রমজান শুরুর কয়েক দিন যেতেই অনেকের অভিযোগ একটাই— সারা দিন ঠিকঠাক থাকলেও ইফতারের পর শরীর হঠাৎ ভারী লাগে, প্রচণ্ড ঘুম পায়, পেটে গ্যাস ও অস্বস্তি তৈরি হয়। অনেকেই এটাকে রোজার স্বাভাবিক ক্লান্তি ভেবে উড়িয়ে দেন, কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর মূল কারণ অনেক সময়ই আমাদের গাট হেলথ বা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের ভারসাম্যহীনতা।
আমাদের পরিপাকতন্ত্রে কোটি কোটি উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে, যাদের একসঙ্গে বলা হয় গাট মাইক্রোবায়োটা। এরা শুধু খাবার হজমই করে না, বরং শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও শক্তি তৈরির প্রক্রিয়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ও বৈচিত্র্য কমে গেলে পেট ফাঁপা, এসিডিটি, গ্যাস, এমনকি অকারণে ক্লান্তি বা অবসাদও দেখা দিতে পারে।
কেন ইফতারের পর বেশি খারাপ লাগে?
দিনভর না খেয়ে থাকার পর আমরা বেশিরভাগ সময় ইফতারে একসঙ্গে অনেক ভাজাপোড়া, মিষ্টি আর ভারী খাবার খেয়ে ফেলি। এতে হঠাৎ করে পাকস্থলীতে প্রচণ্ড চাপ পড়ে, খাবার ধীরে ও ঠিকমতো হজম না হয়ে গ্যাস ও প্রদাহ তৈরি করে, ফলে পেট ফুলে শক্ত হয়ে যায় এবং শরীর কেমন অলস ও ঝিমিয়ে পড়া লাগে।
এর সঙ্গে যখন খুব দ্রুত খাবার খাওয়ার অভ্যাস, অতিরিক্ত তেল-চর্বি, মিষ্টি পানীয় বা কার্বনেটেড ড্রিংকস যোগ হয়, তখন পরিপাকতন্ত্রের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়। ফলে খাবার থেকে ঠিকমতো পুষ্টি ও শক্তি পাওয়া যায় না, পেট ভরা থাকলেও শরীর দুর্বল মনে হয়।
রোজা কি তবে ক্ষতির কারণ?
রোজা নিজে শরীরের ক্ষতি করে না, বরং নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে রোজা থাকলে পরিপাকতন্ত্রের জন্য এটি অনেকটা ‘ক্লিনিং প্রসেস’ হিসেবে কাজ করতে পারে। দীর্ঘ সময় খাবার না পাওয়ায় অন্ত্র জমে থাকা কিছু অবাঞ্ছিত উপাদান দূর করার সুযোগ পায় এবং হজমতন্ত্র এক ধরনের বিশ্রাম ও পুনর্গঠনের সময় পায়।
সমস্যা হয় তখনই, যখন ইফতার ও সেহরিতে অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত, অতিমিষ্টি বা প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খাওয়া হয় এবং ধীরে ধীরে একটি স্বাস্থ্যকর ডায়েটের বদলে গাটের জন্য ক্ষতিকর অভ্যাস তৈরি হয়।
ইফতারের পর স্বস্তি পেতে ৫টি সহজ অভ্যাস
১. ধীরে ও হালকা দিয়ে শুরু করুন
খেজুর ও পানি দিয়ে ইফতার শুরু করুন, তারপর কয়েক মিনিট বিরতি নিন। একসঙ্গে অনেক ভাজাপোড়া বা ভারী খাবার না খেয়ে ধীরে ধীরে প্লেট ভরুন। এতে পাকস্থলী ধীরে ধীরে সক্রিয় হয় এবং হজম সহজ হয়।
২. ভাজাপোড়ার বদলে হালকা খাবার
শুরুতে স্যুপ, ফল বা সবজি–ভিত্তিক হালকা খাবার রাখুন। অতিরিক্ত তেলমুক্ত ও আঁশযুক্ত এসব খাবার গাটের জন্য উপকারী এবং পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি কমায়।
৩. খাবারে প্রোবায়োটিক যোগ করুন
ইফতার বা রাতের খাবারে দই, ফারমেন্টেড খাবার বা প্রোবায়োটিক–সমৃদ্ধ খাবার রাখুন। এগুলো অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়াতে সাহায্য করে, ফলে হজম ভালো হয় ও ক্লান্তিও তুলনামূলক কম লাগে।
৪. সেহরিতে আঁশ ও পানি নিন
সেহরিতে লাল চাল, ডাল, সবজি, ফলের মতো আঁশযুক্ত খাবার রাখুন এবং ইফতার থেকে সেহরি পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানি পান করুন। এতে কোষ্ঠকাঠিন্য কমে, হজম প্রক্রিয়াও ভারসাম্য বজায় থাকে।
৫. মনোযোগ দিয়ে ধীরে ধীরে খান
খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে ধীরে ধীরে খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা ও এসিডিটির ঝুঁকি অনেক কমে যায়। ইফতারের পর সঙ্গে সঙ্গে শুয়ে না পড়ে অল্প হাঁটাহাঁটি করলে হজম আরও সহজ হয় এবং শরীর কম ভারী লাগে।
রমজান শুধু ইবাদতের মাসই নয়, বরং শরীর–মনের যত্ন নেওয়ারও একটি সুযোগ। খাদ্যাভ্যাসে সামান্য সচেতনতা আর গাটের সঠিক যত্ন নিলে ইফতারের পরের ক্লান্তি কমে গিয়ে রোজার প্রতিটি দিন হতে পারে আরও প্রাণবন্ত ও আরামদায়ক।







































