হিন্দু-নিগ্রহ অভাবনীয় কিছু নয়, দেশব্যাপী এর প্রতিক্রিয়াও নয় অবাক করার মতো কিছু। এমনটা চলে আসছে অনেকদিন ধরেই। তবু 'অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ' স্লোগান ধরা হয়। এমনটাই দেখে আসছি আমরা। দায়িত্বশীলদের বয়ান-বিবৃতিতে মনে হয় তাদের দাবির 'অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে' সাম্প্রদায়িকতা অসম্ভব। সত্যি বলতে কী 'অসম্ভব' শব্দটা বিশ্বাস করাই এখানে অসম্ভব, কারণ সাম্প্রদায়িকতার বিষবৃক্ষ এখানে এতখানি ঋজু, এতখানি শক্তিমান যে ঘটনাগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও বাস্তবতা বিবর্জিত নয়।
দেশের সকলের ধর্মীয় অনুভূতি আছে। প্রধানমন্ত্রীর আছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর আছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সকল স্তরের লোকজনের আছে, কেন্দ্র থেকে প্রান্তের সকলের আছে, আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টি-জামায়াত-হেফাজত-ডান-বামসহ সকলের আছে; অনুভূতির বাইরে হাতেগোনা ক'জন ছাড়া কেউ নেই। এবং অবশ্যই এটা স্বব্যাখ্যায়। ফলে অনুভূতির আগুনে খাক হয়ে যেতে অপেক্ষা করতে হয় না বেশিক্ষণের।
ব্লগার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নিধন থেকে শুরু করে কিংবা এর আগে থেকেও চলমান হিন্দু নিগ্রহের ঘটনাগুলো একেকটা উদাহরণ হয়ে আছে। এগুলো ছোটখাটো উদাহরণ নয়, সর্বত্র প্রভাববিস্তারি। ফলে সময়ে-সময়ে অনুভূতির আগুনে জ্বলেপুড়ে ছাই হচ্ছে সমাজ, দেশ। পাশবিক উন্মত্ততা দৃশ্যমান হচ্ছে যখন-তখন।
রূঢ় এই বাস্তবতার বাইরে আশার কথা সমাজের একটা শ্রেণি এখনও আছে যারা এই দুরাচারকে গ্রহণ করে না, প্রতিবাদ করে। সংখ্যায় কত সে হিসাবের দরকার নাই। তবে নিভুনিভু হয়ে জ্বলতে থাকার আশার সলতে এরাই বাঁচিয়ে রেখেছে। ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তান আমল হয়ে আজকের বাংলাদেশ, উত্তরাধিকারের এই ধারা বহমান; উভয় ক্ষেত্রে। একদিকে হিংসার আগুনে খাক করতে উন্মুখ একদল, অন্যদিকে আরেকদল যথারীতি মানবিক সমাজব্যবস্থা কায়েমের সংগ্রামে।
আশা-হতাশার এই দ্বৈরথে পাশবিকপক্ষের মাথা গুনলে মনে হয় হেরে গেছি, কিংবা হেরে যাচ্ছি, নয়ত নিকট ভবিষ্যতেই হারতে যাচ্ছি। তবে আশার কথা শতাধিক বছরের পুরনো এই অসুর-উন্মত্তরূপ দৃশ্যমান হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবতা বলছে হারিনি এখনও। সত্যিকার অর্থে অপরাজেয় মানবিক সত্তা, আর এটাই আদতে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা।
অপরাজেয় মানবিক সত্তা যদি কিছু ক্ষেত্রে আশার আলো হয় তবে এটাকে আরও বেগবান করার তাগিদের অনুপস্থিতি রয়েছে। এই অনুপস্থিতি আদতে জাগরণ সৃষ্টি করতে না পারার ব্যর্থতা। ইতিহাস বলে দীর্ঘ মেয়াদের ফলাফলের জন্যে দরকার সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং তৎসৃষ্ট গণজাগরণ, কিন্তু সেটা হচ্ছে কই! সাংস্কৃতিক জাগরণের জন্যে দরকার যেখানে দক্ষ ও প্রকৃত প্রগতির সংগঠক সেখানে এর অভাব প্রকট। কেন্দ্র থেকে প্রান্ত সকল স্তরে মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণে দরকার পাঠের অভ্যাস, কিন্তু সেই পাঠাগার স্থাপনের পদক্ষেপ কই?
সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাদের অধিকাংশই সরকারি প্রভাববলয়ে অন্তরীণ। তাদের বেশির ভাগই ফুলের টোকা মেরে আন্দোলনের পক্ষপাতি। অথচ বাস্তবতা সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের 'প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/ ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা' পঙক্তির মতো। কবি মে দিবস নিয়ে লেখা কবিতায় যে ইঙ্গিতই দিন না কেন এমন অমর পঙক্তিমালা আদতে নানা সময়ে নানা রূপে এভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে যায়।
ধর্মীয় মৌলবাদকে প্রতিহত করতে সরকার এবং সাংস্কৃতিক সংগঠকদের এই সুবিধাবাদী রূপের খেসারত দিয়ে চলেছি আমরা। উগ্রবাদকে আশকারা দেওয়ার পরিণতি কতখানি ভয়াবহ হয় তার প্রমাণ নানাভাবে পাওয়া যায়। এটা সুকান্তের দেশলাই কাঠির মতো যেখানে সামান্য অবজ্ঞায় সবকিছু পুড়ে যাওয়ার কথা বলে। 'দেশলাই কাঠি' কবিতায় সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছেন- '...মনে আছে সেদিন হুলস্থূল বেধেছিল?/ ঘরের কোণে জ্বলে উঠেছিল আগুন-/ আমাকে অবজ্ঞাভরে না-নিভিয়ে ছুঁড়ে ফেলায়!/ কত ঘরকে দিয়েছি পুড়িয়ে,/ কত প্রাসাদকে করেছি ধূলিসাৎ/ আমি একাই- ছোট্ট একটা দেশলাই কাঠি।' হ্যাঁ, নগণ্য ভেবে এই সাম্প্রদায়িকতার বিষকে আমরা এতদিন অবজ্ঞা করে এসেছি, করে যাচ্ছি, রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়েছি যার খেসারত এখন দিয়ে চলেছে দেশ।
অসুরের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাংস্কৃতিক গণজাগরণ তৈরি করতে না পারার এই ব্যর্থতার ফল যে কত ভয়াবহ তার প্রকাশ আমরা নিকট অতীতে দেখেছি, বর্তমানেও দেখছি। রামু, নাসিরনগর, নোয়াগাঁওসহ আরও কিছু ঘটনার ধারাবাহিকতায় কুমিল্লার তাণ্ডব থেকে দেশের নানাপ্রান্তে এর শিকার হয়েছে সংখ্যায় কম থাকা ধর্মীয় জনগোষ্ঠী। পূজামণ্ডপে হনুমান মূর্তির ওপরে মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ কোরান শরিফ রাখার যে ঘটনার প্রচার হলো তাতে আক্রান্ত হয়েছে হিন্দুরা। এই প্রচারের সঙ্গে বাস্তবতা মিলিয়ে দেখার সুযোগটা নিতে শিখেনি অধিকাংশ লোক। পূজামণ্ডপে মুসলমানদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরান শরিফ রেখে সেটা পূজা করতে যাবে কেন তারা? এছাড়া এই দেশের হিন্দুরা কি জানে না মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ তাদের পূজামণ্ডপে রাখলে কী প্রতিক্রিয়া হতে পারে? নিজেদের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসবকে কি কেউ বিশৃঙ্খলার মুখে ঠেলে দিতে পারে? পারে না! এই প্রশ্ন আর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেনি কেউ, করছেও না।
সাম্প্রদায়িক হামলা, হিন্দু নিগ্রহের ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক তাৎপর্য, রাজনৈতিক ইন্ধন ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব খোঁজার চেষ্টা করেন অনেকেই। যারা খুঁজেন তারা নিজেরাও ধর্মকে হাতিয়ার হিসেবে সুযোগ পেলেই ব্যবহার যে করেন না, তাও না। ফলে ধর্মান্ধদের বিরুদ্ধে মুখে সতর্কতা উচ্চারিত হলেও কার্যক্ষেত্রে এর প্রতিফলন মেলে না। আর যখনই প্রতিক্রিয়াশীলেরা হুঙ্কার ছাড়ে, মাঠে নামে তখন প্রতিবারই প্রতিরোধে ব্যর্থ হয় সরকার। এবারও হয়েছে।
সুকান্তের 'দেশলাই কাঠি' অবজ্ঞায় জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিচ্ছে সব। এবার সেই 'দেশলাই' খুঁজে সান্ত্বনা। ‘কত জায়গায় তো ফেলি আমি দেশলাই, একবারও ভুল করে নয়, যদি কেউ আগুন জ্বালায়।’ হ্যাঁ, ভুল করে হলেও কেউ যদি ধর্মান্ধতা আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সফল হওয়ার মতো কিছু করে!
নবারুণের দেশলাই পড়তে থাকুক, একদিন কেউ না কেউ আগুন জ্বালাবে, একদিন না একদিন বাংলাদেশ হয়ে ওঠবে ধর্মনিরপেক্ষতা আর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।
লেখক : সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক







































