ইরান যুদ্ধে লক্ষ্যভ্রষ্ট যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: মার্চ ৫, ২০২৬, ১১:২৮ এএম
ইরান যুদ্ধে লক্ষ্যভ্রষ্ট যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে যৌথ অভিযান শুরু করার সময় তাদের মূল লক্ষ্য ছিল তেহরানের শাসনব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তন করা।
এই লক্ষ্য হয়ত এখন কাগজে-কলমে আছে। তবে ওয়াশিংটন থেকে আসা সাম্প্রতিক সব বার্তায় যে ইঙ্গিত মিলছে তাতে দেখা যাচ্ছে, আগের অবস্থান থেকে কিছুটা হলেও সরে এসে এখন নতুন করে হিসাব-নিকাশ করতে হচ্ছে তাদেরকে।
মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, এই অভিযানের ফলে ইরানের ভেতরে শাসনব্যবস্থার পতনের জন্য যে জনরোষ বা অস্থিরতা তৈরি হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তেমনটি ঘটেনি।

উল্টো চার দিনে গড়ানো যুদ্ধ গোটা অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থাও স্থিতিশীল আছে, এমনকি ইরান শত্রুপক্ষের বিভিন্ন অবস্থানে পাল্টা আঘাতও হেনে যাচ্ছে।

এ পরিস্থিতিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের পুরোনো হিসাব নতুন করে মেলাতে বাধ্য হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রকে নতুন কৌশল খুঁজতে হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন এবং তেহরানের আলোচনার প্রস্তাব মানার সম্ভাবনা নিয়ে তাদের আগের ধারণা এখন আর খাটছে না।

সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি হামলায় নিহত হওয়ার পর ইরানও আলোচনার কোনও সম্ভাবনা দেখছে না। তাছাড়া, আঞ্চলিক দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতায় ইরানের প্রতিক্রিয়া অনেকটা শীতল।

বরং যেসব দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও সামরিক স্থাপনা আছে, তাদেরকে সেগুলোর সুরক্ষা না দেওয়ার জন্য প্রকাশ্যেই হুমকি দিচ্ছে ইরান। বিষয়টি নিছক আদর্শিক অনমনীয়তা নয় বরং এটি ইরানের কৌশলগত মূল্যায়নেরই প্রতিফলন।

আর তা হচ্ছে এই যে, সাংঘর্ষিক পরিবেশে আলোচনা বা যুদ্ধবিরতি কোনও কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে আসতে না পারলে এটি কেবল মধ্যমেয়াদে আরও বড় হামলাই ডেকে আনবে।

দুটি বাস্তবতা এই উদ্বেগকে আরও জোরালো করেছে। প্রথমত, খোদ যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন স্বীকার করেছে যে, ইরানে যুদ্ধ স্বল্পস্থায়ী বা সীমিত না-ও হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদরদপ্তর পেন্টাগনে মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন যুদ্ধে আরও প্রাণহানির আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন।

যদিও মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ শঙ্কা দূর করার চেষ্টায় বলেছেন, “এটি ইরাক নয়, এটি অন্তহীন যুদ্ধও নয়।’

তবে তিনি ‘অন্তহীন’ যুদ্ধের সম্ভাবনা অস্বীকার করাতে এটিই প্রমাণ হয় যে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের বিষয়টি এখন গণমানুষের আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও একই সুরে কথা বলেছেন। তার এই কথার পুনরাবৃত্তি মূলত প্রাথমিক পর্যায়ে অভিযানের আকস্মিক ও প্রচণ্ড আঘাত (শক অ্যান্ড অউ)-এর প্রত্যাশিত সাফল্য না পাওয়া নিয়ে বাড়তে থাকা উদ্বেগ প্রশমনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্মিলিত চেষ্টারই প্রতিফলন।

তাছাড়া ইসরায়েল ইরানে হামলা চালাবে এবং এর পাল্টায় ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চড়াও হবে—যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন তা আগে থেকেই জানত বলে স্বীকার করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

ফলে তিনি অভিযানের লক্ষ্য না কমিয়ে বরং আরও বাড়িয়েছেন। রুবিও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করতে চায়।

তিনি বলেন, ‘আমাদের কয়েকটি লক্ষ্য আছে। সেগুলো অর্জন করতে যতটা সময় প্রয়োজন ততটা আমরা নেব।’

