তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা: আলোচনায় যারা


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম
তারেক রহমানের মন্ত্রিসভা: আলোচনায় যারা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ২০ বছর পর সরকার গঠন করতে যাচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন দলটি। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফলাফলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসন পেয়েছে, যেখানে বিএনপি একক দল হিসেবে পেয়েছে ২০৯টি আসন।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা দিয়েছেন ১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকার গঠন করা হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ইতিমধ্যে নতুন মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের জন্য ৪৫টি গাড়ি প্রস্তুত করেছে। দুটি সংসদীয় আসন থেকে বিজয়ী তারেক রহমান দেশের ১১তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন।

মন্ত্রিসভার কাঠামো

বিএনপির একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে, নতুন মন্ত্রিসভা হবে নবীন-প্রবীণের মিশেলে। দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত ক্লিন ইমেজের তরুণ সংসদ সদস্যরা মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন। অতীতে দলের প্রতি ত্যাগ ও যোগ্যতার ভিত্তিতে মন্ত্রিপরিষদে জায়গা পাবেন নেতারা। বিষয়ভিত্তিক এক্সপার্টদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং ঢাউস কোনো মন্ত্রিসভা করা হবে না বলে জানা গেছে।

বিএনপির মিত্র দলগুলোর একাধিক শীর্ষ নেতাকে মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়ে জাতীয় সরকারের আদলে মন্ত্রিসভা গঠন করা হবে। জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরিত রাজনৈতিক সমঝোতা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।

প্রধান মন্ত্রণালয়ের সম্ভাব্য মন্ত্রীরা

গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর: বিএনপি মহাসচিব রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে যাচ্ছেন। তাঁকে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখা যেতে পারে। ২০০১ সালে তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রী ছিলেন।

মির্জা আব্বাস: স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং ঢাকা-৮ আসনে বিজয়ী মির্জা আব্বাসকে আবারও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখা যেতে পারে।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়: স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এর আগে তিনি একই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

অর্থনৈতিক মন্ত্রণালয়

ড. আব্দুল মঈন খান: স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন।

ড. রেজা কিবরিয়া: সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এম এস কিবরিয়ার ছেলে ড. রেজা কিবরিয়া অর্থমন্ত্রী হিসেবে জোরালো আলোচনায় রয়েছেন।

আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী: তাঁকে পররাষ্ট্র অথবা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখা যেতে পারে।

শক্তি ও অবকাঠামো

ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু: ২০০১ সালে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী টুকু এবার পূর্ণাঙ্গ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী হতে পারেন।

আইন ও বিচার বিভাগ

সালাহউদ্দিন আহমদ: স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ আইন অথবা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন।

অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদ ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল: সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আসাদুজ্জামান আসাদ এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আইন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে আলোচনায় রয়েছেন।

স্বাস্থ্য ও সামাজিক কল্যাণ

ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন: তাঁকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে দেখা যেতে পারে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দেখা যেতে পারে সিরাজগঞ্জ-৬ আসন থেকে নির্বাচিত প্রফেসর ড. এম এ মুহিত।

শিক্ষা ও সংস্কৃতি

এহসানুল হক মিলন: সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে পারেন। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার নামেও গুঞ্জন রয়েছে।

শ্রম ও কর্মসংস্থান

অ্যাডভোকেট শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস: বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক বিশেষ সহকারী শিমুল বিশ্বাস শ্রমমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী হতে পারেন ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু আশফাক।

টেকনোক্র্যাট কোটায় সম্ভাব্য মন্ত্রীরা

রুহুল কবির রিজভী: বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নির্বাচনে অংশ নেননি। তবে তাঁকে টেকনোক্র্যাট কোটায় তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী করা হতে পারে। এ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল আলোচনায় আছেন।

শামসুজ্জামান দুদু: কৃষক দলের সাবেক আহ্বায়ক ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু টেকনোক্র্যাট কোটায় কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন।

