আধুনিক ক্রিকেট বিপণনের জন্য হলেও নায়ক-মহানায়কদের খোঁজে। বাংলাদেশ-নিউজিল্যান্ড সিরিজ শুরুর আগে সেই নায়ক একজনই। সমকালীন ক্রিকেটে তিনি এক নম্বর অলরাউন্ডার। একই সঙ্গে দেশের ক্রিকেট উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীকও তিনি। ক্রিকেট বিশ্বে আধুনিক বাংলাদেশের বিচ্ছুরণ মানে তিনি। এ মাসেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচ টি-টোয়েন্টি সিরিজ সেরা হয়ে বিশ্ববাসীকে আরও একবার দেখালেন। তাহলে আগামী মাসে মিরপুরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আরও একটা ‘সাকিব আল হাসান শো’ দেখবেন ক্রিকেটানুরাগীরা!
খেলাটির নাম ক্রিকেট। তাই দেখবেন বলা যাচ্ছে না। বলতে হচ্ছে দেখতে পারেন। আর দেখার সম্ভাবনা পরিমাপের জন্য কিছু সূচক দরকার। ক্রিকেটে যাকে বলে স্কোরশিট বা পরিসংখ্যান। সৌভাগ্যক্রমে পৃথিবীতে এখনো স্কোরশিট বলে একটা জিনিস আছে। আর সেটা ডিজিটাল বিশ্বের বাইরে নয়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাকিব কী করেছেন, সেটা বাংলাদেশে পা রাখার আগেই নিউজিল্যান্ডের ক্রিকেটারদের জানা হয়ে গেছে। কেন তিনি ম্যান অব দ্য সিরিজ, সেটা এখন ইতিহাস। তবে সেই ইতিহাসের অনুষঙ্গকে বাদ দিয়ে নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ নিয়ে পরিকল্পনা করছে, তা ভাবারও কোনো কারণ নেই।
অভিজ্ঞতায় সাকিবের কাছাকাছিও নেই নিউজিল্যান্ডের এই দলের কোনো ক্রিকেটার। সাকিব আল হাসান এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলেছেন ৮৪টি। আর গোটা নিউজিল্যান্ড দলের সব ক্রিকেটার মিলিয়ে খেলেছেন তার চেয়েও কম ম্যাচ! তাহলে যদি বলা হয় লড়াইটা হবে সাকিব বনাম নিউজল্যান্ড, সেটাও বাড়াবাড়ি হবে না। আর সেই লড়াই শুরুর আগে এগিয়ে সাকিব।
তবে যারা সেনসিবল, ইন্টেলিজেন্ট, তারা শান্ত মনে অন্য হিসাবও করছেন। কারণ, দলটার নাম নিউজিল্যান্ড। এই দলে কোনো তারকা হয়তো নেই। নেই কোনো অভিজ্ঞ ক্রিকেটার। কিন্তু যদি তারা টিম হিসেবে জ্বলে ওঠেন, তা হলে বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বাংলাদেশকে। তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার আর মস্তিষ্কজাত উদ্ভাবনী শক্তির মিশেলে কিছু করে দেখানোর ক্ষমতা কিউইদের আছে। অতীতে তার অনেক উদাহরণ আছে।
আবার এই নিউজিল্যান্ডের সৌজন্যে বিশ্ববাসীকে ‘বাংলা ওয়াশ’ শব্দটা শুনিয়েছিল এ দেশের ক্রিকেটাররা। সেটাও ইতিহাস। আর সেই ইতিহাসটা জানা। কিন্তু এবার টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে আসা নিউজিল্যান্ড সত্যি বাংলাদেশের কাছে অজানা। কেন উইলিয়ামসন-রস টেলর-ট্রেন্ট বোল্ট-টিম সাউদির মতো বড় কোনো নাম নেই। যারা আছেন তাদের চেনার জন্য আপনাকে গুগলে সার্চ দিতে হবে। অথবা কোনো ক্রিকেট সাইটে যেতে হবে। তা ছাড়া এই করোনাকালে ঢাকায় পৌঁছে তারা আছেন হোটেল রুমে নিভৃতবাসে। দিন দুয়েক পরে নেটে নামবেন তারা। সেখানে তাদের অনুশীলন দেখার সুযোগ গণমাধ্যম পাবে কি না, নিশ্চিত নয়।
তবে নিউজিল্যান্ড নিশ্চিত, ঢাকায় তাদের জিততে হলে দুটো বিষয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। এক, উইকেট। দুই, বাংলাদেশের স্পিন। বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া সিরিজের ভিডিও নিশ্চয়ই তারা দেখেছেন। তাই এই সিরিজের জন্য প্রেসক্রিপশন একটা হাতে নিয়েই তারা ঢাকায় পা রেখেছেন। আর বাংলাদেশের কিউই বধের প্রেসক্রিপশন পড়তে খুব বড় ক্রিকেট স্ট্র্যাটেজিস্ট হওয়ার দরকার নেই। স্লো উইকেটে স্পিন অ্যাটাক। সঙ্গে মোস্তাফিজের স্লো মিডিয়াম বোলিং দিয়ে নিউজিল্যান্ড ব্যাটিং লাইনকে আটকে দাও। অন দ্য রাইজ খুব ভালো ব্যাট করেন নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা। তাই তারা যাতে উইকেটে তাণ্ডব চালাতে না পারেন, তার জন্য সাকিব-মেহেদী মিরাজ তো আছেন। সঙ্গে ডট মাস্টার মোস্তাফিজ। অস্ট্রেলিয়া সিরিজের মতো যদি তারা বল করতে পারেন, তাহলে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং লাইন খেই হারাতে বাধ্য।
বাংলাদেশ-অস্ট্রেলিয়া পাঁচ ম্যাচ সিরিজে দুই দলের দশ ইনিংসে সর্বোচ্চ রান ১৩১! আর সেটা করেছিল বাংলাদেশ প্রথম ম্যাচে। বাকি স্কোরগুলো লেখার কোনো দরকার পড়ে না। তবে একটা স্কোর অবশ্য লিখতেই হচ্ছে শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়া অলআউট হয়ে যায় ৬২ রানে! কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই উইকেটের চরিত্র রাতারাতি পাল্টে যাবে বা পাল্টে দেওয়া হবে, সেটা ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু ও রকম স্কোরই যদি দেখতে হয় এই সিরিজেও তাহলে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের কনসেপ্টটা নিয়ে নতুন করে গবেষণা শুরু হবে। ক্রিকেটের ছোট এই ফরম্যাটে বড় স্কোর দেখতে চান দর্শকরা। টি-টোয়েন্টি ম্যাচের আদর্শ চিত্রনাট্যে একটাই সংলাপ: ‘রান, রান আর রান।’ মানুষ রান দেখতে চান। বাউন্ডারি, ওভার বাউন্ডারি যদি না দেখা যায়, তাহলে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট তার আবেদন হারাবে।
তা ছাড়া উইকেটে যদি রান তোলা কঠিন হয়ে যায়, তাহলে প্রশ্নবিদ্ধ হবে মিরপুরের উইকেট। অনামী এই নিউজিল্যান্ড দলও প্রশ্নটা তুলতে পারে। হোম অ্যাডভান্টেজ সবাই নেয়। বাংলাদেশও নেবে। সেই অধিকার তাদের আছে। তবে সেটা নেওয়ার জন্য টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের রং-মসলাটা যেন পানসে না হয়ে যায়।
লেখক: সিনিয়র জার্নালিস্ট ও কলাম লেখক








































