• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ১৮ আগস্ট, ২০২২, ৩ ভাদ্র ১৪২৯
চিকিৎসকের পরামর্শ

ডায়াবেটিস রোগীর দাঁতের যত্নে করণীয় কী?


নাইস নূর
প্রকাশিত: আগস্ট ২, ২০২২, ০১:৩২ পিএম
ডায়াবেটিস রোগীর দাঁতের যত্নে করণীয় কী?

ডায়াবেটিস রোগ একধরনের মেটাবলিক ডিজঅর্ডার। এটি নিরাময় যোগ্য নয়। তবে নিয়ন্ত্রণে রেখে সুস্থ জীবন পাওয়া সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন হয় নিয়মিত চেকআপ, ওষুধ, ইনসুলিন, শরীরচর্চা এবং স্বাস্থ্যকর খাবার ও জীবনযাপন। 

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস নানা রোগের জন্ম দেয়। বলা যায়, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্ষমতায় প্রভাব ফেলে অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। বাদ যায় না, দাঁতের স্বাস্থ্যও। দীর্ঘ সময় ডায়াবেটিস রোগে ভুগলে তা ধীরে ধীরে দাঁতের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের দাঁতের যত্নে শুরু থেকেই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ-কে জানিয়েছেন এম এইচ শমরিতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রভাষক ডা: ঈষিকা নাজনীন।

প্রভাষক ডা: ঈষিকা নাজনীন জানান, যখন ডায়াবেটিস থাকে তখন রক্তে শর্করার পরিমাণ বেশি থাকে। যা দাঁত ও মাড়িসহ দেহের বিভিন্ন অংশে প্রভাব ফেলে। তবে এটি প্রতিরোধ রোগীর হাতে। রোগী কীসের বিরুদ্ধে আছেন তা জানা থাকলে, দাঁতের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিতে পারবেন। রোগীর টাইপ ১ ডায়াবেটিস বা টাইপ ২ ডায়াবেটিস যাই হোক না কেন, রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা গুরুত্বপূর্ণ।  যার রক্তে শর্করার মাত্রা যত বেশি, তার স্বাস্থ্য ঝুঁকিও তত বেশি। 

প্রভাষক ডা: ঈষিকা নাজনীনের পরামর্শে ডায়াবেটিস রোগীদের দাঁতে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়েই বিস্তারিত থাকছে সংবাদ প্রকাশ-এর আজকের আয়োজনে।

দাঁতের ক্ষয়

মুখে স্বাভাবিকভাবেই অনেক  ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে। যখন খাবার এবং পানীয়ের স্টার্চ এবং শর্করা এই ব্যাকটেরিয়াগুলোর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তখন দাঁতে প্লাক নামে পরিচিত একটি আঠালো ফিল্ম তৈরি হয়। প্লাকের অ্যাসিড দাঁতের উপরিভাগে (এনামেল এবং ডেন্টিন) আক্রমণ করে। যার ফলে ডেন্টাল ক্যারিজ এবং মাড়ির রোগ হতে পারে।

প্রারম্ভিক মাড়ির রোগ (জিনজিভাইটিস)

ডায়াবেটিস ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে লড়াই করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। যদি নিয়মিত ব্রাশিং এবং ফ্লসিং দিয়ে প্ল্যাক অপসারণ না করা হয় তবে এটি  মুখের গামলাইনের নিচে টার্টার (ডেন্টাল ক্যালকুলাস) নামক পদার্থে শক্ত হয়ে যাবে। দাঁতে যত লম্বা ফলক এবং টারটার থাকে, তত বেশি তারা দাঁতের গোড়ার চারপাশে মাড়ির অংশে জ্বালাপোড়া শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাড়ি ফুলে যায় এবং সহজেই রক্তপাত হয়। এটি জিনজিভাইটিস নামে পরিচিত।

পেরিওডন্টাইটিস 

যদি দাঁতের চিকিত্সা না করা হয়, তবে জিনজিভাইটিস পেরিওডন্টাইটিস নামে আরও গুরুতর সংক্রমণের দিকে পরিচালিত করতে পারে। যা দাঁতকে সমর্থনকারী নরম টিস্যু এবং হাড়কে ধ্বংস করে দেয়। অবশেষে পেরিওডন্টাইটিস মাড়ি এবং চোয়ালের হাড়কে দাঁত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যার ফলে দাঁত আলগা হয়ে যায় এবং পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে পেরিওডন্টাইটিস আরও গুরুতর হতে থাকে কারণ ডায়াবেটিস সংক্রমণ প্রতিরোধ করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং নিরাময়কে ধীর করে দেয়।

