গণভোটে ‍‍`হ্যাঁ‍‍` বা ‍‍`না‍‍` জিতলে কী পরিবর্তন আসবে?


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৯, ২০২৬, ১১:৫২ পিএম
গণভোটে ‍‍`হ্যাঁ‍‍` বা ‍‍`না‍‍` জিতলে কী পরিবর্তন আসবে?

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হবে একটি গণভোট। ভোটাররা সেদিন দুটি ভোট দেবেন—একটি নিজ এলাকার সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য, অন্যটি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে বা বিপক্ষে। এই দ্বিতীয় ভোটটিই গণভোট, যেখানে ভোটারদের 'হ্যাঁ' অথবা 'না' বলতে হবে।

তবে অনেক ভোটার এখনো স্পষ্টভাবে জানেন না গণভোটের মূল বিষয় কী এবং ফলাফল অনুযায়ী কী ঘটবে। বিশেষত 'হ্যাঁ' বা 'না' জয়ী হলে দেশের শাসনব্যবস্থায় কী পরিবর্তন আসবে—এ নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেকের মনে।

গণভোটের মূল বিষয়

জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব থাকলেও গণভোটে প্রাধান্য পাচ্ছে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৩০টি প্রস্তাব। তবে ব্যালটে এসব বিস্তারিত থাকবে না। পরিবর্তে চারটি প্রশ্নের একটি সেট থাকবে, যার পক্ষে বা বিপক্ষে একটি মাত্র 'হ্যাঁ' বা 'না' দিতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ জানান, সংবিধান সংস্কার সংক্রান্ত ৩০টি প্রস্তাবকে চারটি প্রশ্নে সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে। শেষ প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

ব্যালটের চারটি প্রশ্ন

প্রথম প্রশ্নে বলা হয়েছে, নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ায় গঠিত হবে কিনা। দ্বিতীয় প্রশ্নে রয়েছে, আগামী সংসদ দ্বিকক্ষবিশিষ্ট হবে কিনা এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে কিনা। সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন লাগবে কিনা তাও এই প্রশ্নে অন্তর্ভুক্ত।

তৃতীয় প্রশ্নে বলা হয়েছে, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণসহ ৩০টি প্রস্তাব বাস্তবায়নে নির্বাচিত দলগুলো বাধ্য থাকবে কিনা। চতুর্থ ও শেষ প্রশ্নে জানতে চাওয়া হয়েছে, জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়িত হবে কিনা।

'হ্যাঁ' জয়ী হলে যা ঘটবে

গণভোটে 'হ্যাঁ' জিতলে সংবিধান সংস্কারসহ রাষ্ট্র পরিচালনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ টানা দুই মেয়াদ বা ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট এবং উচ্চকক্ষ গঠিত হবে আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্য নিয়ে। সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরে আসবে।

সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা হবে। ডেপুটি স্পিকার বাধ্যতামূলকভাবে বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন। বাজেট ও আস্থা বিল ছাড়া অন্য বিষয়ে সংসদ সদস্যরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সংসদের উভয় কক্ষের অনুমোদন লাগবে।

রাষ্ট্রপতি উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের গোপন ব্যালটে নির্বাচিত হবেন। তিনি নিজ ক্ষমতায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্রে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন হবে।

বিচার বিভাগের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ আপিল বিভাগ থেকে হবে এবং বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ হবে প্রধান বিচারপতির চাহিদার ভিত্তিতে। হাইকোর্ট বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব থাকবে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের হাতে। প্রতিটি বিভাগে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করা হবে এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টে ন্যস্ত করা হবে।

প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, 'হ্যাঁ' জিতলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে, যা ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন সম্পন্ন হবে।

 'না' জয়ী হলে যা ঘটবে

গণভোটে 'না' জিতলে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে না এবং বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো অপরিবর্তিত থাকবে। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে না এবং সংবিধান সংস্কারও হবে না। সংসদ বিদ্যমান কাঠামোতেই চলবে, অর্থাৎ একক কক্ষ থাকবে।

প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের কোনো সীমা থাকবে না। সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে জাতীয় সংসদে কোনো বিষয়ে ভোট দিতে পারবেন না। সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়বে না, ৫০-তেই থাকবে। রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষার নামে মৃত্যুদণ্ড মওকুফসহ বর্তমান ক্ষমতাগুলো আগের মতোই প্রয়োগ করতে পারবেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরবে না এবং অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষিত সংস্কার বাস্তবায়নের কোনো সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর। সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা হ্রাস পাবে, সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে।

জাতীয় বিভাগের আরো খবর

Link copied!