আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনামে গত কয়েক মাস ধরে এক নাম বারবার উঠে আসছে—‘এপস্টেইন ফাইল’। এই নথির পাতা উল্টালে প্রকাশ পায় এক অভূতপূর্ব যৌন নিপীড়ন ও নারী পাচারের নেটওয়ার্কের গল্প। মূল চরিত্র মার্কিন বিনিয়োগকারী জেফরি এপস্টেইন—যিনি গণিতের শিক্ষক থেকে উঠে এসেছিলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, তারকা ও রাজনীতিবিদদের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী হিসেবে পরিচিত এক রহস্যময় ব্যক্তিত্ব। তার সঙ্গে যোগাযোগ ছিল সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন, ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, মাইকেল জ্যাকসন, কেভিন স্পেসির মতো বিশ্বের প্রভাবশালী নামের সঙ্গে।
এই নথিগুলো কেবল ছবি বা নামের তালিকা নয়; এগুলো হাজার হাজার ই-মেইল, ফ্লাইট লগ, হোটেল রেকর্ড এবং সাক্ষ্যপত্রের সমাহার, যা এপস্টেইনের অপরাধ তদন্ত থেকে উদ্ভূত। ২০১৯ সালে তার কারাগারে মৃত্যুর পর থেকে এই নথি প্রকাশের দাবি চলছিল। গত বছর মার্কিন কংগ্রেসের আইনের ফলে ধাপে ধাপে প্রকাশ শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে—কেন এত দেরি? কারা আড়াল করতে চেয়েছে? এই ফিচারে আমরা বিস্তারিতভাবে খুঁজে বের করব এপস্টেইনের জীবনের উত্থান-পতন, তার নেটওয়ার্ক, নথির বিষয়বস্তু এবং এর রাজনৈতিক-সামাজিক প্রভাব।
দরিদ্র শিক্ষক থেকে ওয়াল স্ট্রিটের তারকা
জেফরি এপস্টেইনের জীবনী যেন একটি আমেরিকান ড্রিমের অন্ধকার সংস্করণ। ১৯৫৩ সালে নিউইয়র্কের কোনি আইল্যান্ডে শ্রমিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। কলেজ না শেষ করেও গণিতে অসাধারণ প্রতিভা দেখান। ১৯৭৬ সালে জর্জিয়ার ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান শিক্ষকতা শুরু করেন। নিউইয়র্ক টাইমসের তথ্যমতে, এক ছাত্রের বাবা তাকে প্রদর্শনীতে নিয়ে যান, যেখানে আরেক ছাত্রের বাবার মাধ্যমে পরিচিত হন বিয়ার স্টার্নস ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তা এস গ্রিনবার্গের সঙ্গে।
ওয়াল স্ট্রিটে পা রাখার পর এপস্টেইনের ভাগ্য পাল্টে যায়। গ্রিনবার্গ তার গণিতের প্রতিভায় মুগ্ধ হন এবং চাকরি দেন। কিন্তু এপস্টেইনের কলেজ ডিগ্রি না থাকার কথা জানাজানি হলে বরখাস্ত হন। তবু গ্রিনবার্গের মেয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে তিনি ছাড় পান। এরপর তিনি উড়তে শুরু করেন। ১৯৮০-এর দশক থেকে ফ্লোরিডার পাম বিচে নিয়মিত যাত্রা শুরু করেন, যেখানে তরুণীদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে ওঠে। বিবিসির তথ্যমতে, ১৯৮২ সালে ‘জে এপস্টেইন অ্যান্ড কো’ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, যা ১ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ব্যবস্থাপনা করত।
তার সম্পদ বাড়তে থাকে। ফ্লোরিডায় প্রাসাদ, নিউ মেক্সিকোতে ১০,০০০ একরের র্যাঞ্চ, নিউইয়র্কে টাউনহাউস, প্যারিসে অ্যাপার্টমেন্ট কেনেন। প্রাইভেট জেট ‘ললিটা এক্সপ্রেস’ কিনে তারকাদের আমদানি-নির্গমন শুরু করেন। এপস্টেইন প্রায়ই মিথ্যা বলতেন—কখনো বলতেন তার ক্লায়েন্ট লেস ওয়েক্সনার (ভিক্টোরিয়া সিক্রেটের মালিক), কখনো নিজেকে বিলিয়নেয়ার বলে দাবি করতেন। কিন্তু তার নেটওয়ার্ক ছিল সত্যিকারের—রাজনীতিবিদ, শিল্পী, বিজ্ঞানী সবার সঙ্গে।
তারকাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা—সামাজিক উত্থানের চাবিকাঠি
