• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৪ জুন, ২০২৪, ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ৭ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

সাহিত্যাচার্য হাসান আজিজুল হক


রুমা মোদক
প্রকাশিত: সেপ্টেম্বর ৯, ২০২১, ০৪:১৮ পিএম
সাহিত্যাচার্য হাসান আজিজুল হক

উপমহাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী অভিঘাত সৃষ্টিকারী ঘটনা বোধকরি দেশভাগ, সুশাসনের কুহকে ঢাকা প্রতারণা ও চাতুর্যের ইতিবৃত্ত। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বলি লাখ লাখ মানুষ, যার প্রভাব প্রজন্মের পর প্রজন্ম অনিচ্ছা আর পর্যদুস্ততায় আজও বহন করে চলেছে। এ এমন এক ক্ষত, যে ক্ষত সৃষ্টিতে সাধারণ মানুষের কোনো দায় ছিল না অথচ সেই সবচেয়ে বেশি ভুক্তভোগী।

দেশভাগের এক রক্তাক্ত পথিক হাসান আজিজুল হক। ক্ষত-বিক্ষত। নিজ জীবনের অভিজ্ঞতায়, পথচলতি যাপনের অভিজ্ঞতায়। র‌্যাডক্লিফের যথেচ্ছ ছুরি তাঁকে উৎখাত করেছে ভিটেমাটি থেকে, রাঢ়বঙ্গের শিকড় থেকে। তিনি কিংবা তাঁরা চেয়েছিলেন কি চাননি তোয়াক্কা না করে। রাজনীতির চালে জনসাধারণ খেলোয়াড়ের ঘুঁটির মতো জরুরি কিন্তু ‘জড়’। তাদের আবার চাওয়া-পাওয়া, প্রত্যাশা-হতাশা! তাদের ঠেলে দেওয়া যায় শিয়ালদা স্টেশনের উদ্বাস্তু জীবনে। তুলে দেওয়া যায় মৃত্যুর ট্রেনে। তারা প্রতিবাদ জানে না, নিয়তি জানে। আর কিছু রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষী নেতৃত্বের লোভের যূপকাষ্ঠে গলা বাড়িয়ে দেয় নির্বিবাদে।

রাজনীতি তারপরও ক্ষান্ত নয়। পক্ষপাতদুষ্ট নানা ন্যারেটিভের আশ্রয়ে ভুলিয়ে দিতে চায় প্রতারক সেই নিয়ামককে। মানুষকে বিশ্বাস করাতে চায়, সে উত্তঙ্গু। ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতালিপ্সু গোষ্ঠী অখণ্ড পৃথিবীকে নানা সংকীর্ণতার প্রাচীরে বিভক্ত করতে গিয়ে তারা আরোপ করে মহত্ত্বের মোড়ক। সবাই নয়, কেউ কেউ। রুখে দাঁড়ায়। প্রতিবাদে, রোষে। কখনো তাঁর অস্ত্র অসী নয়, বরং তার চেয়ে শক্তিশালী মসী। ক্রমাগত যা আঘাত করে সংবেদনশীলতায়, পুনঃ পুন বলে যায় বিস্মৃত বিশ্বাসঘাতক সময়ের কথা। হাসান আজিজুল হক সেই সময়ের কথা বলেন।

বর্ধমানের ছেলে চলে এলেন পূর্ববঙ্গে। এলেন বটে। সঙ্গে নিয়ে এলেন যে ট্রমা, শৈশব-কৈশোর ফেলে আসার ট্রমা, হয়তো তা একটুখানি লাল মাটির জন্য, ঘরের টিনের পাঁচিলের জন্য, আর দুঃসহ অভিজ্ঞতা। উদ্বাস্তু জীবনের পর্যদুস্ত যাপনের অভিজ্ঞতা। টিকে থাকার নির্মম লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা আর তা থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জন্ম নিলেন একজন হাসান আজিজুল হক। শুধু কি তা থেকেই? উৎখাত হওয়ার পর টিকে থাকার লড়াই, আর সেই নির্মমতাকে ক্রমাগত ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা তা-ও কি কম বড় নিয়ামক একজন হাসান আজিজুল হক তৈরিতে!

