• ঢাকা
  • শুক্রবার, ২৪ মে, ২০২৪, ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ১৬ জ্বিলকদ ১৪৪৫

প্রয়াণ দিবসে মিতা হককে স্মরণ


আরাফাত শান্ত
প্রকাশিত: এপ্রিল ১১, ২০২৩, ০৮:৩৬ এএম
প্রয়াণ দিবসে মিতা হককে স্মরণ

মিতা হক আমাদের মাঝে নেই দুই বছর হয়ে গেল। আমার মাঝেমধ্যেই তার কথা মনে পড়ে। মানুষটি ছিলেন আগ্রহ উদ্দীপক। একজন অকপট নিবেদিত সাংস্কৃতিক কর্মী। যখন যেটা মাথায় আসত, বলে দিতেন। একবার তিনি ‘হিজাব’ নিয়ে বলেছিলেন, যা সমালোচিত হয় প্রবলভাবে। তবে আমি তার সঙ্গে কিছুটা হলেও একমত। আমাদের বাঙালিয়ানায় ভেজালে ভরে গেছে এটি তো সত্য। তিনি যেমন খুশি তেমন রবীন্দ্রনাথের গান গাওয়ার বিপক্ষে ছিলেন। মৌলিক রবীন্দ্রনাথের গানের নিরীক্ষাকে খুব একটা কাজের কাজ ভাবতেন না। এসব তার একটা দিক। তার অন্য দিকটি হলো তিনি মায়াময় স্নিগ্ধ গলার একজন রবীন্দ্রসংগীতের শিল্পী, যিনি চাইতেন রবীন্দ্রনাথের গানের আলোয় প্রাণের মেলায় ভরিয়ে দিতে গোটা বাংলাদেশ। এমন কি পশ্চিম বাংলার অসংখ্য মানুষ তার সুললিত কণ্ঠের ভক্ত।

মিতা হক ছোটবেলা থেকেই গানের পাখি। বাসাতে গানের পরিবেশ ছিল। নানা বাড়িতেও ছিল গানের আড্ডা। তার নানা কুমিল্লার খুবই সম্ভ্রান্ত পরিবারের উন্নত রুচির মানুষ ছিলেন। নজরুলের গান যেমন শুনতেন, ছেলে মেয়েরা গাইত, তেমন ধার্মিক মুসলমানও ছিলেন। বিখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াহিদুল হক ছিলেন তার চাচা। চাচার কাছেই তার গান শিক্ষার হাতেখড়ি।

ওয়াহিদুল হকের বাসায় একবার চুরি হয়েছে। তিনি এসেছেন ভাইয়ের বাসায়। বলছেন, আয়রন, ঘড়ি, টেবিল ল্যাম্প, টাকা পয়সা কী কী খোয়া গেছে। মিতা হকের বাবা খুব উদ্বিগ্ন। অফিস থেকে এসেছেন, জামাকাপড় না ছেড়েই তাদের পরিচিত সব বড় কর্তা বন্ধুদের ফোন দিচ্ছেন। ওয়াহিদুল হক পাঁচ মিনিটেই বিরক্ত হয়ে উঠে গেলেন, চল মিতা গান করি। ১১ বছরের মিতা হককে নিয়ে গাচ্ছেন তিনি “স্বপন পারের ডাক শুনেছি ...।” এই যে পৃথিবীর সব অস্থিরতা, ব্যক্তিগত দুশ্চিন্তা, বৈষয়িক চিন্তাভাবনা এসব পাশ কাটিয়ে ওয়াহিদুল হক-মিতা হকরা শুধু রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পড়ে থাকতে পারতেন এই গুণটাই এখন এত কমে গেছে।

মিতা হকরা আর আসবেন না, যারা কণ্ঠে মননে চেতনায় যাপনে সব সময় রবীন্দ্রনাথকে রাখতে পারতেন। যারা বলতে পারেন, “খালেদকে মনে পড়ে গান গাইতে গিয়ে, ও থাকলে হয়তো আমার গানকে ক্রিটিক করার একটা লোক থাকত। যে বলত আমায়, কথাটা বলো, কথাটা ভাবো, খালি মুখস্থ গাইতে থেক না।”

