ভোটের মাঠে সবচেয়ে কম বয়সী নারী প্রার্থী


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬, ০৩:১৭ পিএম
ভোটের মাঠে সবচেয়ে কম বয়সী নারী প্রার্থী
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে কম বয়সী তিন নারী প্রার্থী (বাঁ থেকে)—ফাতেমা আক্তার মুনিয়া, কামরুন্নাহার সাথী ও তাহমিনা আক্তার।

বয়স তাঁদের কম, অর্থকড়িও তেমন নেই, পড়াশোনা এখনো শেষ হয়নি বলে নিজস্ব আয়ের পথও সেভাবে তৈরি হয়নি। তারপরও ভোটের মাঠে তাঁরা। পরিবারের সদস্য, স্বজন, সংগঠনের কর্মীদের কাছ থেকে অর্থসহায়তা নিয়ে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তাঁরা প্রার্থী হয়েছেন।

এই তিন প্রার্থী হলেন—কুমিল্লা-৬ আসনে কামরুন্নাহার সাথী, নরসিংদী-৫ আসনে তাহমিনা আক্তার এবং ঢাকা-১৩ আসনে ফাতেমা আক্তার মুনিয়া। তিনজনেরই বয়স ২৫ বছর। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য ২৫ বছরই সর্বনিম্ন বয়স। সেই অর্থে তাঁরাই এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী।

তিনজনই প্রার্থী হয়েছেন রাজনৈতিক দল থেকে। কামরুন্নাহার সাথী বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী, তাঁর প্রতীক মই। তাহমিনা আক্তার এবং ফাতেমা আক্তার মুনিয়া প্রার্থী হয়েছেন ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ থেকে, তাঁদের প্রতীক আপেল।

অসম বয়সী প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়াইয়ে নেমে এই তিনজনই জয়ের আশা করছেন। তাঁরা আশা করছেন, দল বা প্রতীক দেখে নয়, তাঁদের সততা ও প্রতিশ্রুতি পালনের অঙ্গীকার দেখে ভোটাররা ভোট দেবেন।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থী ২ হাজার ১৭ জন। এর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ৮৫। নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দেওয়া হলফনামা পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, নারী প্রার্থীদের ৬৪ জন স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, অর্থাৎ ৭৫ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। প্রায় ৬৭ শতাংশ নারী প্রার্থী কর্মজীবী।

২৫ থেকে ৩৯ বছর বয়সী প্রার্থীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি, ৩২ জন। ২৫ বছর বয়সী ৩ জন, ২৬ থেকে ৩৯ বছর বয়সী ২৯ জন, ৪০ থেকে ৫০ বছর বয়সী ৩১ জন, ৫১ থেকে ৬৯ বছর বয়সী ১৭ জন ও ৭০ বছরের বেশি বয়সী প্রার্থী রয়েছেন ৪ জন। একজন প্রার্থীর বয়সের তথ্য পাওয়া যায়নি।

ভালোবেসে পাশে থাকবেন ভোটাররা, আশা কামরুন্নাহারের
বাম দল বাসদ থেকে কুমিল্লা-৬ আসনে প্রার্থী হয়েছেন কামরুন্নাহার সাথী। হলফনামা অনুসারে, তাঁর জন্ম তারিখ ২০০০ সালের ২০ নভেম্বর। হলফনামা জমা দেওয়ার সময়ে তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর ১ মাস ৯ দিন। এবার নির্বাচনে তিনি সর্বকনিষ্ঠ প্রার্থী।

হোসনেয়ারা আক্তার ও মো. মোহন মিয়ার তিন মেয়ের মধ্যে কামরুন্নাহার সবার বড়। কুমিল্লার ব্রিটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি করেছেন তিনি। পরিবার নিয়ে কুমিল্লাতেই তাঁর বাস। স্বামী রাসেল মিয়া আইনজীবী। তাঁদের দুটি সন্তান রয়েছে।

নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পেছনে এলাকাবাসীর জন্য কাজ করার আকাঙ্ক্ষার কথাই বললেন কামরুন্নাহার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাসদ থেকে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরা মানুষের অধিকার নিয়ে কাজ করেন। আমরা টাকা ব্যয় করে রাজনীতি করি না। ভালোবেসে ভোটাররা পাশে থাকবেন আমাদের।’ তাঁর আশা, ভোটাররা বুঝেশুনেই ভোট দেবেন। ভোটারদের কাছে আহ্বান, তাঁরা যেন বাসদে ভোট দেন।

