বার্ষিক চাঁদা পরিশোধে ব্যর্থতাসহ নানা আর্থিক সংকটে জাতিসংঘ এক ‘অত্যাসন্ন আর্থিক ধসের’ মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেছেন সংস্থাটির মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, দ্রুত সংস্কার ও সময়মতো চাঁদা পরিশোধ না হলে বিশ্ব সংস্থাটির আর্থিক পতনের বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হবে।
চলতি সপ্তাহের শুরুতে জাতিসংঘের সব সদস্যরাষ্ট্রকে পাঠানো গুতেরেসের একটি চিঠি শুক্রবার পর্যালোচনা করেছে আল-জাজিরা। ওই চিঠিতে তিনি জানান, সংস্থাটি বর্তমানে ভয়াবহ তারল্য সংকটে রয়েছে এবং বিদ্যমান আর্থিক বিধিবিধান কার্যকরভাবে কাজ করছে না।
গুতেরেস সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে জাতিসংঘের আর্থিক কাঠামোর আমূল সংস্কারে একমত হওয়ার অথবা সংস্থাটির আর্থিক পতনের ঝুঁকি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি তিনি সব দেশকে দ্রুত তাদের বকেয়া ও চলতি বছরের চাঁদা পরিশোধের অনুরোধ করেন।
এ বিষয়ে শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘চাঁদা পরিশোধের ক্ষেত্রে এখনই সময়—না হলে আর কখনোই নয়।’
জাতিসংঘের উপমুখপাত্র ফারহান হক বলেন, আগের মতো কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার মতো নগদ অর্থ সংস্থাটির হাতে আর নেই। মহাসচিব প্রতিবছরই ক্রমবর্ধমান জোরালো ভাষায় এ সংকটের কথা তুলে ধরছেন।
এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এলো, যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বহুপক্ষীয় সংস্থাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়ন কমানোর পদক্ষেপ নিয়েছেন। চলতি মাসে ট্রাম্প প্রশাসন কয়েকটি জাতিসংঘ সংস্থা থেকে সরে আসার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। একই সঙ্গে ‘বোর্ড অব পিস’ নামে একটি নতুন উদ্যোগও চালু করেছেন ট্রাম্প, যা জাতিসংঘকে কোণঠাসা করার প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জাতিসংঘ বিষয়ক পরিচালক লুই শারবোনো বলেন, ট্রাম্পের এই উদ্যোগ অনেকটা ‘পে-টু-প্লে’ বৈশ্বিক ক্লাবের মতো, যেখানে স্থায়ী সদস্য হতে এক বিলিয়ন ডলার ফি দিতে হতে পারে। তাঁর মতে, এ ধরনের উদ্যোগে অর্থ দেওয়ার বদলে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলো রক্ষায় দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া জরুরি।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মাত্র ৩৬টি দেশ ২০২৬ সালের নিয়মিত চাঁদা পুরোপুরি পরিশোধ করেছে। সদস্যরাষ্ট্রগুলোর চাঁদার হার নির্ধারিত হয় জিডিপি, ঋণ ও অন্যান্য সূচকের ভিত্তিতে। জাতিসংঘের মূল বাজেটের ২২ শতাংশ দেয় যুক্তরাষ্ট্র এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ দেয় চীন।
গুতেরেস জানান, ২০২৫ সালের শেষে বকেয়া চাঁদার পরিমাণ রেকর্ড ১.৫৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, সব সদস্যরাষ্ট্রকে সময়মতো ও পূর্ণাঙ্গ চাঁদা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে, নইলে আর্থিক বিধিবিধান মৌলিকভাবে সংস্কার ছাড়া উপায় থাকবে না।
আর্থিক চাপ সামাল দিতে জাতিসংঘ ২০২৬ সালের জন্য ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট অনুমোদন দিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ শতাংশ কম। তবুও মহাসচিব সতর্ক করেছেন, আগামী জুলাইয়ের মধ্যেই সংস্থাটির নগদ অর্থ শেষ হয়ে যেতে পারে।
চিঠিতে গুতেরেস একটি পুরোনো নিয়মেরও সমালোচনা করেন, যার ফলে প্রতিবছর অব্যবহৃত অর্থ সদস্যরাষ্ট্রগুলোকে ফেরত দিতে হয়। তিনি এই ব্যবস্থাকে ‘কাফকায়েস্ক’ বা অযৌক্তিক চক্র বলে আখ্যা দিয়ে বলেন, ‘যে অর্থ আমাদের কাছে নেই, সেটিই ফেরত দেওয়ার প্রত্যাশা করা হয়—আমরা এমন এক জটিল চক্রে আটকা পড়েছি।’




































