• ঢাকা
  • রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১, ৪ শাওয়াল ১৪৪৫

সাকিব-তামিম দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়?


তারিক আল বান্না
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৪, ০৮:০৫ পিএম
সাকিব-তামিম দ্বন্দ্বের শেষ কোথায়?
সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। ছবি : সংগৃহীত

পঞ্চপাণ্ডব ভেঙে গিয়েছে অনেক আগেই, যখন মাশরাফি বিন মুর্তজা জাতীয় দলের বাইরে চলে যান। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদদের এখন একসঙ্গে নিয়মিত দেখাও যায় না। শুধু তা-ই নয়, এই চারজনের মধ্যে সাকিব ও তামিমের মধ্যকার দ্বন্দ্ব চলছে ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপ কিংবা তারও আগে থেকে। যা এখনো ক্ষত- বিক্ষত করছে আমাদের ক্রিকেটকে। এই দ্বন্দ্ব কোথায় গিয়ে শেষ হয়, তা কেউ বলতে পারবে না।

সাকিব ও তামিমের দ্বন্দ্বের জন্য তারা দুজনেই সমানভাবে দায়ী। তামিমের ইচ্ছা ছিল বিশ্বকাপে খেলবেন, তবে সব ম্যাচ নয়। আর সেটা নিয়েই নেগেটিভভাবে মন্তব্য করেন সাকিব। ফলে শুরু হয় দ্বন্দ্ব। 

তামিম বিশ্বকাপের সব ম্যাচ খেলবেন না বলে মত প্রকাশ করায় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি তাকে স্কোয়াডে রাখেনি। তামিমের সব ম্যাচ না খেলা নিয়ে বক্তব্য রাখা ঠিক হয়নি। তার উচিত ছিল, আগে বিশ্বকাপ দলে নিজের অবস্থান পাকা করা, তার পর টুর্নামেন্ট চলাকালে নিজের সব ম্যাচ না খেলতে পারাটা প্রকাশ করা। আর সাকিবের সঙ্গে দ্বন্দ্বে না যেয়ে সোজা পথে থাকা দরকার ছিল তামিমের। কারণ, তাদের দুজনের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতায় বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। 

গত কয়েকটি বছর ধরে সাকিব বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেন, যা তামিমের নেই। বিশ্বকাপের আগে সর্বশেষ ১০টি ওয়ানডে ইনিংসে তামিমের রয়েছে একটি মাত্র হাফ সেঞ্চুরি। একজন ওপেনার হিসেবে নিশ্চয়ই সেটা ব্যর্থতারই নামান্তর। তো সেখানে তামিমের নিজেকে বড় মনে করার কোনো যুক্তিই নেই। 

তামিমের ক্যারিয়ার নিঃসন্দেহে চমৎকার। কিন্তু তাকে বুঝতে হবে, বিশ্বকাপটা ছিল ওয়ানডে ফরম্যাটের, যেখানে সর্বশেষ ১০ ম্যাচে তিনি সাফল্য দেখাতে পারেননি। আর সাকিব যেহেতু ছিলেন বিশ্বকাপ দলের অধিনায়ক, তার উচিত ছিল একসময়ের ঘনিষ্ঠ তামিমকে নিয়ে অযথা মন্তব্য না করা। যেমনটা ছিলেন মাশরাফি। 

মাশরাফি দলের  সকলের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতেন বলে তার নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ওয়ানডে ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি সাফল্য লাভ করেছে। এমন অধিনায়ক হতে ব্যর্থ হয়েছেন সাকিব সহ বাকিরা।

সাকিব ও তামিমের দ্বন্দ্বে আসলে ক্ষতি করছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকেই। যদি তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব না থাকতো এবং তামিমও বিশ্বকাপে খেলতেন, তাহলে বাংলাদেশ কিছুটা হলেও ভালো খেলতো, জয় সংখ্যাও বাড়তো দলটির।