মিতা হকের জীবনে ওয়াহিদুল হকের গুরুত্ব অপরিসীম। তার কারণেই তিনি সাধনা করে গেছেন এটাই তার জীব্ন, গানই গাইতে হবে তার। গানের সংগঠনে তিনি কিশোরী বয়স থেকেই ছিলেন। সারা বাংলাদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদের জন্য। এগারো বারো বয়সে তিনি বার্লিনেও গিয়েছিলেন শিশু উৎসবে। ওয়াহিদুল হক ছাড়াও গান শিখেছেন ওস্তাদ মোহাম্মদ হোসেন, সনজীদা খাতুনের মত মহীরুহদের কাছে। রবীন্দ্রনাথের শিষ্য ও অসংখ্য রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বরলিপি তার হাত ধরে রচিত হয়েছিল সেই বিখ্যাত শৈলজারঞ্জন মজুমদা্রের কাছেও গান শেখার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি উচ্চাঙ্গ সংগীতেও পারদর্শী ছিলেন, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গানই তার হয়ে যায় ধ্যাণ-জ্ঞান।

দুই ডজনের উপরে তার অডিও অ্যালবামের সংখ্যা। এর ভেতরে ভারত থেকে প্রকাশিত ১৪টি আর বাংলাদেশ থেকে দশটি। শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালে রবীন্দ্রসংগীত সংকলন ‘আমার মন মানে না’ দিয়ে। মৃত্যুর এক বছর আগে একুশে পদক পেয়েছেন। তার আগে পেয়েছিলেন শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কারও। মিতা হকের গায়কী তার ব্যক্তিত্বের মতোই নিষ্কলুষ। তিনি যন্ত্রের মত রবীন্দ্র সংগীত গাইতে থাকেন না। প্রাণ আছে, সুর আছে আর আছে অদ্ভুত মানবিকরণ। তার কণ্ঠে, ‍‍`চিরবন্ধু চিরনির্ভর চিরশান্তি‍‍` গানটা শুনলেই আমার গাঁয়ে কাঁটা দেয়। এই গান অনেকের কণ্ঠেই শুনেছি কিন্তু মিতা হকের মতোন কেউ নন। কিংবা ‍‍`মালা হতে খসে পড়া‍‍`,  ‍‍`তুমি কোন ভাঙনের পথে এলে‍‍`, ‍‍`তিমির অবগুণ্ঠনে‍‍` এসব গানে বারবার তার কথা মনে আসবেই। সুধীর চক্রবর্তী বলেছিলেন, “ষাটের দশকে রবীন্দ্রনাথের গানের নতুন জোয়ার আসে বাঙালি সমাজে। মধ্যবিত্ত ঘরে ঘরে রবীন্দ্র সংগীত শেখা ও শোনার একটা চল শুরু হয়।” আমার মনে হয় বাংলাদেশে তা আসে স্বাধীনতার পর। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের অন্যতম সেরা রবীন্দ্র সংগীতের শিল্পীদের একজন মিতা হক। শুধু ভালো গাইতেন বলেই নয়, হাজার হাজার ছেলেমেয়েকে তিনি গান শিখিয়েছেন। আলোকের ঝরনাধারা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন আমৃত্যু।

কিডনি ডায়লাইসিসের রোগী হয়েও তিনি সঙ্গীত চর্চা করে গেছেন। অকালে মৃত্যু না হলে তিনি হয়তো এখনো ছায়ানটে গান শেখানোর সাথে জড়িত থাকতেন। ছিল তাদের একটা স্কুলও, সুরতীর্থ। তার মৃত্যুর পরে নিথর দেহের সামনেও গাওয়া হয় অশ্রুসজল নয়নে রবীন্দ্র সংগীত। সেই দৃশ্যটা আমাকে খুব বিষাদগ্রস্থ করে। ওপারে নিশ্চয়ই তিনি শুনতে পান, আমরা যখন তার গান শুনি, তাকে নিয়ে ভালো ভালো আলাপ করি। বেঁচে থাকলে তার বয়স হতো ষাট। কত মানুষ ষাট সত্তর আশি পেরোচ্ছেন। অকালে চলে যায় শুধু মিতা হকরাই। এই অস্থির সময়ে তার মতো কীর্তিমান মানুষের অভাব বোধ করবে অনেকেই। মৃত্যু দিনে স্মরণ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানাই এই অসাধারণ শিল্পীকে।
 

Link copied!