ইইউ ও ভারতের মধ্যে ‘ঐতিহাসিক’ বাণিজ্য চুক্তি সই


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৭, ২০২৬, ১০:২৬ পিএম
ইইউ ও ভারতের মধ্যে ‘ঐতিহাসিক’ বাণিজ্য চুক্তি সই


দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের আলোচনার অবসান ঘটিয়ে একটি ঐতিহাসিক বাণিজ্য চুক্তিতে সই করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোর কৌশলগত উদ্যোগ হিসেবে এই চুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে মঙ্গলবার চুক্তি সইয়ের ঘোষণা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন এবং ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা।

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডের স্পিগেল-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুল্ক ও বাণিজ্যিক বাধা কমিয়ে ইইউ ও ভারতের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবা বিনিময় বাড়ানোই এই চুক্তির মূল লক্ষ্য। এর মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির পাশাপাশি অন্য দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো সম্ভব হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী শুল্কনীতি এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রেক্ষাপটে চুক্তিটিকে ভূরাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

চুক্তি সইয়ের পর উরসুলা ভন ডার লেন বলেন, “আজ ইউরোপ ও ভারত ইতিহাস তৈরি করেছে। এটি আমাদের মধ্যে হওয়া সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি।” ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও একে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে অভিহিত করেন।

ইইউ কমিশনের তথ্যমতে, এই চুক্তির মাধ্যমে প্রায় ২০০ কোটি মানুষের একটি মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল গড়ে উঠবে, যা উভয় পক্ষের জন্যই অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হবে। একই সঙ্গে এটি প্রমাণ করবে যে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখনো কার্যকর।

মেরকোসুরভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গে ইইউর সাম্প্রতিক চুক্তির তুলনায় এটি কম বিস্তৃত হলেও ভারতের বিশাল বাজারের কারণে এটিকে ইইউর অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য চুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ভারতের জনসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ১৪৬ কোটি, যা চীনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের সর্বাধিক। অন্যদিকে ইইউতে বসবাস করে প্রায় ৪৫ কোটি মানুষ। ইইউ ও ভারত মিলিয়ে বৈশ্বিক জিডিপি ও জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশের প্রতিনিধিত্ব করে।

ডের স্পিগেল জানিয়েছে, এই চুক্তি থেকে বিশেষভাবে লাভবান হতে পারে জার্মান গাড়িশিল্প। বর্তমানে ইইউ থেকে আমদানি করা গাড়ির ওপর ভারতে সর্বোচ্চ ১১০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। নতুন চুক্তির আওতায় বছরে আড়াই লাখ গাড়ির ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে শুল্ক কমিয়ে ১০ শতাংশে নামানো হবে। গাড়ির যন্ত্রাংশের ওপর ৫ থেকে ১০ বছরের মধ্যে শুল্ক সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হবে। পাশাপাশি যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক পণ্য ও ওষুধের ওপর আরোপিত অধিকাংশ শুল্কও বাতিল করা হবে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কনীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য অনিশ্চিত হয়ে ওঠায় ভারতের সঙ্গে ইইউর এই চুক্তিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

ইইউর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে ছয় হাজারের বেশি ইউরোপীয় কোম্পানি কার্যক্রম চালাচ্ছে। চুক্তির ফলে ২০৩২ সালের মধ্যে ভারতে ইইউর রপ্তানি দ্বিগুণ হওয়ার আশা করা হচ্ছে। কারণ, ইইউ থেকে ভারতে রপ্তানি হওয়া পণ্যের প্রায় ৯৬ দশমিক ৬ শতাংশের ওপর আরোপিত শুল্ক কমানো বা বাতিল করা হবে। এতে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ইউরো শুল্ক সাশ্রয় হবে।

তবে ভারতীয় বিশ্লেষকদের মতে, দেশটিতে সম্পদ ও ক্রয়ক্ষমতার বৈষম্য থাকায় বাজারের সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি।

চুক্তিটি কার্যকর হতে সময় লাগবে। কারণ, আইনি যাচাই, ইইউর সব দাপ্তরিক ভাষায় অনুবাদ এবং সদস্যরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের অনুমোদন প্রয়োজন।

এর আগে ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইইউ ও ভারতের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা ব্যর্থ হয়েছিল। ২০২২ সালে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়, যা বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় গতি পায়।

কৃষি খাতকে সংবেদনশীল বিবেচনায় রেখে চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে। ইইউ কমিশন জানিয়েছে, গরুর মাংস, হাঁস-মুরগি, চাল ও চিনি এই চুক্তির আওতায় আসবে না। পাশাপাশি ভারতীয় কৃষিপণ্যকে ইইউর কঠোর স্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তা মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।

Link copied!