দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব কম্পনের পেছনে একাধিক প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ একসঙ্গে কাজ করছে। যদিও বেশিরভাগ ভূমিকম্পের মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম, তবু ধারাবাহিকভাবে এমন ঘটনা ঘটতে থাকলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
ভূতত্ত্ববিদদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত বিশাল টেকটোনিক প্লেটগুলো সব সময়ই ধীরে ধীরে নড়াচড়া করে। এসব প্লেটের সংযোগস্থল বা ভূ-ফাটলে দীর্ঘদিন ধরে চাপ জমে থাকে। নির্দিষ্ট সময় পর সেই চাপ মুক্ত হলে তা ভূমিকম্পের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। দেশের কিছু এলাকায় সক্রিয় ভূ-ফাটল থাকায় সেখানে মাঝেমধ্যে কম্পন অনুভূত হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
এ ছাড়া ভূ-গর্ভস্থ জলস্তরের পরিবর্তন এবং চাপের তারতম্যও ক্ষুদ্র ভূমিকম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, খনিজ সম্পদ আহরণ কিংবা খনি কার্যক্রমের ফলে মাটির নিচের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। এর প্রভাবে ভূ-গর্ভে চাপের অস্থিরতা তৈরি হয়ে হালকা থেকে মাঝারি মাত্রার কম্পন দেখা দিতে পারে।
প্রাকৃতিকভাবে সক্রিয় ভূ-ফাটলও দেশের কয়েকটি অঞ্চলে ঝুঁকির কারণ হয়ে আছে। এসব ফাটলের নড়াচড়া ও অভ্যন্তরীণ চাপের পরিবর্তনের ফলেই অনেক সময় ভূমিকম্প ঘটে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এমন এলাকায় ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা ও নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করা জরুরি।
মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডও এই পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে বলে মত দিয়েছেন ভূতত্ত্ববিদরা। বড় ধরনের নির্মাণকাজ, ভূ-গর্ভস্থ ড্রিলিং, গ্যাস ও তেল উত্তোলনসহ বিভিন্ন শিল্প কার্যক্রম প্রাকৃতিক ভূ-ফাটলের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। এতে আগে থেকেই দুর্বল এলাকাগুলোতে কম্পনের ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে অনুভূত অধিকাংশ ভূমিকম্প ক্ষুদ্র হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা কম। তবে দীর্ঘ সময় ধরে ঘন ঘন কম্পন ঘটতে থাকলে মাটির স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা কমে যেতে পারে। এতে পুরনো, দুর্বল বা অপরিকল্পিত ভবনের জন্য ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে তারা সতর্ক করেছেন।
ভূমিকম্পের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কম্পন অনুভূত হলে শক্ত কাঠামোর পাশে অবস্থান করা, দরজার চৌকাঠ বা মজবুত টেবিলের নিচে আশ্রয় নেওয়া এবং খোলা জায়গায় যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ভূ-ফাটলপ্রবণ এলাকায় নতুন স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্প সহনশীল নকশা অনুসরণ এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ ও জরুরি প্রস্তুতি জোরদার করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
ভূতত্ত্ববিদরা বলছেন, ঘন ঘন ক্ষুদ্র মাত্রার ভূমিকম্প অনেক ক্ষেত্রে স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও, যদি এর সঙ্গে মাটিতে ফাটল বা তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী কম্পন যুক্ত হয়, তবে তা বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসও হতে পারে। সে কারণে স্থানীয় পর্যায়ে প্রস্তুতি, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।






