সাকিব দীর্ঘদিন ধরে শুধু বিশ্বসেরা অলরাউন্ডারই নয়, এবার তিনি জাতীয় নির্বাচনে সংসদ সদস্য হয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে। ফলে সাকিবের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে তো তামিমের কোনো লাভ হওয়ার কথা নয়। তামিমের উচিত ছিল টেকনিকালি দ্বন্দ্ব এড়িয়ে গিয়ে নিজের ফর্ম মজবুত করা।

এমনিতেই পঞ্চপান্ডব ভেঙে গিয়েছে, সেখানে সাকিব- তামিম দ্বন্দ্ব বাংলাদেশকে অনেক সাফল্য লাভ থেকে বঞ্চিত করছে। সিনিয়র খেলোয়াড় হিসেবে তাদের উচিত  দ্বন্দ্ব ভুলে যাওয়া। তাতে শুধু দেশের লাভই হবে না, তাদেরও লাভ। তাছাড়া, তরুণ ক্রিকেটাররাও লাভবান হবে, যাদের আদর্শ খেলোয়াড় ঐ দুজন।

যখন পঞ্চপান্ডব অক্ষত ছিল, যখন কোনো দ্বন্দ্ব ছিল না, তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলও সারাবিশ্বে সমীহ জাগানো দলে পরিনতি হয়েছিলো। বিশ্বের সব বড় বড় দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের ছিল একের পর এক গৌরবের জয়। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনালেও উঠতে সক্ষম হয়েছিল লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা।

সাকিবের সঙ্গে তামিমের ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো নয়, গণমাধ্যমের সামনে বিষয়টি নিয়ে এসে আলোচনা তৈরি করেছিলেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। এরপর থেকে ধীরে ধীরে দুজনের মধ্যকার সমস্যাগুলো সবার সামনে আসতে থাকে। যেটার ছাপ পড়েছে বিশ্বকাপের দল ঘোষণা থেকে শুরু করে টুর্নামেন্ট পর্যন্ত। ২০২৩ সালের ওই বিশ্বকাপ চলাকালে দলের ক্রিকেটারদের মধ্যেও তাদেও বাজে সম্পর্কেও বিরূপ প্রভাব পড়ে। পুরো টুর্নামেন্টে ভক্ত-সমর্থকদেরও ভাগ হতে দেখা যায়। বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পারফরম্যান্সও ছিল লজ্জার।

তামিমের বিশ্বকাপ দল থেকে বাদ পড়ার নেপথ্যে সাকিবের ‘অপছন্দ’কে বড় কারণ বলে মনে করা হয়। সেই বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন পাকিস্তানি কিংবদন্তি ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরাম। মাশরাফি মাঝে বেশ চেষ্টা করেছেন তাদের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসনে। কিন্তু পারেননি। উদ্বেগ প্রকাশ করেন পেসার তাসকিন আহমেদও।  

সাকিব- তামিমের এই দ্বন্দ্বের অবশ্য অন্য এক ধরনের প্রভাব পড়েছে চলমান বিপিএলে। আসরে রংপুরের সাকিব এবং বরিশালের অধিনায়ক তামিম চেষ্টা করছেন সেরা নৈপূণ্য উপহার দিতে। তাতে তারা দুজনই সফল। শেষ দিকের প্রায় সব ম্যাচে চমৎকার অলরাউন্ড নৈপূণ্য দেখাচ্ছেন সাকিব। আবার বরিশালের অন্যতম রান মেশিন হিসেবে খ্যাতি পেয়েছেন তামিম। শুক্রবারও তামিম ৪৮ বলে ৬৬ রানের স্কোর গড়ে কুমিল্লার বিপক্ষে বরিশালের জয় এবং দলকে প্লে-অফে তুলতে বিশাল ভূমিকা রাখেন। 

দর্শকরা এখন তামিম আর সাকিবের মধ্যকার এই দ্বন্দ্ব আর দেখতে চান না। তারা চান আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আগেই তাদের দ্বন্দ্বের অবসান ঘটুক, বাংলাদেশ ওই বিশ্বকাপে ভালো করুক। কিন্তু দর্শকদের সেই চাওয়া কি পূরণ হবে? 
 

Link copied!