১৯৯০-এর দশকে এপস্টেইন নিউইয়র্কের উচ্চ সমাজে প্রবেশ করেন। ১৯৮৬ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইভানা ট্রাম্পের সঙ্গে ছবি তোলা হয়। ২০০০ সালে মার-এ-লাগো ক্লাবে ট্রাম্প, মেলানিয়া ও গিসলাইন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল ছবি। ট্রাম্প বলেছিলেন, "জেফরি দারুণ লোক, তবে তার নিয়ম মেনে চলে না।"
বিল ক্লিনটনের সঙ্গে যোগাযোগ ২০০২ সালে গভীর হয়। এপস্টেইনের জেটে ক্লিনটন আফ্রিকায় এইচআইভি জনসচেতনতা প্রচারে যান। সঙ্গী ছিলেন কেভিন স্পেসি, ক্রিস টাকার, সারা ফার্গুসন। ক্লিনটন ২৬টি ফ্লাইটে চড়েন। ২০০৩ সালে হার্ভার্ডে ৩ কোটি ডলার অনুদান দেন এপস্টেইন। যুক্তরাজ্যের পিটার ম্যান্ডেলসনের সঙ্গেও যোগাযোগ। ব্রিটিশ রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর হয়—প্রিন্স অ্যান্ড্রু স্যান্ডরিংহ্যামে এপস্টেইনের সঙ্গে দেখা করেন।
এই যোগাযোগ ছিল কৌশলগত। এপস্টেইন তারকাদের আমন্ত্রণ জানাতেন দানে, ভ্রমণে, পার্টিতে। তার পাম বিচ প্রাসাদে ‘ম্যাসাজ রুম’ ছিল, যেখানে তরুণীরা আসত। মাইকেল জ্যাকসন, ডায়ানা রস, মিক জ্যাগারের ছবি সেখান থেকে উঠে আসে। এপস্টেইন নিজেকে ‘সায়েন্সের উৎসাহী’ বলে পরিচয় দিতেন, কিন্তু তার উদ্দেশ্য ছিল অন্য।
অপরাধের ছায়া—কিশোরী নিপীড়নের নেটওয়ার্ক
অপরাধের প্রথম আলোকপাত ২০০৫ সালে। ফ্লোরিডার পাম বিচে ১৪ বছরের কিশোরীর মা-বাবা পুলিশে অভিযোগ করেন। তল্লাশিতে বাড়িতে ৪০টির বেশি তরুণীর ছবি পাওয়া যায়। এপস্টেইন ‘ম্যাসাজ’ এর নামে কিশোরীদের ডেকে নিপীড়ন করতেন এবং তাদের বন্ধুদের ডেকে পুরস্কার দিতেন। পুলিশ রিপোর্টে ৩৬ জন ভুক্তভোগীর নাম।
২০০৮ সালে দোষী সাব্যস্ত হন, কিন্তু বিশেষ চুক্তিতে মাত্র ১৩ মাস কারাদণ্ড পান—দিনে ১২ ঘণ্টা কাজের সুবিধায়। এই ‘সুইট ডিল’ এর পেছনে তার প্রভাবশালী নেটওয়ার্কের ভূমিকা ছিল। ২০১৮ সালে মিয়ামি হারাল্ডের তদন্তে নতুন করে মামলা ওঠে। ২০১৯ সালের জুলাই গ্রেপ্তার হন নিউইয়র্কে। আগস্টে কারাগারে মৃত—আত্মহত্যা বলা হলেও ষড়যন্ত্রের গুজব ছড়ায়। ২০২১ সালে গিসলাইন ম্যাক্সওয়েল ২০ বছরের কারাদণ্ড পান।
‘এপস্টেইন ফাইল’ এর জন্ম ও প্রকাশ
তদন্তে পাওয়া ১ লাখের বেশি পাতার নথি—ই-মেইল, ফ্লাইট লগ, ফোন রেকর্ড। ভুক্তভোগীরা প্রকাশের দাবি করেন। আইনি বাধায় আটকে থাকে। গত বছর কংগ্রেস আইন পাস করে। ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫-এ ডিওজি আংশিক প্রকাশ করে। সম্প্রতি কয়েক লাখ পাতা ধাপে ধাপে আসছে। নথিতে নামের তালিকা, ছবি, চিঠিপত্র।
নথির সবচেয়ে বোমা ছবি ও তথ্য
প্রিন্স অ্যান্ড্রু: স্যান্ডরিংহ্যামে নারীদের কোলে শুয়ে ম্যাক্সওয়েলের পাশে। এতে রাজকীয় উপাধি হারান। সারা ফার্গুসন লিখেছেন, "জাস্ট ম্যারি মি।"
বিল ক্লিনটন: হট টাবে, জেটে ২৬ ফ্লাইট। মাইকেল জ্যাকসন, স্পেসির সঙ্গে। ক্লিনটন বলেন, "অপরাধ জানতাম না।"
ডোনাল্ড ট্রাম্প: মার-এ-লাগোতে মেলানিয়া-ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে। ১৬টি ফাইল সরানো হয়।
অন্যান্য: ম্যান্ডেলসন পদত্যাগ করেন। টাকার, স্পেসির ছবি। ছবিতে অপরাধ প্রমাণ নেই, কিন্তু যোগাযোগ প্রকাশ পায়।
অধ্যায় ৬: রাজনৈতিক যুদ্ধ—ট্রাম্প vs ডেমোক্র্যাট
ট্রাম্প ও রিপাবলিকানরা প্রকাশের বিরোধী। ডেমোক্র্যাটরা অভিযোগ করে আড়াল করছে। চাক শুমার বলেন, "ফাইল সরানো থেকে সত্যি বোঝা যায়।" ভুক্তভোগীরা স্বচ্ছতা চান। এটি ২০২৪ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে।
এপস্টেইনের মৃত্যু নেটওয়ার্ক শেষ করেনি। ফাইল প্রকাশ রাজনীতি, সমাজকে প্রশ্ন তুলেছে—ক্ষমতাধররা কতটা জড়িত? এই ফিচার শেষ হলেও বিতর্ক চলবে।







































