প্রচার শুরুর আট দিনে ৪২টি নির্বাচনী সহিংসতা: চারজন নিহত, ৩৫৩ জন আহত


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ৩০, ২০২৬, ১১:৪৩ এএম
প্রচার শুরুর আট দিনে ৪২টি নির্বাচনী সহিংসতা: চারজন নিহত, ৩৫৩ জন আহত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর মাত্র আট দিনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ৪২টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর হিসাবে এসব ঘটনায় চারজন নিহত হয়েছেন এবং ৩৫৩ জন আহত হয়েছেন। চলতি জানুয়ারি মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার মোট ঘটনা ৬৫টি। এতে অন্তত ১০ জন নিহত এবং ৫৫৫ জন আহত হয়েছেন।

সংসদ নির্বাচন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে। ২২ জানুয়ারি থেকে প্রার্থীদের প্রচারণা শুরু হয়েছে এবং ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত চলবে। এর মধ্যেই দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে পাল্টা হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা বেড়েছে। নির্বাচনী জনসভায় একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগের তীর ছোড়া কখনো কখনো সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। এসব ঘটনায় সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বিরাজ করছে। ১২ ফেব্রুয়ারির ভোট কতটা শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন থাকবে, সে ব্যাপারে প্রশ্ন উঠেছে।

গত বুধবার শেরপুরের শ্রীবর্দী উপজেলায় ঝিনাইগাতী উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ার নিয়ে বসার ঘটনা থেকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে শ্রীবর্দী উপজেলা জামায়াত সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম নিহত হন। তিনি ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক ছিলেন।

পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম গতকাল রাতে বলেন, "ভোট সম্পন্ন করতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এরপর যদি দু-চারটি ঘটনা ঘটে, তা নির্বাচনের জন্য বড় বাধা নয়। আমাদর যা যা করণীয়, তা নিচ্ছি। বাংলাদেশে সব নির্বাচনে কম-বেশি সংঘর্ষ হয়ে থাকে।"

মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, "নির্বাচন ঘিরে প্রার্থীদের প্রচার কার্যক্রমে যে রাজনৈতিক সহিংসতা দেখা যাচ্ছে, তা উদ্বেগের কারণ। গত আট দিনে দেশে অন্তত ৪২টি সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু ও সাড়ে তিনশ' বেশি মানুষের আহত হওয়া স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় নির্বাচনী পরিবেশ এখনও নিরাপদ ও সহনশীল হয়ে ওঠেনি। নিহতদের একজন নারী। যিনি নিজে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থেকেও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুরোনো দুঃখজনক চিত্র।"

তিনি আরও বলেন, "সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে হলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা জরুরি। শেরপুরের ঝিনাইগাতীর ঘটনাটি প্রশাসনিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাই তুলে ধরে। নির্বাচনের দিন যত এগিয়ে আসছে, জনমনে অস্বস্তি তত বাড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও সতর্ক অবস্থানে থাকতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও বড় ভূমিকা নেওয়ার বিষয় আছে। দলীয় নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে। নেতাকর্মীকে সংযত থাকা ও ধৈর্যের বার্তা দিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে নির্বাচন হলো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার একটি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়া রক্তাক্ত হলে, বিতর্কিত হলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো রাষ্ট্র।"

পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, তপশিল ঘোষণার পর ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন ঘিরে ২০০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রার্থীর ওপর আক্রমণের ঘটনা ৯টি, প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ৭৩টি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ২টি, হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন ৮টি, প্রচারকাজে বাধা ২২টি, নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ১৪টি, আক্রমণাত্মক আচরণ ১৫টি, রাজনৈতিক হত্যা ৪টি, সংখ্যালঘুর ওপর আক্রমণ ১টি, অবরোধ-বিক্ষোভ ১১টি এবং অন্যান্য কারণে ৪২টি। এই সংঘাতগুলো মূলত বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে হয়েছে।

আসক জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ধারাবাহিক রূপ ধারণ করেছে। ২০২৫ সালে এটি আরও বিস্তৃত ও সহিংস হয়েছে। গত বছর জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪০১টি ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং ৪ হাজার ৭৪৪ জন আহত হয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে ৩৫টি সংঘর্ষে ১০ জন নিহত, ৪৫৪ জন আহত; বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩৩টিতে ৩ জন নিহত, ৫২০ জন আহত; বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ১৯২টি ঘটনায় ৩৯ জন নিহত, ২৩৮০ জন আহত হয়েছেন।

অন্যান্য উল্লেখযোগ্য হত্যার ঘটনায় রয়েছে—১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় নির্বাচনী প্রচারণায় বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমান ওমর রুবেলের সমর্থকদের সংঘর্ষে নজরুল ইসলাম নিহত। ২১ জানুয়ারি নাটোরের সিংড়ায় জিয়া পরিষদ সদস্য মো. রেজাউল করিমকে গলা কেটে হত্যার জেরে আসামি আব্দুল ওহাবের বাড়িতে আগুন দেওয়ায় ছাবিহা বেগম দগ্ধ হয়ে মারা যান। ২৪ জানুয়ারি কেরানীগঞ্জে বিএনপি নেতা হাসান মোল্লা গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ১২ ডিসেম্বর ঢাকার পল্টনে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে মৃত্যু হয়।

কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে ২৩ জানুয়ারি জনসভায় চেয়ার নিয়ে বিএনপি-যুবদল সংঘর্ষে ৩০ জন আহত। মেহেরপুরে জামায়াত নারীকর্মীদের হেনস্তার অভিযোগ। পটুয়াখালী, সিরাজগঞ্জ, নওগাঁয় বিএনপি জোট ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সংঘর্ষে একাধিক আহত হয়েছেন।

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!