 

যাঁরা নারীবিদ্বেষী কথা বলেন, যাঁরা মনে করেন নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারে না—তাঁরা ক্ষমতায় এলে নারীদের ক্ষমতায়নের পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে বলে মনে করেন কামরুন্নাহার।

হলফনামা অনুসারে, কামরুন্নাহারের নগদ অর্থ রয়েছে ১০ হাজার ২৭০ টাকা। ব্যাংকে কত টাকা রয়েছে সে তথ্য নেই। বার্ষিক আয় ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পেশা লিখেছেন ছাত্রী। তিনি বলেন, দুটি ব্যাংকে তাঁর ৩০ হাজার টাকার মতো রয়েছে। তিনি বিভিন্ন সময়ে টিউশন করেছেন, আদালতেও মামলায় সহায়তাকারী হিসেবে কাজ করেন। এখনো সনদপ্রাপ্ত আইনজীবী নন তিনি। এলএলএমে ভর্তির অপেক্ষায় রয়েছেন।

“আমরা টাকা ব্যয় করে রাজনীতি করি না। ভালোবেসে ভোটাররা পাশে থাকবেন আমাদের”—কামরুন্নাহার সাথী, কুমিল্লা-৬ আসনের প্রার্থী।

কার অর্থে ভোট করছেন জানতে চাইলে কামরুন্নাহার বলেন, স্বামী তাঁকে অর্থসহায়তা দিচ্ছেন। প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রেও স্বামীই তাঁকে সবচেয়ে বেশি সমর্থন দিয়েছেন। এক নানাভাইয়ের (মায়ের মামা) অনুপ্রেরণায় তিন বছর আগে বাসদের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি বলেন, এলাকায় অনেক ভোটার রয়েছেন, যাঁরা বাসদের রাজনীতিকে ভালোবাসেন। তাঁরাই তাঁকে ভোট দেবেন।

কুমিল্লা-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির মো. মনিরুল হক চৌধুরী ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কাজী দ্বীন মোহাম্মদ।

ভোটাররা পরিবর্তন চান, মনে করেন ফাতেমা আক্তার মুনিয়া
২৫ বছর বয়সী আরেক প্রার্থী ফাতেমা আক্তার মুনিয়া ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের প্রার্থী হিসেবে আপেল প্রতীকে ঢাকা-১৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। হলফনামা অনুসারে ফাতেমার জন্ম ২০০০ সালের ৯ অক্টোবর। হলফনামা জমা দেওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর ২ মাস ২০ দিন। হলফনামায় তিনি লিখেছেন, তিনি উচ্চমাধ্যমিক পাস। পেশা ছাত্রী। নগদ রয়েছে এক লাখ টাকা এবং ব্যাংকে জমা রয়েছে এক হাজার টাকা।

ফাতেমা আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, তিনি এখন রাজধানীর আলহাজ মকবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। গুলশানারা বেগম ও শাহজাহান আহম্মেদের পাঁচ মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে ফাতেমা দ্বিতীয়। তিনি অবিবাহিত।

 

এক প্রশ্নের জবাবে ফাতেমা বলেন, বয়স কম মূল বিষয় না, দায়িত্ববোধ কতটা সেটাই আসল ব্যাপার। জুলাই আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল তরুণদের কারণে। তরুণদের মধ্যে স্পৃহা থাকে নতুন কিছু করার। তরুণেরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তরুণেরা যদি সঠিক পথে থাকে, তাহলে তরুণদের হাতেই দেশ নিরাপদ।

তিনি বলেন, তাঁর দল ইনসানিয়াত বিপ্লব ধর্ম, বর্ণ, দলমত-নির্বিশেষে মানুষ হিসেবে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। ‘পরিবর্তন হোক নিজের কাছ থেকেই’—এই বার্তাটাই ভোটারদের কাছে পৌঁছাচ্ছেন তিনি। ভোটাররা পরিবর্তন চান। যেসব দল দুর্নীতি ও অন্যায়কে প্রশয় দেয়, তাদের চান না ভোটাররা। যাঁরা নারী-পুরুষে বৈষম্য করেন না, মানবিক মানুষ পছন্দ করেন, তাঁরা তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছেন। নির্বাচনে জয়ী হলে তাঁর প্রথম কাজ হবে প্রত্যেকটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

