাল প্রচার তেমন চোখে না পড়লেও, ২০১৪ সালের পর থেকে ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্বাচনী মাঠের বড় হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এখন ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক—সব প্ল্যাটফর্মেই প্রচারের জোয়ার। জনপ্রিয় আধুনিক ও লোকজ গানের সুরে তৈরি প্যারোডি নির্বাচনী গান ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে; প্রার্থীর গুণগান আর উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি মিলিয়ে এসব গানের টুকরো ভিডিও মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন প্রান্তে। তরুণ ও প্রবাসী ভোটারদের কাছে পৌঁছাতে এই কৌশলকে অনেকেই বেশ কার্যকর মনে করছেন।
প্রার্থীদের দিনরাত ছুটে চলা
রাজপথ থেকে গলিপথ—সবখানে পোস্টার, ব্যানার আর মাইকের আওয়াজে ফুটে উঠছে ভোটের আগমনী বার্তা। কোথাও প্রতীকী তোরণ, কোথাও বিভিন্ন প্রতীকের আলোকসজ্জা—সব মিলিয়ে যেন উৎসবের নগরী পুরো দেশ। প্রার্থীরা নিজ নিজ অনুসারীদের নিয়ে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত পথসভা, উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ আর ডোর টু ডোর প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বিভিন্ন আসনে বিএনপি ও জামায়াতসহ জোটের প্রার্থীরা নিজেদের কর্মসূচি সাজিয়েছেন পরিকল্পিতভাবে—কেউ গণসংযোগের পাশাপাশি ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পের মতো সেবামূলক উদ্যোগ নিচ্ছেন, কেউ আবার কৃষক ও সাধারণ মানুষের জন্য বিশেষ কার্ড বা কল্যাণমূলক পরিকল্পনার কথা প্রচারে তুলে ধরছেন। ঢাকার মতো শহুরে আসন থেকে শুরু করে ঠাকুরগাঁও, চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জের মতো সীমান্ত ও উপকূলীয় আসনেও প্রার্থীরা জানাচ্ছেন, জনগণের সাড়া প্রত্যাশার চেয়েও ভালো।
পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, শঙ্কা আর প্রত্যাশা
অনেক প্রার্থী মনে করছেন, দীর্ঘদিনের ভোগান্তি, চাঁদাবাজি, দখলদারত্ব এবং নানা ধরনের হয়রানির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ এবার পরিবর্তনের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। অন্যদিকে আবার কেউ কেউ বলছেন, নানামুখী সমালোচনা চললেও ভোটের মাঠে যে অংশগ্রহণ আর উৎসবমুখরতা দেখা যাচ্ছে, তা ইতিবাচক ইঙ্গিতই দিচ্ছে।
সর্বাত্মক প্রস্তুতিতে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন
নির্বাচন কমিশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে এখন পর্যন্ত তাদের সব প্রস্তুতি পরিকল্পনামাফিক এগোচ্ছে। ভোটের দিন এক লাখ সেনাসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নয় লাখ সদস্য মাঠে থাকবে বলে জানানো হয়েছে, যাতে ভোটাররা নিরাপদে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে ও বাড়ি ফিরতে পারেন। সরকার ও প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকেও বারবার বলা হচ্ছে, এবার নিরপেক্ষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে তারা আশাবাদী এবং প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দিতে প্রস্তুত।
এ দিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অনলাইন ও মাঠ—দু’দিকেরই নিরাপত্তা জোরদার করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী বা উসকানিমূলক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে নজরদারি চলছে, সন্দেহভাজন উগ্রবাদী ও মামলাজট থাকা ব্যক্তিদের চলাচলও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
শঙ্কার পাশাপাশি নাগরিক প্রত্যাশা
রাজনীতির অন্দরমহলে এখনও নানান সমালোচনা আর অনিশ্চয়তার কথা শোনা গেলেও সাধারণ ভোটারদের বড় অংশ চাইছেন একটি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন। তাঁদের প্রত্যাশা—যিনিই বিজয়ী হোন না কেন, তিনি যেন জনকল্যাণ ও বাস্তবধর্মী ইশতেহার বাস্তবায়নে আন্তরিক থাকেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, সামরিক বাহিনী, ব্যবসায়ী মহল, নাগরিক সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ—প্রায় সবাই এখন নির্বাচনের দিকেই তাকিয়ে আছেন; তাই এই মুহূর্তে নির্বাচন হওয়াটাই দেশের জন্য সবচেয়ে জরুরি।
তাঁদের মতে, নির্বাচনের স্বাভাবিক আবহ টিকিয়ে রাখতে রাজনৈতিক দলগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ও সংযত থাকতে হবে; সহিংসতা বা প্রাণহানি যেন কোনোভাবেই এই উৎসবের আবহকে কলঙ্কিত না করে। একই সঙ্গে কেবল কথার ফুলঝুরি নয়, বাস্তবসম্মত ও কার্যকর ইশতেহার দিয়েই ভোটারের আস্থা অর্জন করা জরুরি—এমন মতও দিচ্ছেন অনেকেই।



