ওরাল থ্রাশ

ডায়াবেটিস রোগীদের ওরাল থ্রাশ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি হতে পারে। যা ক্যান্ডিডা অ্যালবিক্যানের সৃষ্ট একটি ছত্রাক সংক্রমণ। থ্রাশের লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে মুখের ভেতরে বেদনাদায়ক সাদা বা লাল ছোপ। সুষ্ঠ মৌখিক স্বাস্থ্যবিধি অনুশীলন করা ওরাল থ্রাশ এড়াতে সাহায্য করতে পারে।

শুষ্ক মুখ (জেরোস্টোমিয়া)

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত কিছু মানুষ মুখে লালার অভাব অনুভব করে। এটি একটি অবস্থা যা শুষ্ক মুখ হিসাবে পরিচিত।  মুখকে আর্দ্র রাখতে এবং দাঁত স্বাভাবিকভাবে পরিষ্কার রাখার জন্য মুখের লালা ছাড়া দাঁতের ক্ষয়, মাড়ির রোগ এবং থ্রাশের ঝুঁকি থাকতে পারে।

 

ডায়াবেটিস রোগীদের দাঁতের পরিচর্যা যা করতে হবে সেই বিষয়েও জানিয়েছেন ডা: ঈষিকা নাজনীন। তিনি বলেন, “ প্রতিদিন অন্তত দুবার দাঁত ব্রাশ করতে হবে। সকালে ও রাতে। এছাড়াও স্ন্যাকস বা অন্যান্য খাবারের পরও ব্রাশ করতে হবে। ফ্লোরাইডযুক্ত একটি নরম-ব্রিস্টেড টুথব্রাশ এবং টুথপেস্ট ব্যবহার করতে হবে। জোরালো বা কঠোর স্ক্রাবিং এড়িয়ে চলতে হবে। যা মাড়িকে জ্বালাতন করতে পারে।“ 

“অন্তত প্রতি তিন মাসে একটি নতুন টুথব্রাশ কিনে ব্যাবহার করতে হবে। দিনে অন্তত একবার দাঁত ফ্লস করার অভ্যাস করতে হবে। ফ্লসিং দাঁতের মাঝখানে এবং মাড়ির নিচের প্ল্যাক অপসারণ করতে সাহায্য করে।“

“নিয়মিত ডেন্টাল ভিজিট করাতে হবে। পেশাদারভাবে মাড়ী এবং দাঁত পরিষ্কার ( স্কেলিং ), এক্স-রে এবং চেকআপের জন্য বছরে অন্তত দুই বার ডেন্টিস্টের কাছে যাওয়া জরুরি।“

“ডেন্টিস্টকে রোগীর ডায়াবেটিসের বিষয়ে জানাতে হবে। রোগী যখনই তার ডেন্টিস্টের কাছে যাবেন, তাকে মনে করিয়ে দিতে হবে যে তার ডায়াবেটিস আছে।“

“রোগীকে মাড়ির রোগের প্রাথমিক লক্ষণগুলো সন্ধান করতে হবে নিজে থেকে। মাড়ির রোগের যে কোনেও লক্ষণ  যার মধ্যে লালভাব, ফুলে যাওয়া এবং মাড়ি থেকে রক্তপাত- সবকিছু ডেন্টিস্টের কাছে রিপোর্ট করতে হবে।“

“এছাড়াও অন্য কোনও লক্ষণ এবং উপসর্গ যেমন শুষ্ক মুখ, আলগা দাঁত বা মুখের ব্যথা থাকলে তা খেয়াল রাখতে হবে। চিকিৎসকের কাছে সববিষয় উল্লেখ করতে হবে।“ 

“ধূমপান মাড়ির রোগ এবং শেষ পর্যন্ত দাঁতের ক্ষতিসহ গুরুতর ডায়াবেটিস জটিলতার ঝুঁকি বাড়ায়। তাই ডায়াবেটিস রোগীদের ধূমপান থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।“

সবশেষে ডা: ঈষিকা নাজনীন বলেন, “ডায়াবেটিস পরিচালনা করা একটি আজীবন প্রতিশ্রুতি। এতে সঠিক দাঁতের যত্ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রোগীর চেষ্টা থাকলে স্বাস্থ্যকর দাঁত এবং মাড়িসহ রোগী আজীবন ভালো থাকতে পারবেন।"