ইরানে শাসন পরিবর্তনের কোনও পরিকল্পনা নেই বলে হেগসেথ যে মন্তব্য করেছিলেন, রুবিওর ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নির্মূলের কথা নতুন করে বলা সেই একই বিষয়কে সামনে আনছে।

এতে এটাই স্পষ্ট হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রাথমিক যে কৌশলগত লক্ষ্য নিয়েছিল, তা অর্জনের পথ থেকে তারা এখনও অনেক দূরে আছে।

আগের আর পরের পরিস্থিতির এই ব্যবধান নতুন কোনও প্রস্থানের পথ খোঁজার চাপ তৈরি করেছে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে, ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন করতে হলে শেষ পর্যন্ত স্থল অভিযান চালানোর দরকার পড়বে।

এক্ষেত্রে ইরানের বিরোধী পক্ষ এবং কুর্দি গোষ্ঠীগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্র করছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।

রুবিও বলেছেন, “আমরা এই মুহূর্তে স্থল অভিযান চালানোর অবস্থানে নেই। তবে প্রেসিডেন্টের হাতে বিকল্প রয়েছে। তিনি কোনও সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছেন না।”

তার এই বক্তব্যে আভাস মেলে যে, শুরুর দিকের অভিযানে কৌশলগত ত্রুটিবিচ্যুতি ঠিক করে নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখন আরও বড় ঝুঁকি নেওয়া এবং সম্ভবত দীর্ঘ যুদ্ধে জড়াতেও প্রস্তুত থাকতে পারে।

এ ফ্রেমওয়ার্ক যেমন ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের ভুল হিসাব-নিকাশের ফল, তেমনি তা ইরানের নিজস্ব আভিযানিক সমন্বয়ের ফল।

ইসরায়েলে মাঝেমধ্যে বড় ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর বদলে ইরান এখন তাদের সুরক্ষা ব্যবস্থাকে অচল করে দিতে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ইরানের এই কৌশল তেমনই অভাবিত, যেমন অভাবিত বা চমকপ্রদ ছিল খামেনির ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চালানো শুরুর দিকের সেই ‘ডিক্যাপিটেশন স্ট্রাইক’।


ইরানের নতুন যুদ্ধকৌশল:

ইরানের যুদ্ধ কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সমর্থন থাকার কারণে কেবল ইসরায়েলের ক্ষয়ক্ষতি করে কোনও চূড়ান্ত রাজনৈতিক ফাটল ধরানো যাবে না বুঝতে পেরে ইরান হয়ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, তারা এখন পুরো অঞ্চলে যুদ্ধের ব্যয় ও ঝুঁকি বাড়াবে।

তবে এই যুদ্ধকৌশল তেহরানের জন্যও গুরুতর কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে। দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা নিশ্চিত করতে এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা অভ্যন্তরীনভাবে হিসাব-নিকাশ করছেন।

ইরানের একজন সামরিক কর্মকর্তা বর্তমান পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বলেন, “হামলার প্রথম ধাক্কার পর নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আঞ্চলিক সামরিক চেইনের সঙ্গে কেন্দ্রের সংযোগ ভেঙে পড়েছিল।

“বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে আগে ব্রিফিং পাওয়া ইউনিটগুলো নিজ নিজ এলাকায় নিজস্ব উদ্যোগে কাজ শুরু করেছিল। দ্বিতীয় দিন সকালের মধ্যে আবার সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয় এবং আমরা এর ফল পেতে শুরু করি। তবে রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনীর মধ্যে এখনও বেশ কিছু গোষ্ঠী আছে যাদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।”

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, “বহুস্তরীয় পরিকল্পনায় আমরা সবকিছু আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে এনেছি। আমাদের যে সক্ষমতা আছে তাতে এ অঞ্চলে কয়েক মাস যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।

“আমরা আমাদের নেতাকে হারিয়ে সবচেয়ে বড় মূল্য দিয়েছি। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে এই যুদ্ধের আরও চড়া মূল্য দিতে হবে। তাদের লক্ষ্য ছিল সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট। তবে তারা যে সামরিক সম্পদকে অবজ্ঞা করেছিল সেগুলো দিয়েই আমরা অন্তত আরও দু’মাস প্রতিরোধ বজায় রাখতে সক্ষম। আমাদের অস্ত্রের মজুত এবং পরিকল্পনা এখনও অটুট।”

