নির্বাচন ঘিরে আলোচনায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১০, ২০২৬, ০৫:৪৬ পিএম
নির্বাচন ঘিরে আলোচনায় জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন প্রান্তিক অবস্থানে থাকা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন। ঢাকার বিভিন্ন পোস্টার আর বিলবোর্ডে সাদা পোশাক ও দাড়িওয়ালা এই নেতার ছবি এখন বেশ দৃশ্যমান, যেখানে বৃহস্পতিবারের জাতীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থী নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে ৬৭ বছর বয়সী এই চিকিৎসক এক সময়ের অপরিচিত মুখ থেকে প্রধানমন্ত্রী পদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।

দীর্ঘদিন ইসলামপন্থি রাজনীতির পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকা শফিকুর রহমান এবার জাতীয় রাজনীতির মূল মঞ্চে উঠে এসেছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোট এবারের নির্বাচনে তাদের সাবেক জোটসঙ্গী ও বর্তমান ফ্রন্টরানার বিএনপির জন্য কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি করতে পারে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটি ২০২৪ সালে জেন জি নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট। প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এ দেশে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৯১ শতাংশ। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হলেও সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিও বিদ্যমান।

সাম্প্রতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা এবং ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অবস্থানের জন্য সমালোচিত জামায়াতে ইসলামী এবার তাদের ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ফলাফলের সম্ভাবনা তৈরি করেছে। এ পরিস্থিতি মধ্যপন্থি ও সংখ্যালঘুদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

শেখ হাসিনার শাসনামলে জামায়াতের ওপর কঠোর দমননীতি চালানো হয়েছিল—শীর্ষ নেতাদের কারাবন্দি করা, কয়েকজনকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া এবং দলটিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। শফিকুর রহমানও ২০২২ সালে নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্যদের সহায়তার অভিযোগে প্রায় ১৫ মাস কারাভোগ করেন।

২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন আসে। শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করার পর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জামায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। পরের বছর আদালতের রায়ে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার হলে দলটি প্রকাশ্যে রাজনীতিতে ফিরে আসে।

এরপর সংগঠনটি দ্রুত নতুনভাবে সক্রিয় হয়। দাতব্য ও ত্রাণ কার্যক্রমে শফিকুর রহমানের নিয়মিত উপস্থিতি তাকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে। গত ডিসেম্বরে তিনি রয়টার্সকে বলেন, বহু বছর ধরে তাদের কণ্ঠ দমিয়ে রাখা হয়েছিল, এখন আবার কথা বলার সুযোগ এসেছে।

১৯৫৮ সালে মৌলভীবাজারে জন্ম নেওয়া শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু বামপন্থি ছাত্র সংগঠন দিয়ে। পরে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দেন এবং ১৯৮৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীতে যুক্ত হন। তিনি ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও সফল হননি। ২০২০ সালে তিনি দলের আমির নির্বাচিত হন।

তার স্ত্রী আমিনা বেগম ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য ছিলেন। স্বামী-স্ত্রী দুজনই চিকিৎসক; তাদের তিন ছেলে-মেয়েও চিকিৎসা পেশায় যুক্ত। শফিকুর রহমান সিলেট অঞ্চলের একটি পারিবারিক মালিকানাধীন হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।

বহু ঢাকাবাসীর মতে, শেখ হাসিনার সময়ে তিনি খুব পরিচিত নাম ছিলেন না, যা তাকে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি নেতা তারেক রহমান থেকে আলাদা করে। উল্লেখ্য, দুইজনের ‘রহমান’ পদবি হলেও তাদের মধ্যে কোনো আত্মীয়তা নেই।

জামায়াত নেতারা তাকে বিনয়ী, সৎ ও শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে।

বিশ্লেষকদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশে যে নেতৃত্বশূন্যতা তৈরি হয়েছিল, তা কাজে লাগিয়ে শফিকুর রহমান দ্রুত দেশের বিভিন্ন স্থানে সফর করে আলোচনায় আসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শফি মোহাম্মদ মোস্তফা বলেন, সে সময়ে তারেক রহমান বিদেশে থাকায় শফিকুর রহমান রাজনৈতিক স্পেস পেয়েছেন।

নির্বাচনী প্রচারে তিনি জামায়াতকে ইসলামী মূল্যবোধনির্ভর, নৈতিক ও দুর্নীতিবিরোধী বিকল্প শক্তি হিসেবে তুলে ধরছেন। গত ডিসেম্বরে দলটি জেন জি-সমর্থিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টির সঙ্গে জোট গঠন করে, যার ফলে তরুণ ও তুলনামূলক কম রক্ষণশীল ভোটারদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা কিছুটা বাড়ে।

রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ‘গেম অব থ্রোনস’–অনুপ্রাণিত পোস্টার দেখা যাচ্ছে, যেখানে তার ছবির পাশে লেখা—“দাদু আসছে”। অনেকে তাকে জামায়াতের তুলনামূলক নরমপন্থি মুখ হিসেবে দেখছেন। তিনি সুশাসন, ন্যায়বিচার ও দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কথা বলছেন এবং সব ধর্মের মানুষের প্রতি সমান আচরণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন।

তবে নারীদের ভূমিকা নিয়ে তার মন্তব্য বিতর্ক তৈরি করেছে। জামায়াত এবার কোনো নারী প্রার্থী দেয়নি। তিনি বলেছেন, নারীদের দিনে পাঁচ ঘণ্টার বেশি কাজ করা উচিত নয়, যাতে তারা পরিবারে বেশি সময় দিতে পারেন। সম্প্রতি তার নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের বিরুদ্ধে আপত্তিকর মন্তব্য ছড়ালে সমালোচনা হয়—যা জামায়াত হ্যাকিং বলে দাবি করেছে।

নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, জামায়াত যুক্তিসঙ্গত ও নমনীয় নীতিতে বিশ্বাসী, এবং ইসলামী মূল্যবোধ সমগ্র মানবজাতির জন্যই প্রযোজ্য।

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!