• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১, ৬ শাওয়াল ১৪৪৫

কান্তনগর মন্দির : উত্তর বাংলার অনন্য স্থাপত্য


এলিজা বিনতে এলাহী
প্রকাশিত: মার্চ ২৭, ২০২৪, ০৭:৩৫ পিএম
কান্তনগর মন্দির : উত্তর বাংলার অনন্য স্থাপত্য
কান্তজীর মন্দির। ছবি : লেখিকা

গোটা দেশে ইতিহাসের পথে হাঁটতে গিয়ে, আমার অভিজ্ঞতা ও অনুসন্ধানে আমি উত্তরবঙ্গকে বাংলাদেশের হেরিটেজ জোন হিসেবে পেয়েছি। আমার অনেক লেখায় ও আলোচনায় এই কথাটি আমি বারবার বলেছি। উত্তর বাংলার ১৬টি জেলার মধ্যে কিছু স্থাপত্য রয়েছে, যা প্রাচীন বাংলার তথা আমাদের ভূখণ্ডের সমৃদ্ধির ইতিহাস তুলে ধরে। তেমনই একটি স্থাপনা কান্তনগর মন্দির। কান্তনগর মন্দিরখ্যাত দিনাজপুর জেলা হেরিটেজ ট্যুরিজম বিকাশের জন্য একটি আইকনিক শহর। দিনাজপুরের অনেকবারই যাওয়া হয়েছে ঐতিহ্য ভ্রমণে। যতবারই যাই, ততবারই সমৃদ্ধ এক দিনাজপুরের দেখা পাই। একই কথা প্রযোজ্য কান্তনগর মন্দিরের ক্ষেত্রে। আপনি যতবারই মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কারুশৈলী পরখ করবেন, ততবারই মনে হবে গত পরিভ্রমণে এই দৃশ্য চোখে পড়েনি। 

কান্তনগর মন্দির আমি পরিভ্রমণ করি ২০১৮, ২০১৯, ২০২০ ও ২০২২ সালে। চার সময়ের অভিজ্ঞতা মিলিয়েই আজকের ভ্রমণরচনা। ২০১৯ সালে সৌভাগ্য হয়েছিল মন্দিরের ভেতরে প্রবেশ করবার। এই মন্দিরের ভ্রমণ গল্প করতে হলে আসলে ইতিহাসে প্রবেশ করতে হবে। 

১৮৯৭ সালের প্রবল ভূমিকম্পে তিনতলা ও নয় চুড়াবিশিস্ট এই মন্দিরের ক্ষতিসাধনের কারণে নয়টি চূড়া বিনষ্ট হলেও পোড়ামাটির চিত্র ফলকের জন্য সমগ্র উপমহাদেশে বিখ্যাত এই তিনতলা মন্দির তার অপরূপ পোড়ামাটির সম্ভার নিয়ে আজও সগৌরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে। 

কান্তনগর মন্দিরের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে মন্দিরের গর্ভগৃহ এবং সেখানেই কান্তজীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত। এই কক্ষটি বেশ ছোট। মন্দিরের পশ্চিম দিক থেকে একটি সিঁড়ি ওপরে উঠে গেছে। দোতলায় রয়েছে ৪টি কক্ষ। দোলমঞ্চের আকারে নির্মিত মন্দিরের দোতলাটি একতলার চাইতে বেশ ছোট। মন্দিরের তিনতলায় কোনো কক্ষ নেই। ভূমি থেকে কান্তনগর মন্দিরের কেন্দ্রীয় চূড়ার উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। 

আগেই বলেছি এই মন্দিরের সব থেকে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর পোড়ামাটির চিত্রফলক। রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণে বর্নিত উল্লেখযোগ্য কাহিনিগুলো পোড়ামাটির চিত্রফলকের মাধ্যমে মন্দিরের গায়ে তুলে ধরা হয়েছে। সেই সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে সমসাময়িক অর্থাৎ আঠারো শতকের বাঙালি সমাজজীবনের ছবিও। মোগল সম্রাটের দরবারের গল্প বাদ যায়নি।

মন্দিরের সব থেকে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর পোড়ামাটির চিত্রফলক। ছবি : লেখিকা

রাজা বা জমিদার কিংবা অভিজাত শ্রেণির সদস্যদের শিকার করার দৃশ্য, রাজকীয় শোভাযাত্রার দৃশ্য রয়েছে। শোভাযাত্রাসমূহতে সজ্জিত হাতি, ঘোড়া, উট এবং অত্যন্ত সুন্দরভাবে সজ্জিত গরুর গাড়িও চোখে পড়ে। তাদের গায়ের পোশাক ও অস্ত্র মোগল আমলের বলেই অনুমেয় হয়। 