মূলত যুদ্ধের দ্বিতীয় দিন থেকেই ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি দৃশ্যমান হতে থাকে। যদিও তাদের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের বাগাড়ম্বর উবে যায়নি। তবে আগের সেই জোর এখন আর তেমনভাবে নেই।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং বিশ্বজুড়ে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন পরীক্ষার মুখে পড়েছে।

স্থায়িত্ব পরীক্ষা:

এই স্থায়িত্বের পরীক্ষার প্রাথমিক লক্ষণ এরই মধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ছয়টি সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলা উপসাগরীয় দেশগুলোর নিজ ভূখণ্ডে মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার তাদের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের কিছু মজুত দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে এবং তারা জরুরি সহায়তা চেয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

ইরান এই সংঘাতকে কেবল ইসরায়েল-ইরান অক্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না, বরং তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বিস্তৃত মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ের স্থায়িত্বের পরীক্ষা নিচ্ছে।

রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আরব আমিরাত ও কাতারের নেতাদের সাম্প্রতিক আলোচনা থেকে একটি তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

খবর পাওয়া গেছে যে, আমিরাত জানিয়েছে তারা ক্ষুব্ধ। কারণ, ইরানের ওপর হামলার জন্য নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার পরও তাদের মাটিতে হামলা হয়েছে। পুতিন আমিরাতের এই অসন্তোষ ইরানকে জানাবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন।

এ থেকে এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যায় যে ইরান ইচ্ছাকৃতভাবেই এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশগুলোর নেটওয়ার্ক বিঘ্নিত করছে। উপসাগরীয় দেশগুলোকেও তেহরান এই বার্তা দিচ্ছে যে, ইরান যুদ্ধের এই পর্যায়টি পার করে ফেলতে পারলে ভবিষ্যতে তারা ওই দেশগুলোর আরও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে।

ইরানের এই নতুন যুদ্ধকৌশল উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা বলয়ের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভিতকে পরীক্ষায় ফেলেছে। তাছাড়া, ইউরোপের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বৈশ্বিক নিরাপত্তায় মার্কিন উপস্থিতি অপরিহার্য’ হওয়ার সেই বার্তাটিও জটিল করে তুলছে।

ইরান ‘যুদ্ধব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার’ কৌশলের সবচেয়ে বিপজ্জনক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে জ্বালানি খাত এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যকে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজগুলোতে হামলা চালানোর হুমকি দিয়েছে ইরান।

এতে তেল ও গ্যাসের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে। সৌদি আরব তাদের বৃহত্তম তেল শোধনাগার এবং কাতার বিশ্বের বৃহত্তম তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদন কেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে জ্বালানি তেলের দাম নাগালের মধ্যে রাখা বড় অগ্রাধিকারের বিষয় হলেও উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের হুমকির প্রভাবে সেই অগ্রাধিকার অনুযায়ী তেলের দাম কম রাখা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তেহরানের রণকৌশলটি সোজাসাপ্টা। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা যদি কমও থাকে, তাহলেও বৈশ্বিক পণ্য সরবরাহব্যবস্থা এবং নৌ বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশাল রাজনৈতিক ক্ষতির মুখে ফেলতে চায়।

কারণ, যুদ্ধ খরচ যত বাড়বে, আলোচনার টেবিলে ইরানের দর–কষাকষির ক্ষমতা তত শক্তিশালী হবে, যদি সংঘাতটি রাষ্ট্রকেন্দ্রিক থাকে এবং অনিয়ন্ত্রিত কোনও গোষ্ঠী সংঘাতের দিকে মোড় না নেয়।

ইরানে অভ্যন্তরীন সংঘাত:

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বারবার ইরানের জনগণকে জেগে ওঠার আহ্বানের পরও ইরানের অব্যন্তরে সরকারবিরোধী কোনও বড় গণ-অভ্যুত্থান এখনও দেখা যাচ্ছে না।

তবে এর মধ্যেই লক্ষ্যণীয় যে বিষয়টি ঘটছে তা হল- যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প কুর্দি নেতাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এখন সেই বিকল্প পথেই হাঁটছে, যা ইসরায়েলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল। তা হল ইরানে ‘অভ্যন্তরীন অস্থিতিশীলতা’ তৈরি করা।

