রাজিন মুনতাসীর

বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বয়কট, আইসিসির দ্বিচারিতা ও ক্রিকেটের রাজনৈতিক বন্দীদশা


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ২৭, ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বয়কট, আইসিসির দ্বিচারিতা ও ক্রিকেটের রাজনৈতিক বন্দীদশা

ক্রিকেট মাত্র এক খেলা নয়—এটা একটা দেশের আত্মসম্মানের প্রতীক, জনগণের আবেগের কেন্দ্রবিন্দু, এবং অসংখ্য যুবকের স্বপ্নের সাঁকো। বাংলাদেশের ক্রিকেট যাত্রা ১৯৯৭ সালে টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়া থেকে শুরু করে ২০১৫ আন্ডার-১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছানো—এই পথে অসংখ্য বাধা অতিক্রম করেছে। কিন্তু ২০২৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারত সফর না করার সিদ্ধান্ত নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) যে পথ বেছে নিয়েছে, তা রাষ্ট্রের সম্মান রক্ষার প্রশ্নে সঠিক হলেও ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। আইসিসির দ্বিচারিতা এবং বিসিসিআই-এর প্রভাবে বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ম ভেঙে পড়ছে, আর বাংলাদেশ তার জাতীয় মর্যাদা রক্ষা করতে গিয়ে নিজের খেলাধুলার ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এই কলামে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব এই ঘটনাপ্রবাহ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, আইসিসির দ্বিমুখী নীতি, এবং কেন বাংলাদেশের এই সিদ্ধান্ত ক্রিকেটের স্বার্থে পিছিয়ে দিয়েছে।

সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ: নিরাপত্তা নাকি রাজনীতির খেলা?
২০২৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ভারত ও শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে আয়োজিত হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের গ্রুপ ম্যাচগুলো ভারতে নির্ধারিত ছিল। কিন্তু শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু সংখ্যালঘুর ওপর হামলার অভিযোগ, মুস্তাফিজুর রহমানকে কলকাতায় আইপিএল ম্যাচের পর ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে ‘বিতাড়িত’ করার ঘটনা—এসব কথা জনসমক্ষে আসে। বিসিবি নিরাপত্তা উদ্বেগ তুলে ধরে ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় স্থান্তরের অনুরোধ জানায়। আইসিসি প্রথমে আলোচনা করে, কিন্তু বোর্ড সভায় ১৪-২ ভোটে অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে। সরকারের স্পোর্টস উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, "রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কোনো আপোষের বিষয় নয়।" ফলে বিসিবি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ায়, এবং স্কটল্যান্ড তাদের জায়গা নিতে পারে।

এখানে প্রশ্ন উঠছে: নিরাপত্তা সত্যিই এতটা গুরুতর ছিল কি? আইসিসির নিজস্ব নিরাপত্তা রিপোর্টে ঝুঁকি ‘ম্যানেজেবল’ বলা হয়েছে। ভারত সরকার বিস্তারিত নিরাপত্তা গ্যারান্টি দিয়েছে। তবু বিসিবি পিছু হটেনি। এর পিছনে রাজনৈতিক চাপ স্পষ্ট। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার অ্যান্টি-ইন্ডিয়া সেন্টিমেন্টকে জনপ্রিয়তার কার্ড হিসেবে ব্যবহার করছে। পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বিজেপি ‘বাংলাদেশ-বিরোধী’ রিটোরিক তৈরি করেছে। ফলে ক্রিকেট হয়ে উঠেছে কূটনৈতিক অস্ত্র। খেলোয়াড়রা পর্যন্ত রাজনীতির শিকার—শাকিব আল হাসান দেশে ফেরতে পারছেন না, মুস্তাফিজুরের আইপিএল কনট্রাক্ট হারিয়ে যাচ্ছে। সমর্থকরা হতাশ, কিন্তু রাষ্ট্রের সম্মানের নামে সব স্বীকার করতে বাধ্য।

আইসিসির দ্বিচারিতা: ভারতের দাসত্ব কি নাকি নিয়মের শাসন?
আইসিসির এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্নোত্তর হলো তাদের দ্বিমুখী নীতি। ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ভারত পাকিস্তানে না গিয়ে ‘হাইব্রিড মডেল’ পেয়েছে—ভারতের ম্যাচ দুবাইয়ে স্থানান্তরিত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনুরোধ খারিজ। বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম এটাকে ‘ডাবল স্ট্যান্ডার্ড’ বলে সমালোচনা করেছেন। কেন ভারতের জন্য নিরপেক্ষ ভেন্যু সম্ভব, কিন্তু বাংলাদেশের জন্য নয়? আইসিসির আয়ের ৮০% ভারত থেকে আসে—বিসিসিআই-এর ইনফ্লুয়েন্স স্পষ্ট। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশের মতো ছোট বোর্ডগুলোর কথা শোনা হয় না।

