আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উঠান বৈঠক, নির্বাচনী জনসভা আর গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের প্রার্থীরা। সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের ১৯টি ইউনিয়নের প্রতিটি পাড়া-মহল্লা ও গ্রামে এখন ভোটের আমেজ। শীত কিংবা ধূলোবালি—কোনো কিছুই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে না প্রার্থীদের পদচারণায়। প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে কেউ কেউ উত্তপ্ত ও বিষোদগার পূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হচ্ছে। আচরণবিধি ভঙ্গের লিখিত অভিযোগ জমা পড়ছে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রার্থীদের জরিমানা করার ঘটনাও ঘটছে।
বিএনপির সাবেক সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় এই আসন দেশব্যাপী আলোচনায়। মিডিয়ার বিশেষ নজরও রয়েছে এখানে। গত মঙ্গলবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি পর্যবেক্ষক দল তার শাহবাজপুরের বাসভবনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করে নির্বাচনী কার্যক্রম ও পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়েছেন। ইতোমধ্যে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাইলে নির্বাচনী জনসভা করে নিজ দল ও জোটের প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চেয়েছেন। জয়লাভের বিষয়ে আশাবাদী সব প্রার্থীই, তবে শেষ হাসিটা থাকবে শুধুমাত্র একজনের ভাগ্যে।
নির্বাচনী উত্তাপে মুখরিত ১৯ ইউনিয়ন
দলীয় ও স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, এখন থেকে মাত্র দুই সপ্তাহ পরেই সংসদ নির্বাচন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের প্রতিটি ইউনিয়নের প্রতিটি পাড়া-মহল্লা ও গ্রামে এখন নির্বাচনী প্রচারণার ঢেউ। প্রার্থীদের ঘনঘন পদচারণায় মুখরিত গ্রামগুলো। অবস্থা বুঝে বিভিন্ন সভা বা অনুষ্ঠানে দেওয়া হচ্ছে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি। প্রার্থীরা একে অপরকে টপকাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ভোটারদের মন জয় করতে।
বিএনপি-জমিয়ত জোট: মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবের প্রচারাভিযান
এই আসনে বিএনপি-জমিয়ত জোটের প্রার্থী খতিবে বাঙ্গাল মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীব। মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই তিনি স্থানীয় বিএনপি ও দলটির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে চষে বেড়াচ্ছেন নির্বাচনী মাঠ। খেজুরগাছ প্রতীক নিয়ে ছুটছেন গ্রাম থেকে গ্রামে। প্রতিটি ইউনিয়নে উঠান বৈঠক ও নির্বাচনী জনসভা করছেন তিনি। পাড়া-মহল্লায় ঘুরেফিরে ভোট, দোয়া এবং সমর্থন চাইছেন ভোটারদের কাছে। উপজেলার পাশাপাশি জেলা পর্যায়ের নেতাদেরও সভায় হাজির করছেন শক্তি প্রদর্শনের জন্য।

স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা: দীর্ঘ প্রস্তুতির পরীক্ষা
দলীয় মনোনয়নের প্রত্যাশায় গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে এই নির্বাচনী এলাকায় কাজ করে আসছেন বিএনপির সাবেক সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও সংরক্ষিত আসনের সাবেক এমপি, ভাষাসৈনিক প্রয়াত অলি আহাদের মেয়ে ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা। এই সময়ে এলাকায় বেশকিছু উন্নয়নমূলক কাজও করেছেন তিনি। কিন্তু জোটের কারণে দল তাকে মনোনয়ন দেয়নি। ফলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন রুমিন। তার প্রতীক হাঁস।
নিজ নির্বাচনী এলাকার আনাচে-কানাচে ছুটে চলেছেন রুমিন ফারহানা। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলা, জনসভা, জনসংযোগ—কোনো কিছুতেই পিছিয়ে নেই তিনি। তার শ্রুতিমধুর বক্তব্যের ফুলঝুরি এবং উন্নয়নের পরিকল্পনার বয়ানে মুগ্ধ হচ্ছেন সব শ্রেণি-পেশা ও বয়সের নারী-পুরুষ। রুমিনের পথসভাসহ সব কর্মসূচিতেই মানুষের ঢল নামছে। আগামী সংসদে জয়লাভ করে যাওয়ার বিষয়ে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করছেন।
তরুণ দে: হিন্দু-বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রত্যাশার প্রতীক
দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপির আরেক কেন্দ্রীয় নেতা তরুণ দে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যানও। নির্বাচনী এলাকার সর্বত্র দিনরাত বিচরণ করছেন তিনি। নির্বাচিত হলে প্রতিটি ইউনিয়নের উন্নয়ন পরিকল্পনা ভিডিও বক্তব্যের মাধ্যমে প্রচার করছেন তরুণ দে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ তার দিকে আশাবাদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

জাপার জিয়াউল হক মৃধা: সাবেক এমপির পুনর্জাগরণ
৫ই আগস্টের পর নিজেকে কিছুটা আড়ালে রাখলেও গত ১০-১২ দিন ধরে ভোটের মাঠে সরব হয়ে উঠেছেন এই আসনের মহাজোটের সাবেক দুইবারের এমপি জাপার কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধা। জাপার মনোনীত এই প্রার্থী এর আগে প্রতিনিধি দিয়ে মনোনয়নপত্র ক্রয় ও জমা দিয়েছিলেন। যাচাই-বাছাই শেষে বৈধ হওয়ায় এখন তিনি পুরোদমে ভোটের মাঠে।
জনসভা, উঠান বৈঠক আর জনসংযোগে এখন খুবই ব্যস্ত তিনি। ১০ বছরে নিজের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে তুলে ধরে ভোট প্রার্থনা করছেন। নড়েচড়ে বসেছে জাপার ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটির লোকজনও। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিষয়ে তিনি অত্যন্ত আশাবাদী।
তবে সংবাদ সম্মেলন করে সম্প্রতি তিনি অভিযোগ করেছেন যে, একটি মহল কৌশলে পুলিশের সহায়তায় তাকে সহ দলের নেতা-কর্মীদের হুমকি-ধমকি ও ভয়-ভীতি দেখিয়ে মাঠ থেকে সরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে তিনি নির্বাচন কমিশন ও রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে মৌখিকভাবে নালিশও করেছেন।
১১ দলীয় জোট: শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তন
১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হয়ে গত বছরেরও বেশি সময় ধরে নির্বাচনী মাঠে ছিলেন জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা মোহাম্মদ মোবারক হোসেন। ভোটের মাঠে দারুণভাবে এগিয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু গত ৮-১০ দিন আগে তার পরিবর্তে জোটের অন্যতম শরিক এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক মাওলানা আশরাফ উদ্দিন মাহদিকে মনোনীত করা হয়েছে।
মাহদিও এখন ভোটের মাঠে লড়াই করে চলেছেন। উপজেলা জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে নিজেকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন তিনি। এই এলাকার মানুষের জন্য অনেক কাজ করেছেন এবং ভবিষ্যতেও আরও করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে যাচ্ছেন মাহদি। জোটের সংগঠিত শক্তি তার পেছনে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যান্য প্রার্থীরা
জনসংযোগ করছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই) মনোনীত প্রার্থী শাইখ নেছার আহমাদ আন-নাছিরী। তার প্রতীক হাতপাখা। নির্বাচনী এলাকার ভোটারদের কাছে নিয়মিত যাচ্ছেন তিনি। মাঝেমধ্যে নিজের গাড়ি এবং বেশ কয়েকটি মোটরবাইকে চড়ে কিছু সমর্থক হাতপাখার স্লোগান দিয়ে ঘুরে প্রতীক জানান দিচ্ছেন।
এছাড়া মাঠে রয়েছেন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি) এর তৈমুর রেজা শাহজাদা এবং ইনসানিয়াতের মঈন উদ্দিন (আপেল প্রতীক)। যদিও তাদের প্রচারাভিযান তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান, তবুও তারা নিজ নিজ এলাকায় সংগঠিত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে এবারের নির্বাচন হতে যাচ্ছে অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতির নানা মাত্রা যুক্ত হয়েছে এই আসনে। রুমিন ফারহানার স্বতন্ত্র প্রার্থিতা, বিএনপি-জমিয়ত জোটের সংগঠিত শক্তি, জাপার সাবেক এমপির পুনরাবির্ভাব এবং ১১ দলীয় জোটের শেষ মুহূর্তের প্রার্থী পরিবর্তন—সব মিলিয়ে এই আসনের ফলাফল অনিশ্চিত।
জয়লাভের বিষয়ে আশাবাদী সব প্রার্থীই। তবে শেষ পর্যন্ত কার ভাগ্যে জুটবে বিজয়ের হাসি, তা জানা যাবে ভোটের দিন। ভোটারদের হাতেই এখন চূড়ান্ত ক্ষমতা—কাকে তারা দেবেন সংসদে যাওয়ার সুযোগ।



