ইসরায়েলি এক সূত্র বলেছে, “উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আজেরি, কুর্দি, লুর এবং সুন্নি গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিনই ধরেই তেহরানের ওপর ক্ষুব্ধ। অনেক দিক থেকেই তারা প্রস্তুত। একবার কর্মকাঠামো স্পষ্ট হলেই তারা সংগঠিত হতে পারে। আমরা যুক্তরাষ্ট্রকে বলেছি যে, এতে যুদ্ধের খরচ অনেক কমবে।”

ইরানি কর্মকর্তারা অবশ্য এই কৌশল উড়িয়ে দিয়েছেন। পশ্চিম ইরানের এক ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, “ইসরায়েল আগেও এই গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের ইরানে অনুপ্রবেশ করানোর চেষ্টা করেছে। আমরা ইরাকের পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছি।”

তিনি আরও বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের হামলা শুরু হওয়ার মুহূর্ত থেকেই আমরা এই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে নজরদারি করেছি এবং প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছি।

“যেসব কুর্দি গোষ্ঠীর সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ আছে তাদের সতর্ক করে দিয়েছি। ইসরায়েলের উচিত এ অঞ্চলের সংখ্যালঘু গোষ্ঠীগুলোর কাছে বিভ্রম বিক্রি বন্ধ করা।”

ইরান কেবল ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতেই হামলা চালায়নি, বরং তারা ইরানি কুর্দি গোষ্ঠী কেডিপিআই এবং প্যাক এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিবিরগুলোতেও আঘাত হেনেছে। ইরবিলের কাছে অন্তত পাঁচটি শিবিরে এই হামলা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

তবে ইসরায়েল পশ্চিম ইরানে যে ‘প্রক্সি গ্রাউন্ড’ সক্রিয় করতে চাইছে, তা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে সেটি অনিশ্চিত। তবে এ ধরনের যে কোনও উত্তেজনায় এ আঞ্চলকে আরও মূল্য দিতে হবে।

বিশেষ করে ইরানের ভেতরে ছড়িয়ে পড়া সংঘাতে তুরস্ক এবং প্রতিবেশী অন্য দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলবে এবং নতুন করে বহুমুখী সংকটের দিকে ঠেলে দেবে।

শেষ পর্যন্ত উদ্ভুত পরিস্থিতিতে দেখা যাচ্ছে, এই যুদ্ধের গতিপথ তাৎক্ষণিক কোনও কৌশলগত সাফল্য দিয়ে নির্ধারিত হবে না, বরং তা নির্ধারিত হবে মূল্য দেওয়ার বোঝা কার ওপর কতটা চাপছে তার ভারসাম্যের ওপর।

যুক্তরাষ্ট্র এই সংঘাতকে দীর্ঘমেয়াদি এবং প্রাণঘাতী লড়াই হিসেবেই ধরে নিচ্ছে। বিপরীতে ইরান ইচ্ছা করে সময়ক্ষেপণ করছে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বহুমুখী চাপ প্রয়োগ করে পাল্টা জবাব দিচ্ছে।

উপসাগরীয় দেশগুলোর মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা, কূটনৈতিক নিশানায় হামলা, হরমুজ প্রণালি দখলে রেখে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা তৈরি এবং বিশ্ব বাণিজ্যে বিঘ্ন ঘটানো- সবই ইরানের বৃহত্তর এক কৌশলের অংশ।

ইরানের লক্ষ্য, আঞ্চলিক সামরিক সংঘাতকে এমন এক সংকটে পরিণত করা, যা আন্তর্জাতিক মিত্রজোট, বিশ্ব অর্থনীতি এবং অভ্যন্তরীন রাজনীতিতে প্রভাব ফেলবে।

মূল প্রশ্ন এখন আর কেবল ইরানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে- এই যুদ্ধের ফলে ওয়াশিংটনের যে সামরিক সক্ষমতা প্রকাশ পেয়েছে এবং যেসব দুর্বলতা সামনে এসেছে, তা চীনের বিরুদ্ধে তাদের কৌশলগত সময়সূচিকে কীভাবে প্রভাবিত করবে?

আরও বড় প্রশ্ন হল- চীন যদি ব্যাপক পরিসরে একই ধরনের যুদ্ধব্যয় চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র তা কীভাবে মোকাবেলা করবে? এই অর্থে, ইরান সংকট এখন কেবল এক আঞ্চলিক পরীক্ষা নয়, বরং তা যুক্তরাষ্ট্রের সীমারও পরীক্ষা।

Link copied!