এর ইতিহাস দেখুন। ১৯৯৬ ওয়ানডে বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া-ওয়েস্ট ইন্ডিজ শ্রীলঙ্কায় না গিয়ে ওয়াকওভার খেয়েছে, কিন্তু শ্রীলঙ্কা শিরোপা জিতেছে। ২০০৩-এ ইংল্যান্ড জিম্বাবুয়ে বর্জন করেছে রাজনৈতিক কারণে। কিন্তু আজকের আইসিসি ভারতের পক্ষপাতিত্ব করে চলেছে। ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে পাকিস্তান ভারতে খেলেছে, কিন্তু উল্টোটা হয়নি। এখন বাংলাদেশকে শাস্তি দিয়ে আইসিসি বলছে, "নিয়ম মানো।" কিন্তু নিয়ম তো ভারতের জন্য বাঁকানো হয়েছে বারবার। বিসিসিআই-এর প্রেসিডেন্ট জয় শাহ ICC চেয়ারম্যানের প্রার্থী—এই সম্পর্কের ছায়া স্পষ্ট। ছোট দেশগুলোর ক্রিকেট ICC-এর কাছে বন্দী।

বাংলাদেশের ডিগনিটি: সঠিক, কিন্তু ক্রিকেটের ক্ষতি অপরিসীম
বাংলাদেশের অবস্থান ডিগনিটির দিক দিয়ে সঠিক। কোনো দেশ তার নাগরিকদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলতে পারে না। মুস্তাফিজুরের ঘটনা, সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ—এসব বাস্তব। সরকারের অবস্থান রাষ্ট্রীয় সম্মান রক্ষায় অটল। কিন্তু ক্রিকেটের স্বার্থে এই সিদ্ধান্ত মহা বিপর্যয়কর। আইসিসির বয়কটের ফলে ৩২৫ কোটি টাকার আয় হারাবে বিসিবি—যা তাদের বার্ষিক বাজেটের ৬০%। অংশগ্রহণ ফি ৩ লাখ ডলার, সুপার এইটে বোনাস, স্পনসরশিপ—সব শূন্য। এই টাকা দিয়ে আসে অ্যাকাডেমি, ট্রেনিং, ডোমেস্টিক ক্রিকেট। উন্নয়ন থেমে যাবে।

ক্রিকেটীয় ক্ষতি আরও গভীর। টি20 র্যাঙ্কিংয়ে ৯ম বাংলাদেশের নিচে আফগান, আয়ারল্যান্ড, জিম্বাবুয়ে—এরা এগিয়ে যাবে। ২০২৮ বিশ্বকাপে সেরা ১০ দল সরাসরি খেলবে, বাংলাদেশ বাছাই পর্বে আটকা পড়তে পারে। সেপ্টেম্বরে ভারত সিরিজ, ২০২৭ এশিয়া কাপ, ২০২৯ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, ২০৩১ ওয়ানডে বিশ্বকাপ—সব ঝুঁকিতে। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকার সফরও বাতিল হতে পারে। খেলোয়াড়দের আইপিএল, বিগবাশ কনট্রাক্ট হারাবে। তরুণ প্রতিভা হতাশ হয়ে পড়বে। রাষ্ট্রের সম্মান রক্ষা হয়েছে, কিন্তু ক্রিকেটের অগ্রযাত্রা থমকে গেছে।

ক্রিকেটের রাজনৈতিকরণ: ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ
ক্রিকেটের রাজনৈতিকরণ নতুন নয়। ১৯৭৭-এ অ্যাপারথাইডের প্রতিবাদে ইংল্যান্ড দক্ষিণ আফ্রিকা সফর বাতিল করে। ১৯৯৬-এ শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে অস্ট্রেলিয়া বর্জন করে। ২০০৩-এ জিম্বাবুয়ের মুগাবে রাজনীতিতে ইংল্যান্ড সরে দাঁড়ায়। কিন্তু আজকের সমস্যা ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ত্রিকোণে কেন্দ্রীভূত। ভারতের অর্থনৈতিক শক্তি আইসিসিকে নিয়ন্ত্রণ করে। পাকিস্তান হাইব্রিড মডেল পেয়েছে, বাংলাদেশ পায়নি। এটা ক্রিকেটের নিয়ম নয়, বিসিসিআই-এর অহংকার।

ভবিষ্যৎ পথ: কী করা উচিত?
বাংলাদেশকে এখন দরকার স্বাধীন কূটনীতি। ACC-এর মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা-পাকিস্তানের সঙ্গে জোট গড়তে হবে। আইসিসির বিরুদ্ধে ছোট বোর্ডগুলো একত্রিত হতে হবে। ডোমেস্টিক ক্রিকেট শক্তিশালী করতে হবে। তরুণদের জন্য বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগকে আন্তর্জাতিক মানের করতে হবে। রাষ্ট্র এবার বুঝুক—ক্রিকেট জাতীয় সম্মানের অংশ, কিন্তু এটাকে রাজনৈতিক প্যাঁচায় আটকে রাখলে দেশের যুবশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

এই সিদ্ধান্তে বাংলাদেশের ডিগনিটি অটুট রাখা হয়েছে, কিন্তু ক্রিকেট পিছিয়ে গেছে। আইসিসির দ্বিচারিতা ও বিসিসিআই নির্ভরতা প্রশ্নবিদ্ধ। সময় এসেছে ক্রিকেটকে রাজনীতি থেকে মুক্ত করার। নইলে, আমাদের স্বপ্নের খেলা শুধু মাঠের বাইরের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে যাবে।

লেখক, কলামিস্ট ও খেলা বিশ্লেষক
 

Link copied!