‘আত্মজা ও একটি করবী গাছ’-এর লেখক হিসেবে তাঁকে যখন আবিষ্কার করি আমরা, তার আগে কি ঋত্বিক ঘটকের সঙ্গে পরিচয় হয়? ঋত্বিক ঘটক মানে, মেঘে ঢাকা তারা। দুই বাংলা থেকে উৎখাত দুই ক্ষণজন্মা। অভিজ্ঞতা আর অনুভূতির একই বীজতলা। তাই কি ‘আত্মজা ও করবী গাছ’-এর বৃদ্ধ পিতা আর ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারার বৃদ্ধ পিতা কোথায় এক গভীর বিষাদের সংবেদনে এক হয়ে যায় আমাদের কাছে। আমরা দেখি মহৎ নির্মাণ হাসান আজিজুল হক আর ঋত্বিক ঘটককে একীভূত করে দেয় এক ফেনোমেনায়। তাঁদের অভিজ্ঞতালব্ধ ন্যারেশন, কখনো বইয়ের পাতায়, কখনো সেলুলয়েডের ফিতায় সাক্ষ্য হয়ে ওঠে ঐতিহাসিক ক্রান্তিকালের। তাঁরা কালের কথক। কালোত্তীর্ণ। বলে যাওয়ার দায়তাড়িত সৃষ্টিশীলতা।
চর্যাপদের কবিরা শবরি বালির মতো চরিত্রকে কালের গর্ভে রোপণ করে গেছেন বলে আমরা সে সময়কে জানি। উঁচু পর্বতে তার বাস ছিল, হাঁড়িতে ভাত ছিল না নিত্য উপবাসের জীবন ছিল। একাডেমিক প্রথাবদ্ধতা যে ইতিহাস পড়ায় পাল বংশ, সেন বংশ, মৌর্য আমল, গুপ্ত আমল কোথাও কি এই শবরি বালির কথা বলা আছে? অথচ এই হাজার হাজার সাব অল্টার্ন মানুষেরাই তো সভ্যতার পরিবর্তনের মূল নিয়ামক, ভুক্তভোগী এবং আত্মত্যাগী।

হাসান আজিজুল হক সেই ইতিহাসের কথা বলেন, যে ইতিহাস রাজপ্রাসাদ আর রাজসিংহাসন ছেড়ে কুঁড়েঘরে আসন পাতে। রাজ সিংহাসন দখলের দুই কুকুরের লড়াই যেখানে কোনো অবস্থাতেই টিকে থাকার লড়াইয়ের চেয়ে মূল্যবান হয়ে ওঠে না। আভিজাত্যে যারা উপেক্ষিত অথচ সময়ের উত্থান-পতনে যাদের অবস্থান সবচেয়ে গুরুত্ববহ। কখনো সে সময়ের নাম শকুন, কখনো গুনীন, কখনো আত্মজা ও একটি করবী গাছ, কখনো পাতালে হাসপাতালে।

লেখক মূলত ঘুরেফিরে নিজেকেই লেখেন। নিজেকে লেখেন অর্থাৎ নিজের দর্শন আর দায়বোধের দায় শোধ করেন। এই দর্শন তৈরি হয় অভিজ্ঞতা থেকে। একজন মানুষ যখন হয়ে ওঠেন, ওঠার বাঁকে বাঁকে তাঁর যে অর্জন কিংবা বিসর্জন, যা দিয়ে নির্মিত হয় সে, তার সবটুকু জারিত করে তাঁর লেখা। হাসান আজিজুল হক যে করবী গাছের কথা লেখেন, তা মূলত তাঁর লেখক সত্তা নির্মিত। তাঁকে লিখতে হয়েছে সেই বৃক্ষের কথা। যে বৃক্ষে ফুল হয়, সে ফুলে বিষ থাকে। হাসান আজিজুল হক দেশভাগের ট্র্যাজেডিতে সদ্য তো বটেই সুদূরতায়ও বিষ দেখতে পেরেছিলেন, জ্যোতিষীর মতো। তাই করবী গাছটা বুড়ো রুয়ে দেন মাটি পরিবর্তন করে এসেই। মেয়ে নয়, পিতা নয়, করবী ফুলের গাছটাই লেখকের কাঙ্ক্ষিত নির্মাণ, গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি উদ্বাস্তু জীবনের যে নির্মমতা লিখতে চেয়েছেন, লিখতে চেয়েছেন যে বিষবৃক্ষের কথা, এর চেয়ে নান্দনিক আশ্রয় আর কী হতে পারে? 
‘শকুন’ গল্পেও একটা শকুন আঁকেন তিনি। দলছাড়া শকুন। আমরা শকুনের গল্প পড়ি। একদল ছেলের তাকে তাড়া করে ফেরা, তিনি হাসান আজিজুল হক, প্রথম গল্পেই মরা শকুনের পাশে মৃত বাচ্চাটি রেখে আর বিধবা মেয়েটিকে কোথাও দেখা যায় না ইঙ্গিত রেখে গল্প শেষ করে দেন। শেষ ধাক্কায় আমরা হতচকিত হয়ে আবিষ্কার করি তাঁকে। প্রথম গল্পের শেষ ধাক্কা। আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তিমূল নাড়িয়ে দেয়। সত্য এবং নির্মম নগ্ন সত্যকে বলে দেওয়ার দায় নিয়ে তিনি আবির্ভূত হন। তারপর অনতিদীর্ঘ সাহিত্যজীবনের ভ্রমণে তিনি ক্লান্তিহীন পথিক, লিখে যান, লিখে যান কেবল মানুষকেই। লিখে যান বিক্ষুব্ধ, পর্যদুস্ত জীবনকে।

