আলজাজিরার বিশ্লেষণ

আওয়ামী লীগ কি অস্তিত্ব সংকটে


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩১, ২০২৬, ১১:৪৪ এএম
আওয়ামী লীগ কি অস্তিত্ব সংকটে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের একাংশ বাধ্য হয়ে ভোটকেন্দ্রে গেলেও, উল্লেখযোগ্য অংশ ভোটে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এই দ্বিধা ও অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে দলটি আদৌ কি অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে, সে প্রশ্ন তুলে বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের মোড় আসে। শেখ হাসিনা ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারত আশ্রয় নিলে আওয়ামী লীগকে সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল অনুপস্থিত অবস্থায় গণহত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। এই প্রেক্ষাপটে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দলটি যেমন সংকটে পড়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়েও গভীর; অনেক সমর্থকের কাছে এখনকার অবস্থাকে দলের ‘নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা’ হিসেবে মনে হচ্ছে। রাজবাড়ীর আওয়ামী লীগসমর্থক রিপন মৃধা জানান, বাবার মুখে শোনা সেই সংকটের কাহিনী এ বছর যেন বাস্তবে ফিরে এসেছে।

আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত গোপালগঞ্জেও ভিন্ন এক মনোভাব তৈরি হয়েছে। সেখানে রিকশাচালক সোলায়মান মিয়াসহ অনেকেই মনে করেন, নৌকা ছাড়া নির্বাচন মানে প্রকৃত নির্বাচন নয়; তাঁদের পরিবার এবার ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এমন মনোভাব স্থানীয় বহু ভোটারের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।

তবে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আরমান মনে করেন, আওয়ামী লীগ কৌশলগত কারণে আপাত নীরব থাকলেও এটিকে রাজনীতি থেকে মুছে ফেলা যাবে না। তাঁর ধারণা, শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই দলটি কোনো না কোনো সময়ে রাজনৈতিক ময়দানে ফিরে আসবে।

এর বিপরীতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জবান পত্রিকার সম্পাদক রেজাউল করিম রনি মনে করেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পরই আওয়ামী লীগের টিকে থাকার সংকট আরও প্রকট হতে পারে। তাঁর মতে, নির্বাচনোত্তর বাস্তবতায় দলটির সমর্থকেরা স্থানীয় প্রভাবশালী অন্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিলে আওয়ামী লীগের পুরোনো সমর্থনভিত্তি পুনর্গঠন কঠিন হয়ে পড়বে। তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে ভবিষ্যৎ কল্পনা করা যায় কি না—এই প্রশ্ন ঘিরেই দলটির ভেতরে বিভাজন স্পষ্ট হচ্ছে; দীর্ঘ স্বৈরাচারী শাসনে অনেক সমর্থক হতাশ, ফলে আগের জায়গায় ফেরাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জামায়াতে ইসলামীর উদাহরণ আওয়ামী লীগের জন্য এক ধরনের রেফারেন্স হতে পারে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার দায়ে বারবার নিষিদ্ধ ও দমন-পীড়নের মুখোমুখি হলেও জামায়াত টিকে আছে এবং সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী তাদের জন্য এটি হতে পারে ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফলের সময়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ আলজাজিরাকে বলেন, আওয়ামী লীগের প্রভাব কেবল দলীয় সংগঠনেই সীমাবদ্ধ নয়; এর একটি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ভিত্তি রয়েছে, যা পুরোপুরি মুছে দেওয়া কঠিন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এক জরিপে এখনো প্রায় ১১ শতাংশ ভোটারের সমর্থন আওয়ামী লীগের পক্ষে আছে বলেও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে কোনো নির্বাচনকে পূর্ণ অর্থে গণতান্ত্রিক বলা কঠিন। তবে দীর্ঘদিনের দমন-পীড়ন ও বিতর্কিত শাসন ব্যবস্থার কারণে অনেকের কাছে দলটি বৈধতা হারিয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর মতে, দক্ষিণ এশিয়ার বংশানুক্রমিক দলগুলো সহজে বিলীন হয় না; পরিস্থিতি বদলালে তাদের ফেরার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ কার্যত অচল অবস্থায় আছে—এমন মূল্যায়নই উঠে এসেছে আলজাজিরার এই বিশ্লেষণে।

Link copied!