নদীর তীরের দৃশ্য কিংবা নদীতে আনন্দ উৎসবের দৃশ্য চিত্রিত রয়েছে। সরু নৌকায় করে কৃষ্ণের আনন্দভ্রমণ ছাড়াও তাঁর রাক্ষস পাতনা বধ, সারস গলার দানব বকাসুর বধ, সর্পদানব কালিয়াক এবং কেশি হত্যা। পঞ্চবটীর বনে রাম, সীতা এবং লক্ষ্মণের বনবাস, আবার রাবনের দাণ্ডকের বন থেকে সীতাকে অপহরণ, অশোক বনে সীতার বন্দিদশার জীবনযাপনসহ আরও পৌরাণিক কাহিনিচিত্র বর্ণিত হয়েছে এসব পোড়ামাটির ফলকে। ১৭৫২ সালের কিছু আগে নির্মিত এসব চিত্রফলক কয়েক শ বছর ধরে প্রকৃতির সব আঘাত সহ্য করে টিকে রয়েছে। 
স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসে, এই মন্দির কবে নির্মাণ হয়েছিল? কে নির্মাণ করলেন কেনই-বা নির্মাণ করলেন? 

মন্দিরের উত্তর দিকে ভিত্তিবেদির শিলালিপি আছে। প্রখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া এটির শিলালিপি অনুবাদ করেছিলেন, যাতে বলা আছে, প্রাসাদতুল্য অতিরম্য সুরচিত নবরত্ন দেবালয়ের নির্মাণকার্য নৃপতি প্রাণনাথ আরম্ভ করেন। রুক্মিণীকান্তের (শ্রীকৃষ্ণের) তুষ্টির জন্য ও পিতার সংকল্প সিদ্ধির নিমিত্ত ১৬৭৪ শাকে (১৭৫২ খ্রি.) নৃপতি রামনাথ কান্তের নিজনগরে (কান্তনগরে) কান্তের (শ্রীকৃষ্ণের) উদ্দেশ্যে এই মন্দির উৎসর্গ করেন।

ভিত্তিফলক অনুসারে, দিনাজপুরের প্রখ্যাত জমিদার মহারাজা প্রাণনাথ রায় ১৭০৪ সালে এই মন্দিরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। নিজের জীবনের শেষ দিনগুলোতে মহারাজা প্রাণনাথ রায় মন্দিরের অসমাপ্ত কাজ পূর্ণ করার দায়িত্ব দেন নিজের পোয্যপুত্র মহারাজ রামনাথ রায়কে। মহারাজ রামনাথ রায় ১৭২২ সালে আবার নতুনরূপে মন্দিরের কাজ শুরু করেন। ১৭৫২ সালে মূল মন্দিরের কাজ সমাপ্ত হয়। 

এই মন্দিরকে ঘিরে কিংবন্তির কমতি নেই। নির্মাণসামগ্রী, নির্মাণশৈলী, নির্মাণের কারণ নিয়েও রয়েছে নানা কিংবদন্তি ও নানা মত।

গঙ্গারামপুর অর্থাৎ বর্তমান দিনাজপুরের কাছাকাছি বাননগর নামের এক জায়গায় বিশাল এক প্রাচীরের ধ্বংসাবশেষ থেকে প্রাপ্ত নির্মাণ উপকরণ দিয়েই এই মন্দিরের নির্মাণকাজ করা হয়। আবার এটাও জানা যায় যে এই মন্দিরের নির্মাণকাজের জন্য ব্যবহৃত পাথর আনা হয়েছিল হিমালয়, বিহারের রাজমহল পাহাড় এবং আসামের পার্বত্য অঞ্চল থেকে। তবে এই মন্দির নির্মাণে পাথরের পাশাপাশি ইট, বালু, পোড়ামাটির টেরাকোটার সংমিশ্রণ যে হয়েছে, তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই।

মন্দিরের উত্তর দিকে ভিত্তিবেদির শিলালিপি আছে। ছবি : লেখিকা

একবার সম্রাট আওরঙ্গজেবের দরবারে রাজা প্রাণনাথকে জোরপূর্বক জমিদারি অধিকার করার অভিযোগে দায়ী করে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়। ফেরার পথে বৃন্দাবনের ধারে যমুনার জলে স্নানকালে তিনি কালো পাথরের একটি কৃষ্ণমূর্তি পান। সে রাতেই তিনি স্বপ্নে দেখেন, নৌকায় করে নিজ রাজ্যে ফেরার পথে যেখানে নৌকা আপনা-আপনি থেমে যাবে সেখানেই একটি মন্দির গড়ে এই মূর্তি স্থাপন করতে হবে। পরবর্তী সময়ে তিনি এখানে এই মন্দিরটি স্থাপন করেন ১৭০৪ সালে, যা মূলত কান্তজীউ মন্দিরের সূচনা ছিল এবং পরবর্তী সময়ে তার শেষ ইচ্ছায় নির্মিত নবরত্ন মন্দিরে সেই মূর্তিটি স্থানান্তরিত করা হয়। 

