• ঢাকা
  • রবিবার, ১৯ মে, ২০২৪, ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১,

জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশব্দ প্রীতিলতা


হাসান শাওন
প্রকাশিত: মে ৫, ২০২৩, ১১:৪২ এএম
জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশব্দ প্রীতিলতা

পরাধীন মাতৃভূমি কে চায়? মায়ের দেশকে স্বাধীন করার স্বপ্ন দেখতে হয় তখন বিপ্লবীদের। তেমনই এক মহান বিপ্লবীর জন্ম দিবস আজ। ১৯১১ সালের ৫ মে চট্টগ্রামের ধলঘাটে জন্ম ‘ফুলতারা’ ছদ্মনামের প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের। এই বীরকন্যা বিবেচিত হন ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী শহীদ ব্যক্তিত্ব হিসেবে।

প্রীতিলতার বাবা ছিলেন জগদ্বন্ধু ওয়াদ্দেদার। তার মা প্রতিভা দেবী। ছোটবেলায় মা আদর করে প্রীতিলতাকে ‘রানী’ নামে ডাকতেন। বড় হতে হতে তিনি প্রভাবিতও হন এক বিপ্লবী রানীর দ্বারা। ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তখন তিনি। এর ইতিহাস শিক্ষক পড়াতেন পুরুষের বেশে ঝাঁসীর রানী লক্ষ্মীবাইয়ের ইংরেজ সৈন্যদের সঙ্গে লড়াইয়ের পর্ব। সে বয়সেই প্রীতিলতার মনে দেশ মুক্তির বীজ রোপিত হয়।  

বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার ছিলেন প্রীতিলতার নিকট-আত্মীয় । তিনি তখন বিপ্লবী দলের কর্মী। পূর্ণেন্দুর কাছে থাকা রাজনৈতিক সাহিত্যের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘দেশের কথা’, ‘বাঘা যতীন’, ‘ক্ষুদিরাম’, ‘কানাইলাল’—এই বইগুলো তার পড়া হয়ে যায়। এ পাঠ প্রীতিলতাকে বিপ্লবের আদর্শে ধাবিত করে। প্রীতিলতা পূর্ণেন্দু দস্তিদারের কাছে বিপ্লবী সংগঠনে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু তখন পর্যন্ত বিপ্লবী দলে নারী সদস্য গ্রহণ করা হতো না।

১৯২৯ সালের মে মাসে চট্টগ্রামে মাস্টারদা সূর্যসেন তার সহযোগীদের নিয়ে জেলা সম্মেলন, ছাত্র সম্মেলন ও যুব সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু নারী সম্মেলনের কোনো পরিকল্পনা তখন তার ছিল না। কিন্তু পূর্ণেন্দু দস্তিদারের বিপুল আগ্রহে সূর্যসেন নারী সম্মেলন আয়োজনে সম্মতি দেন। এরপর প্রীতিলতার বিপ্লবী দলে যোগ দেওয়ার বাসনা বাস্তব হয়। এক পর্যায়ে বিপ্লবী সূর্যসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় প্রীতিলতার। তিনি বিপ্লবী দলে জড়িয়ে নিভৃতে নিতে থাকেন সশস্ত্র যুদ্ধের প্রশিক্ষণ।

১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব দখলের সশস্ত্র লড়াইয়ে ১৫ জনের একটি বিপ্লবী দলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রীতিলতা। এ ক্লাবে একটি সাইনবোর্ড ছিল। তাতে লেখা ছিল, ‘কুকুর এবং ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ।’ লড়াইয়ের এক পর্যায়ে পুলিশের হাতে আটক এড়াতে প্রীতিলতা সায়ানাইড খেয়ে আত্মহত্যা করেন।

আত্মাহুতির আগে একটি চিঠি লেখেন প্রীতিলতা। সহযোদ্ধাদের হাত ঘুরে যা পরে প্রকাশিত হয়। এর বক্তব্য ছিল এমন-

“আমরা দেশের মুক্তির জন্যই এই সশস্ত্র যুদ্ধ করিতেছি। অদ্যকার পাহাড়তলী ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ স্বাধীনতাযুদ্ধের একটা অংশ। দেশের মুক্তিসংগ্রামে নারী ও পুরুষের পার্থক্য আমাকে ব্যথিত করিয়াছিল। যদি আমাদের ভাইয়েরা মাতৃভূমির জন্য যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে পারে, আমরা ভগিনীরা কেন উহা পারিব না? নারীরা আজ কঠোর সংকল্প নিয়েছে যে, তাহারা আর পশ্চাতে পড়িয়া থাকিবে না, নিজ মাতৃভূমির মুক্তির জন্য যেকোনো দুরূহ বা ভয়াবহ ব্যাপারে ভাইদের পাশাপাশি দাঁড়াইয়া সংগ্রাম করিতে তাহারা ইচ্ছুক, ইহা প্রমাণ করিবার জন্যই আজিকার এই অভিযানের নেতৃত্ব আমি গ্রহণ করিতেছি।

আমি ঐকান্তিকভাবে আশা করি যে, আমার দেশের ভগিনীরা আর নিজেকে দুর্বল মনে করিবেন না। এই আশা লইয়াই আমি আজ আত্মদানে অগ্রসর হইলাম।”

মাত্র ২১ বছর বয়সে তার এ অকাল মৃত্যু ইতিহাস ভুলে যায়নি। যুগে যুগে কালে কালে প্রীতিলতা বীরকন্যা হয়ে ফিরে আসেন। জুলুমের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের এক প্রতিশব্দ তাই যেন প্রীতিলতা।
 

Link copied!