• ঢাকা
  • শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯

শিশুদের থ্যালাসেমিয়া রোগে যা করণীয়


ঝুমকি বসু
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২২, ০৩:৫৬ পিএম
শিশুদের থ্যালাসেমিয়া রোগে যা করণীয়

এই তো কিছুদিন আগের কথা। শোভনের একমাত্র সন্তানটি মারা গেছে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে। তার স্ত্রী শম্পা আবার সন্তানসম্ভবা। শোভনের মনে প্রশ্ন, কীভাবে জানা যাবে তার এই ভ্রূণের শিশুটিও থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কি না? শোভনের মতো আমাদের অনেকেরই খুব একটা ভালো ধারণা নেই এ রোগটি সম্পর্কে। চলুন শিশুদের থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বিস্তারিত জানাচ্ছেন ঢাকা শিশু হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. মাকসুদুর রহমান।

রোগের প্রকৃতি
থ্যালাসেমিয়া একটি জন্মগত রোগ। এই রোগের বাহক হলেন সন্তানের বাবা-মা। এই জন্মগত রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া রোগটি জিন থেকেই গর্ভাবস্থায় শিশুর মধ্যে আসে। তবে থ্যালাসেমিয়ার বাহক স্বামী-স্ত্রী দুজনে হলেই যে তাদের সন্তানও থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হবেই, এমন কোনো কথা নেই। সেক্ষেত্রে গর্ভস্থ শিশু শতকরা পঁচিশ শতাংশ স্বাভাবিক হতে পারে এবং পঞ্চাশ শতাংশ এই রোগের বাহক হতে পারে। বাবা-মা বাহক হলে যদি সন্তান থ্যালাসেমিক হয়ে জন্মায় সেই সন্তানের মৃত্যু নিশ্চিত। শুধু সময়ের প্রতীক্ষা মাত্র।

রোগের লক্ষণ 
এই রোগে আক্রান্ত শিশু জন্মানোর পর থেকে ছয় মাসের মধ্যে আস্তে আস্তে ফ্যাকাসে হতে শুরু করে। কারণ একজন সুস্থ-স্বাভাবিক শিশুর ক্ষেত্রে যেখানে রক্তে ফিটাল হিমোগ্লবিনের পরিমাণ শতকরা ৭০-৮০ ভাগ থাকে, সেখানে আক্রান্ত শিশু জন্মানোর ছয়মাস পর থেকেই রক্তে হিমোগ্লবিনের পরিমাণ কমতে কমতে শতকরা ২-৩ ভাগে এসে পৌঁছায়। তাই শিশু রক্তশূন্য হয়ে পড়ে। এছাড়া যে বয়সে শিশুর দাঁড়ানোর কথা, বসতে শেখার কথা, কথা বলতে পারার কথা, শিশুর এইসব স্বাভাবিক বিকাশ নিয়ম অনুযায়ী হয় না। শিশুর প্লীহা, লিভার বড় হয়ে যায়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠে।

চিকিৎসা 
থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশুর রক্ত যেহেতু হিমোগ্লোবিন বা লোহিত রক্তকণিকা তৈরি করতে পারে না, তাই আক্রান্ত শিশুর রক্তে হিমোগ্লোবিন দিতে হয়। রোগীকে এক থেকে দুই ইউনিট রক্ত প্রতি একুশ দিন পর পর দিতে হয়। এছাড়া থ্যালাসেমিয়া রোগী খাবারের সঙ্গে শতকরা পঞ্চাশ শতাংশ আয়রন গ্রহণ করলেও তা হজম করতে পারে না। বরং এই আয়রনই শরীরের লিভার, প্লীহা, হার্ট, অগ্নাশয়ে জমে শিশুর নানা অসুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেসব খাবারে আয়রন আছে, যেমন : লাল মাংস, মেটে ইত্যাদি রোগীর খাওয়া উচিত নয়। বরং ভাত, ডাল, সবজি, মাছ, দুধ, চা খাওয়া উচিত। কারণ এসব খাবার শরীরে আয়রন জমতে দেয় না। তবে ইঞ্জেকশন দিয়ে রোগীর শরীর থেকে জমে যাওয়া আয়রন বের করে ফেলা যায়। কিন্তু তারপরও থ্যালাসেমিয়ার কার্যকর চিকিৎসা এখনও আবিষ্কৃত হয়নি। একুশ দিন পর পর রক্ত দিয়েও রোগীকে বড়জোর পঁচিশ-ত্রিশ বছর পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখা যায়।

সতর্কতা 
স্বামী-স্ত্রী যদি না জানেন তারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না তাহলে স্ত্রী গর্ভবতী হলেই পরীক্ষা করে জেনে নিন দুজনের কেউ এই রোগের বাহক কি না? যদি দুজনেই বাহক হন, তাহলে পরীক্ষা করে জেনে নিন গর্ভস্থ ভ্রূণটি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কি না? আর এই পরীক্ষা অবশ্যই গর্ভধারণের বারো সপ্তাহের মধ্যেই করা উচিত। আর প্রথমেই যেটা করা উচিত, তা হলো নিজের পরীক্ষা করানো, যে আপনি নিজে এই রোগের বাহক কি না? আর তা করে নিতে হবে বিয়ের আগেই। আপনি যদি বাহক হয়ে থাকেন, তাহলে বিয়ের আগে অবশ্যই আপনার হবু স্বামী বা স্ত্রীকে পরীক্ষা করিয়ে দেখে নিন তিনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না? কারণ দুজন থ্যালাসেমিয়া বাহকের মিলিত সন্তানই শুধুমাত্র এই রোগের শিকার হয়। সুতরাং আপনার শিশুর ভবিষ্যৎ আপনারই হাতে। আপনিই একমাত্র পারেন আপনার শিশুকে এই রোগের হাত থেকে বাঁচাতে। আর তার জন্য প্রয়োজন সজাগ দৃষ্টিভঙ্গি এবং সচেতনতা।

Link copied!