বিখ্যাত ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক ফ্রান্সিস বুকানন হ্যামিল্টন এই মন্দিরের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে বলেছিলেন, সমগ্র বাংলা জুড়ে এত সুন্দর মন্দির আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। ১৮৭১ সালে ভারত উপমহাদেশ ভ্রমণে এসে বিখ্যাত ব্রিটিশ ফটোগ্রাফার জন হেনরি র্যাভেনশ কান্তজীউ মন্দিরের কিছু ছবি তোলেন, যা বর্তমানে ব্রিটিশ লাইব্ররিতে সংরক্ষিত আছে। 

কান্তনগর মন্দির চত্বরে রাসমেলা হয় মাসব্যাপী। রাসলীলা হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের লীলার মধ্যে জনপ্রিয় এক লীলা। নির্মাণকালীন অর্থাৎ ১৭৫২ সাল থেকে নিয়মিতভাবে প্রতিবছরই রাসমেলার আয়োজন করা হয় এই মন্দিরে। পৌরাণিক ইতিহাস বলে, শ্রীকৃষ্ণ তাঁর গোপীদের নিয়ে কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথির রাতে বৃন্দাবনের রাস উৎসবে মেতে উঠতেন। তাই শ্রীকৃষ্ণের জন্য নির্মিত এই মন্দিরের জন্মলগ্ন থেকেই রাসমেলা হয়ে আসছে। রাসমেলাও এই মন্দিরের মতোই ঐতিহ্যবাহী। 

১৯৬০ সালে সরকারের প্রত্নতত্ব বিভাগ এই মন্দিরকে প্রাচীন কীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে। প্রাণনাথ রায়ের আনা কৃষ্ণমূর্তিটি কিন্তু এখন আর নেই। এক রাসযাত্রার সময় মূর্তিটি চুরি হয়ে যায় কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে হারিয়ে যায়। প্রায় ১৫ হাজারের মতো টেরাকোটার ফলকসমৃদ্ধ এই মন্দির বাংলাদেশের একটি অনন্য স্থাপত্য। এটির সংরক্ষণ ও স্বকীয়তা বজায় রাখা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। 

দিনাজপুর শহর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার উত্তরে কাহারোল উপজেলা সদর। সদর থেকে সাত আট কিলোমিটার দক্ষিণ এ সুন্দরপুর ইউনিয়নের এর অবস্থান। যদিও-বা এই মন্দির শ্যামগড় এলাকায়, তবু কান্তনগর মন্দিরের কারণেই এই স্থানের নতুন নামকরণ করা হয় কান্তনগর। তাই এই মন্দিরকে অনেকে কান্তনগরের মন্দিরও বলে থাকে। নানা নামেই এই মন্দিরকে অভিহিত করা হয়। শ্রীকৃষ্ণের জন্য নির্মিত মন্দির সে অর্থে কান্তজীউ কিংবা কান্তজীর মন্দিরও বলা হয়। তিনতলাবিশিষ্ট এই মন্দিরের নয়টি চূড়া বা রত্ন ছিল, কেননা এই মন্দিরের স্থাপত্যশৈলীর ধরন ছিল নবরত্ন স্থাপত্যধারায়। কেউ কেউ একে নবরত্ন মন্দিরও বলেও অভিহিত করে। 

কান্তনগর মন্দির ছাড়াও আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য ও প্রত্নস্থল রয়েছে দিনাজপুর জেলায়। লোকচক্ষুর অন্তরালে রয়েছে দিনাজপুরের সুপ্রাচীন ইতিহাস। সেতাবগঞ্জ উপজেলার সতিমন ডাঙ্গির কথা সাধারণ পর্যটকরা জানে না বললেই চলে। সেখানে একটি বিরল বুদ্ধমূর্তি রাখা রয়েছে। সিতাকোট বৌদ্ধবিহারের বয়স পঞ্চম শতক, যেটি পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহারের থেকেও পুরানো। দিনাজপুরের পার্বতীপুর একটি সমৃদ্ধ শহর, সম্প্রতি সেখানে আবিষ্কার হয়েছে আরও একটি বৌদ্ধবিহার। পার্বতীপুরের গুপ্তযুগের দেওল গ্রামে অবশিষ্ট রয়েছে মাত্র তিনটি পাথর। সেগুলোও ঠিকমতো সংরক্ষণ করা নেই। ঘোড়াঘাট মাটির দুর্গ প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। এখনি এগুলো সংরক্ষণ করা না গেলে অতীত ইতিহাস মুছে যাবে চিরতরে। শহরের ৩/৪ জায়গায় অযত্নে ফেলে রাখা ঢোপ কলগুলোও সংরক্ষণ করা প্রয়োজন।

সহায়ক গ্রন্থ 
বাংলাদেশের প্রত্নকীর্তি : আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া 
দিনাজপুরের ইতিহাস : সৈয়দ মোশাররফ হোসেন

Link copied!