হুমায়ুন কবির: বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির টেকনোক্র্যাট কোটায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতে আলোচনায় রয়েছেন।

মাহদী আমিন: বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পেতে পারেন। এ ছাড়া তিনি প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতাবিষয়ক বড় কোনো দায়িত্বেও যেতে পারেন।

টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী হিসেবে আরও আলোচনায় আছেন নজরুল ইসলাম খান, বেগম সেলিমা রহমান, ইসমাঈল জবিউল্লাহ, জিয়া হায়দার এবং হাবীব-উন-নবী খান সোহেল।

মহিলা নেত্রীরা

শামা ওবায়েদ: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দেখা যেতে পারে।

অ্যাডভোকেট ফারজানা শারমিন পুতুল: মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন।

ব্যারিস্টার জাইমা রহমান: তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতাবিষয়ক বড় কোনো দায়িত্বে যাচ্ছেন বলে জোরালো আলোচনা রয়েছে।

স্থায়ী কমিটির অন্যান্য সদস্যরা

মন্ত্রিসভায় থাকছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহম্মদসহ আরও কয়েকজন।

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নেতারা

মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন আবদুল আউয়াল মিন্টু, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী, জহিরউদ্দিন স্বপন, রাশিদুজ্জামান মিল্লাত, শরীফুল আলম, দেওয়ান সালাহউদ্দিন, হাবিবুর রশিদ হাবিব, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনে নির্বাচিত ফজলুর রহমান, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনে নির্বাচিত মুশফিকুর রহমান, যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, ডা. রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, আসাদুল হাবীব দুলু, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু এবং রকিবুল ইসলাম বকুল।

এ ছাড়া পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি থেকে নির্বাচিত আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, রাঙামাটি ও বান্দরবান আসন থেকে নির্বাচিত দুজনের মধ্যে একজনও মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন।

জোট সঙ্গীদের প্রতিনিধিত্ব

বিএনপির শরিক জোট থেকে মন্ত্রিসভায় স্থান পেতে পারেন আন্দালিব রহমান পার্থ, ববি হাজ্জাজ, ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূর এবং জোনায়েদ সাকি। এ ছাড়া সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, আজিজুল বারী হেলাল ও ব্যারিস্টার মীর হেলালের নামও আলোচনায় রয়েছে।

স্পিকার পদে

জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে জোরালো আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, মুলাদী-বাবুগঞ্জ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন।

বিশেষ দায়িত্বে

জয়নুল আবদিন ফারুক: চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও নোয়াখালী-২ আসন থেকে ষষ্ঠবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত জয়নুল আবদিন ফারুককে গুরুত্বপূর্ণ কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এর আগে তিনি বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ছিলেন।

সাংবিধানিক প্রক্রিয়া

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, নির্বাচন কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে গেজেট নোটিফিকেশনের মাধ্যমে ফলাফল ঘোষণার পর সংসদ সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিষয়টি সাংবিধানিকভাবেই হবে। তিনি বলেন, "এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতান্ত্রিক যে যাত্রা শুরু হলো, তা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। সব রাষ্ট্র কাঠামোর গণতান্ত্রিক সংস্কার এবং সংবিধানের কাঙ্ক্ষিত গণতান্ত্রিক সংস্কার করা হবে।" তিনি আরও জানান, জুলাই জাতীয় সনদে স্বাক্ষরিত রাজনৈতিক সমঝোতার দলিল অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হবে।

 

 

রাজনৈতিক মহল থেকে শুরু করে সচিবালয়, অফিস-আদালত, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, এমনকি চায়ের দোকানেও চলছে মন্ত্রিসভা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ নেওয়ার পরই মন্ত্রিসভা গঠনের চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে। দেশবাসী স্বল্প সময়ের মধ্যেই নতুন সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি নতুন মন্ত্রিপরিষদ দেখতে পাবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনে উল্লিখিত সব তথ্যই রাজনৈতিক আলোচনা ও সূত্রভিত্তিক। চূড়ান্ত মন্ত্রিসভা তালিকা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষণা করবেন।

Link copied!