“বয়স কম মূল বিষয় না, দায়িত্ববোধ কতটা, সেটাই আসল ব্যাপার। তরুণেরা যদি সঠিক পথে থাকে, তাহলে তাঁদের হাতেই দেশ নিরাপদ”—ফাতেমা আক্তার মুনিয়া, ঢাকা-১৩ আসনের প্রার্থী।

ফাতেমা আরও বলেন, ‘আমার আসনে “হেভিওয়েট প্রার্থীরা” রয়েছেন। আমি ছাত্রী। জমানো টাকা, বাবার দেওয়া টাকা আর দলের ভাই-বোনের টাকা থেকে খরচ করছি। আমার ফেস্টুন, ব্যানারের আধিক্য নেই। আমি প্রতিটা ভোটারের কাছে যাচ্ছি। এটাই আমার শক্তি।’

ঢাকা-১৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপির ববি হাজ্জাজ। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মাওলানা মো. মামুনুল হক।

‘বেটি মানুষ’ বলে উপেক্ষার পাশাপাশি ‘সমর্থন’ও পাচ্ছেন তাহমিনা আক্তার
হলফনামা অনুসারে, তাহমিনা আক্তারের জন্ম ২০০০ সালের ৭ অক্টোবর। হলফনামা জমা দেওয়ার সময় তাঁর বয়স ছিল ২৫ বছর ২ মাস ২২ দিন। নরসিংদী-৫ আসনে ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশের হয়ে তিনি প্রার্থী হয়েছেন। দলীয় প্রতীক আপেল। হলফনামা অনুসারে, তাহমিনা স্নাতক পাস। তাঁর পেশা কৃষিকাজ। এ খাত থেকে তাঁর বছরে আয় ২ লাখ ২০ হাজার টাকা। তাঁর নগদ টাকা রয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং ব্যাংকে জমা রয়েছে ২ হাজার ৫০০ টাকা।

 

তাহমিনা প্রথম আলোকে বলেন, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি নেওয়ার পর এখন স্নাতকোত্তরে পড়ছেন। তবে তাঁর একটি গরুর খামার থাকায় হলফনামায় পেশা কৃষিকাজ লিখেছেন। তাঁর বাবা ইউনুছ আলী কৃষক। মায়ের নাম ফেরদৌছি বেগম। পাঁচ বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি চতুর্থ। তিনি অবিবাহিত।

প্রার্থী হওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তিনি সৎ ও দায়িত্বশীল, প্রার্থী হতে সেটাই সাহস জুগিয়েছে। প্রচারে খরচ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা টাকা দিয়ে লোক আনি না। নির্বাচন কমিশন কাপড়ের ব্যানার করার নির্দেশনা দেওয়ায় আমার খরচ কমে গেছে। নিজের আয় আর দলের ভাই-বোনদের সহায়তায় নির্বাচনী প্রচারের ব্যয় মেটাচ্ছি।’

“আমরা টাকা দিয়ে লোক আনি না। নিজের আয় আর দলের ভাই-বোনদের সহায়তায় নির্বাচনী প্রচারের ব্যয় মেটাচ্ছি”—তাহমিনা আক্তার, নরসিংদী-৫ আসনের প্রার্থী।

প্রচারে নেমে তরুণ ভোটারদের সমর্থন বেশি পাচ্ছেন জানিয়ে তাহমিনা বলেন, বয়স্ক অনেক ভোটার পেছনে পেছনে তাঁকে ‘বেটি মানুষ’ মন্তব্য করে উপেক্ষা করেন, সেই খবর তিনি শুনেছেন। ওই ভোটাররা নির্দিষ্ট কোনো দলের এবং তাঁদের মনোভাব হচ্ছে—প্রার্থীর বয়স কম, আবার নারী, নারীদের তো ঘরেই থাকা উচিত।

ইনসানিয়াত বিপ্লব নতুন ধারার রাজনীতি দাবি করে তিনি বলেন, ‘ভোটারদের কাছে গেলে বুঝতে পারি, তাঁরা এমন দলের প্রার্থীদেরই খুঁজছেন ভোট দেওয়ার জন্য।’

নরসিংদী-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী মো. আশরাফ উদ্দিন। এই আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস থেকে প্রার্থী হয়েছেন তাজুল ইসলাম।

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!