• ঢাকা
  • বুধবার, ২৬ জুন, ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১,

এত কিছুর পরও মানুষ কেন ঢাকা ছাড়ে?


অঞ্জন আচার্য
প্রকাশিত: জুন ২৮, ২০২১, ০২:০১ পিএম
এত কিছুর পরও মানুষ কেন ঢাকা ছাড়ে?

ঘোষণা এলো, অমুক দিন থেকে সারা দেশ ‘শাটডাউন’। নতুন এই শব্দটির সঙ্গে পরিচিত নয় কেউ। তাই পুরোনো একটি শব্দ দিয়ে চেনানো হলো সাধারণ মানুষকে। সারা দেশে ‘কারফিউ’ জারি করা হচ্ছে। নামবে সেনাবাহিনী। অমনি বদলে গেল দৃশ্যপট। শুরু হয়ে গেল রাজধানীর ছাড়ার হিড়িক।

আগে থেকেই ঢাকাকে সুরক্ষিত রাখার একটি ঠুকনো প্রয়াস দেখা যায়। ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোকে করে দেওয়া হয় লকডাউন। বন্ধ রাখা হয় দূরপাল্লার বাস, ট্রেন, লঞ্চ। এখন তবে ঢাকা ছাড়ার উপায়? ফলে কেউ পায়ে হেঁটে, কেউবা রিকশায় পার হয় ঢাকার সীমানা। মোড় পার হয়েই আবার তারা চড়েন প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, অটোরিকশাসহ বিভিন্ন ছোট যানবাহনে। অনেকে উঠে পড়েন ট্রাক ও পিকআপের পেছনে। এর ফলে মহাসড়কে দেখা দেয় তীব্র যানজট। অধিকাংশ মানুষই বাড়ির পথ ধরেন। কেউ কেউ রাজধানীতে ডাক্তার দেখাতে আসেন, কেউবা ব্যবসার কাজে এসে বাড়ি ফেরেন।

পত্রিকায় প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায়, পোষা বেড়ালটাকে কোলে নিয়ে এক নারী রাজধানী ছাড়ছেন। কারণ, তার অবর্তমানে কে দেখভাল করবেন এই নিরীহ প্রাণীটিকে? তার মানে এই ছোট প্রাণীটির জীবনও নিরাপদ নয় অভিভাবকহীন। 
এখন কথা হলো, যে ইস্যুতে সরকার ‘শাটডাউনের’ ঘোষণা দিল, তার ফল কী দাঁড়াল? সংক্রমণ রোধ করে করোনাভাইরাসের প্রকোপ হ্রাস করা? সে আর হলো কোথায়? ঈদুল ফিতরের সময় দেখা গেছে, ফেরিঘাটে মানুষ কীভাবে পার হয়েছে? আরিচা বা শিমুলিয়া কোথাও তিল ধারণের মতো ঠাঁই ছিল না। দেশে করোনা নামে ভয়াবহ ছোঁয়াচে একটা ভাইরাস আছে, তা মনেই হয়নি।

বিধিনিষেধ, কঠোর বিধিনিষেধ, লকডাউন, কঠোর লকডাউন, ‘সর্বাত্মক’ লকডাউন, ‘স্থানীয়’ লকডাউন, যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এখন কোনো কিছুতেই আর কিছু আসে যায় না কারো। করোনা নিয়ে সাধারণ মানুষ এখন চূড়ান্ত উদাসীন। আর এই উদাসীনতা দেখা যায় নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্তদের মধ্যে বেশি। তাদের একটাই কথা, “করোনা বড়লোকের অসুখ”।

কেন এই ছুটে চলা? কেন এই রাজধানী ছাড়ার জন্য তোড়জোড়? দুদিনের ছুটি মিললেই মানুষ ঢাকা ছাড়ে। সেখানে লকডাউনের নামে সাত দিন, গুরুত্ব বিশেষ ১৪ দিন বা আরও বেশি ছুটি মিলছে মানুষের। ঈদুল আজহার আগে এমন দীর্ঘ ছুটি মিলবে, তার কারও কল্পনাতেও ছিল না।

পৃথিবীর কোনো দেশেই কোনো কিছু উপলক্ষে একটি মাত্র শহর থেকে বিভিন্ন শহরে যায় না। বরং কোনো উপলক্ষকে কেন্দ্র করে এক শহরে সমাগত হয়। যেমন হজ পালন করতে মক্কা নগরে সৌদির বিভিন্ন অঞ্চল থেকে তো বটেই, বিভিন্ন দেশ থেকে জড়ো হয় মানুষ। বাংলাদেশে চিত্রটি ঠিক এর উল্টো। প্রতি বছর ঈদ এলেই সেই একই চিত্র দেখতে পাই আমরা। শত কষ্ট সহ্য করেও মানুষ ঢাকা ছেড়ে বিভিন্ন শহরে তাদের নিজেদের বাড়িতে চলে যায়।

এবারের চিত্রটি আরও ভয়াবহ। করোনা সংক্রমণ ঝুঁকির মধ্যেও জীবনের মায়া ত্যাগ করে যেভাবে প্রাণপণ বাজি রেখে মরিয়া হয়ে মানুষ বাড়িতে গেল কিংবা এখনো যাচ্ছে, তাতে করে কী বোঝা গেল? বোঝা গেল, এই ঢাকা শহরে তারা কেউ থাকতে চায় না। নিতান্ত রুটিরুজির তাগিদে তাদের ঢাকায় থাকা। আজ যদি দেশের ৬৪টি জেলা স্বয়ংসম্পূর্ণ থাকত, সেখানে রোজগারের পথ থাকত, তাহলে অধিকাংশ মানুষই ঢাকামুখী হতো না। টাকার অঙ্ক কম হলেও নিজ জেলাতেই থাকত।

রোজগার ছাড়া ঢাকাতে কেউ ঘুরতে আসে না। “ঢাকা শহর আইসা আমার আশা ফুরাইছে” বলার দিন বহু বছর আগেই ফুরিয়ে গেছে। বসবাস অযোগ্য এই শহরে কে স্বেচ্ছায় থাকতে চায়? বাজি ধরে বলতে পারি, ঢাকায় অস্থায়ী বসবাস করা ৯৯ শতাংশ মানুষ ঢাকায় থাকতে চায় না। না-হলে একটু ফুরসত পেলেই কেন ঢাকা থেকে পালিয়ে বাঁচা তাদের? শত কষ্টকেও কষ্ট না-মনে করে কেন হাসিমুখে ঈদের সময় ঢাকা ছাড়ে মানুষ? আর কেনই-বা ম্লান মুখে ঢাকায় ফেরে তারা? কেন মনে মনে ভাবে, আবার সেই অসহ্য নগরে দুঃসহ জীবনযাপন করতে আসা!

আসলে ঈদের দুই-তিন ঢাকার যে ফাঁকা ফাঁকা চিত্র দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে এটিই এই শহরের আসল চিত্র। এর কমও নয়, বেশিও নয়। তাই সংক্রমণ রোধে এ ভঙ্গুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তার ফলাফল যে শূন্য হতে যাচ্ছে, সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সামনে যে ভয়াবহ দিন আসছে, তা অনেকটা নিশ্চিত। 

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

Link copied!