আমাদের সাহিত্যের ট্রাজিক গন্তব্য ঈদসংখ্যা। বাজার চলতি লেখকের অপরিসীম ক্ষমতা। সিজনে গোটা কয়েক উপন্যাস। ঈদে ঈদসংখ্যায় লেখার পরিমাণ বড় লেখকের (?) পরিমাপক। তিনি সে মৌসুমে আত্মসমর্পণের জন্য আসেননি। লিখে গেছেন। লিখে গেছেন গল্প। পাঠক প্রত্যাশা করছে উপন্যাস। তিনি থোড়াই কেয়ার করছেন পাঠক প্রত্যাশা। বাজার চলতি জনপ্রিয়তার হাতছানি। শেষ বয়সে এসে লিখলেন দুখানি উপন্যাস।
মানুষের কাছে তাঁর দায় ছিল। এ দায় তাঁকে দিয়েছিল তাঁর যাপিত জীবন। জীবন কি কেবলই বিষাদময় যাপনের? তিনি নিজে বলেন, যা দেখেছি তাই তো বলি। আমরাও তাই দেখি না কি? যদি পক্ষপাতের অন্ধত্ব গ্রাস না করে। ফুলের বিছানা কই এখানে?

হাসান আজিজুল হক কি ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ ছিলেন? মার্কসিস্ট আদর্শে চালিত হয়েছেন, ফলত তাঁর গল্প একরৈখিক আদর্শায়িত বৈচিত্র্যহীন, এমন অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। কিন্তু এখানেই তিনি এক ও অনন্য। তিনি লিখেছেন নিজের তাগিদে। পাঠকের চাহিদা নয়, বিনোদিত করা নয়। জনপ্রিয়তার মোহ তাঁকে স্পর্শ করেনি, সেলাম ঠুকে সম্ভ্রমে সরে দাঁড়িয়েছে। তিনি তাই লিখেছেন যার প্রতি নিজে দায় বোধ করেছেন।

লেখক হয়ে উঠা, হয়ে উঠতে চাওয়ার নানা ধাপে আমরা অনেকেই বিভ্রান্ত হই। পাঠকের রুচি নিবৃত্তির বিনিময়ে নানাবিধ প্রাপ্তিতে উচ্ছ্বসিত হই, দিগভ্রান্ত হই। আমাদের গন্তব্য কিংবা দায় ভুলে যাই। কখনো অস্বীকারও করি। জীবদ্দশায় অর্থ-বিত্ত-খ্যাতির মোহ ত্যাগ করা বড়ো কঠিন। পারি কিংবা না পারি, লেখক হিসেবে এই কাঙ্ক্ষার কাছে আমরা নতজানু হই কতো সহজে। হাসান আজিজুল হক তাঁর বিপরীতে দাঁড়িয়ে থেকেছেন নিজের দৃঢ়তায়, নিবেদনে।

নিতান্ত ক্ষুদ্র এক লেখক হয়ে আমি মূলত তাঁর এই আত্মনিবেদন অনুসরণ করি একাগ্রতায়। যে একাগ্রতায় তিনি একজনই, অদ্বিতীয় বাংলাদেশে, বাংলা সাহিত্যে। তাঁর সমতুল্য দূরে থাক, তুলনাযোগ্য কাউকে দেখি না চতুপার্শ্বে। লিখতে আসা, লিখতে থাকা বিরতিহীন প্রজন্মের কাছে তিনি সম্মুখ বিস্তার করে থাকা অনুকরণীয় আচার্য।

Link copied!