ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মানেই শুধু একজন ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব — এই ধারণা অনেকের মধ্যে থাকলেও বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা একাধারে রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক, অর্থনীতি ও নীতিনির্ধারণের প্রধান দিকনির্দেশক এবং বিশ্বের শিয়া মুসলমানদের নেতা। রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের ওপর তাঁর চূড়ান্ত কর্তৃত্ব বিদ্যমান।
মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে ইরান সরকার। রোববার সকালে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশিত হয়।
জন্ম ও পারিবারিক পরিচয়
১৯৩৯ সালে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের শিয়া তীর্থনগরী মাশহাদে জন্ম নেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। তাঁর পরিবার জাতিগতভাবে আজারবাইজানি — পূর্বপুরুষরা প্রতিবেশী ইরাক থেকে ইরানে এসে বসতি গড়েন। প্রথমে উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজে বসবাস শুরু করলেও পরে ধর্মীয় তীর্থস্থান মাশহাদে স্থায়ী হন। সেখানে খামেনির বাবা একটি আজারবাইজানি মসজিদের ইমামের দায়িত্ব পালন করতেন। তাঁর মা খাদিজেহ মিরদামাদি ছিলেন কোরআন ও সাহিত্যপ্রেমী, যিনি ছেলের মধ্যে কবিতা ও পাঠের প্রতি গভীর আগ্রহ জাগিয়ে তোলেন।
শিক্ষাজীবন ও ধর্মীয় দীক্ষা
মাত্র চার বছর বয়সে কোরআন শিক্ষার মধ্য দিয়ে খামেনির পড়াশোনার সূচনা হয়। উচ্চবিদ্যালয় শেষ না করেই তিনি ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন এবং তৎকালীন প্রখ্যাত আলেমদের কাছ থেকে শিক্ষা নেন। পরে তিনি শিয়া উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দুটি কেন্দ্র — নাজাফ ও কুমে — পড়াশোনা চালিয়ে যান। কুমে অধ্যয়নকালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির সান্নিধ্যে আসেন তিনি, যিনি শাহবিরোধী অবস্থানের কারণে তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে তখন অত্যন্ত জনপ্রিয়।
বিপ্লবে পথচলা
১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬ ও মার্কিন সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থানে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হলে ইরানজুড়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে সক্রিয় কর্মী হিসেবে খামেনিকে শাহের গোপন পুলিশ সাভাক একাধিকবার গ্রেপ্তার করে এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দুর্গম শহর ইরানশাহরে নির্বাসনে পাঠায়। তবে ১৯৭৮ সালের গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন তিনি, যা শেষমেশ পাহলভি রাজতন্ত্রের পতন ঘটায়।
ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসা
বিপ্লবের পর খামেনি নতুন রাষ্ট্র গড়ার কাজে সরাসরি যুক্ত হন। ১৯৮০ সালে স্বল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হলে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত হন। ওই বছরই মোজাহেদিন-ই-খালকের বোমা হামলায় তিনি ডান হাতের কার্যক্ষমতা হারান, তবু রাজনীতি থেকে সরে যাননি। ১৯৮১ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন তিনি।
সর্বোচ্চ নেতার আসনে
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহোল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের ক্ষমতা ছাড়াও পারমাণবিক নীতিসহ রাষ্ট্রের সব বড় সিদ্ধান্তে তাঁর সম্মতি আবশ্যক ছিল। তাঁর নেতৃত্বে আইআরজিসি একটি সাধারণ আধাসামরিক বাহিনী থেকে ইরানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত হয়।
পশ্চিমাবিরোধী নীতির শিকড়
ইরান-ইরাক যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন দেওয়ায় খামেনির মনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রতি গভীর অবিশ্বাসের জন্ম হয়। এই মনোভাবই পরবর্তী তিন দশকে ইরানের বৈদেশিক নীতিকে নিয়ন্ত্রণ করে। বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে সর্বদা সতর্ক ও প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকার ধারণা রাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে স্থায়ী জায়গা পায়।
বারবার চ্যালেঞ্জের মুখে
তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে একাধিকবার বড় সংকট দেখা দেয়। ২০০৯ সালে বিতর্কিত নির্বাচনের পর সবুজ আন্দোলন, ২০২২ সালে নারী অধিকারের দাবিতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হওয়া গণ-অসন্তোষ — প্রতিটি ক্ষেত্রে কঠোর দমনপীড়নের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। সমালোচকদের মতে, তরুণ প্রজন্মের সংস্কার ও উন্নয়নের প্রত্যাশা থেকে খামেনি ক্রমেই দূরে সরে গিয়েছিলেন।






























