• ঢাকা
  • সোমবার, ২৪ জুন, ২০২৪, ১০ আষাঢ় ১৪৩১,

নিম্নবর্গ কথা বলে মরে গিয়ে: গায়ত্রী স্পিভাক


দেওয়ান জামিলুর রহমান
প্রকাশিত: আগস্ট ১, ২০২১, ০৩:৪০ পিএম
নিম্নবর্গ কথা বলে মরে গিয়ে: গায়ত্রী স্পিভাক

আশির দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে শিশুদের পড়াচ্ছেন গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক। কলকাতা থেকে ট্রেন ও মোটরসাইকেলে করে প্রায় এক দিনের পথ পাড়ি দিয়ে চারটি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা করেন তিনি। এখানে মুখস্থবিদ্যায় পারদর্শী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের ক্রিটিক্যাল থিংকিং বা গঠনমূলক চিন্তার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

স্পিভাক মূলত মার্কসবাদ, নারীবাদ, ডিকনস্ট্রাকশন আর পোস্ট কলোনিয়াল চিন্তাধারা নিয়ে কাজ করেন। ১৯৪২ সালে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬১ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর ১৯৭৬ সালে জাক দেরিদার ‘অব গ্রামাটোলজি’ বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন তিনি। এই বইটি সে সময় ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়। 

১৯৮৮ সালে ‘ক্যান সাবঅল্টার্ন স্পিক’ প্রবন্ধে সতীদাহ ও এ নিয়ে পারিবারিক বিভিন্ন কুসংস্কার বিশ্লেষণ করেন স্পিভাক। ১৯৮৩ সালে প্রথমবার একটি সম্মেলনে এই প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তিনি। এরপর এটি পোস্টকলোনিয়াল স্টাডির অন্যতম পাঠ্য হয়ে ওঠে। ‘সাবঅল্টার্ন’ তথা নিপীড়িত বা শোষিত শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন আন্তোনিও গ্রামশি। তবে এই আলোচনাকে নতুন করে সামনে নিয়ে আসে স্পিভাকের প্রবন্ধটি।

পশ্চিমবঙ্গ সফরের পরপরই স্পিভাকের এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়। সেখানে তখন বিধানসভা নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছিল। এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাবিষয়ক আলোচনা ছাড়াও কীভাবে শিক্ষার্থী ও তাদের শিক্ষকেরা রাষ্ট্রের নাগরিক বা অংশীদার হিসেবে নিজের অবস্থানকে উপলব্ধি করছেন, সে সম্পর্কেও জানতে চাওয়া হয়।

কিছুদিন পরই পশ্চিমবঙ্গে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) ও তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটযুদ্ধ শুরু হয়। ৩০ এপ্রিল বিপুল ভোটে বিজেপিকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল।

(দ্য ন্যাশন পত্রিকা থেকে সাক্ষাৎকারটি সংবাদ প্রকাশের জন্য অনুবাদ করা হয়েছে।)


ফ্রান্সিস ওয়েড: আমরা শুনেছি যে আপনি পশ্চিমবঙ্গের একটি প্রত্যন্ত গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষার্থীদের ‘গণতন্ত্র চর্চা’ শেখাচ্ছেন। ব্যাপারটা আসলে কী?

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক: গ্রামে আমি মূলত হাজার বছর ধরে অধিকারবঞ্চিত মানুষদের চিন্তাশক্তি বাড়াতে আর গঠনমূলক চিন্তা করতে শেখাই। আমি ক্লাসে ‘গণতন্ত্র’ নিয়ে বক্তৃতা দিই না; বরং ইংরেজি, বাংলা, পাটিগণিত, ভূগোলসহ পশ্চিমবঙ্গের পাঠ্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পড়াই। তবে আমি তাদের শেখাতে চেষ্টা করি - শুধু শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারাটাই স্মার্টনেস না। আপনি যদি ফানোঁর মতবাদ চিন্তা করেন, তাহলে দেখতে পাবেন যে সমস্যাটা নেতৃত্ব আর নেতা হওয়ার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। তিনি, আমি কিংবা গ্রামশি যে বিষয়টা নিয়ে কথা বলছি তা হলো—লিডারশিপ কমপ্লেক্স বা নেতৃত্বসংক্রান্ত জটিলতা। এটা কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রেও আছে, যা অত্যন্ত ক্ষতিকর ও অগণতান্ত্রিক একটা চর্চা।

গ্রামে দেখা যায়, নেতারা সব সময়ই শোষকের ভূমিকায় থাকে—এটি সেখানকার রাজনীতিরই অংশ। কিন্তু ক্লাসে ভাষণ না দিয়ে কোমলমতি বাচ্চাদের সুন্দর করে এসব বিষয় বোঝাতে হয়। তাদের শেখাতে হবে, সব সময় শুধু জয়ের জন্যই লড়তে হয় না। ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া আর সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারাটাই সফলতা নয়। তাই আমি অনেক সময় তাদের প্রশ্নের উত্তর জানলেও, জবাব দিই না। আমার সঙ্গে থাকলে তারা বুঝতে পারে যে সব সময় নেতা হতে চাওয়াটা বোকামি।

ওয়েড: যেহেতু আপনি ব্রাহ্মণ এবং শিক্ষার্থীদের অনেকেই প্রান্তিক সম্প্রদায়ের সেহেতু আপনাদের মধ্যে একটা দূরত্ব কিন্তু থেকেই যায়। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা এই শিক্ষাপদ্ধতিকে কীভাবে নিচ্ছে?

স্পিভাক: আমাদের পূর্বপুরুষরা যে ‘ঐতিহাসিক পাপ’ করেছে আমি সেটাই মোচন করার চেষ্টা করছি। একসময় আমরা ব্রাহ্মণরা এই লোকদের স্পর্শ করতাম না; তাদের সঙ্গে জল খেতাম না। এমনকি প্রচণ্ড গরমেও নিচু জাতের এটি শিশু আমাদের পুকুর থেকে পানি খেতে পারত না। যদিও এসব রীতি এখন অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে, তবে চিন্তাধারাটা বদলায়নি। আপনি যদি জাতিবৈষম্যকে গুরুত্ব দিয়ে দেখেন, তাহলে বুঝতে পারবেন, অনেকেই মনে করেন এটা ঐশ্বরিক রীতি। তারা মনে করে এটাই স্বাভাবিক যেহেতু উঁচু জাত ঈশ্বরের সৃষ্টি, নিচু জাতের মানুষ নয়। তবে ক্লাসে গণতন্ত্র নিয়ে আমরা এমনভাবে আলোচনা করি যে এটা উঁচু শ্রেণির সৃষ্ট মতবাদ নয় বরং সর্বজনীন বিষয়।

ওয়েড: অনেকে মনে করেন মোদির শাসনামলে সহিংসতা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আগের চেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে আপনার শিশু শিক্ষার্থীরা সহিংসতা ও রাজনীতির সম্পর্কটা ঠিক কীভাবে শিখছে?

স্পিভাক: আমি ক্লাসে সাধারণত সাম্প্রতিক ঘটনা নিয়ে আলোচনা শুরু করি। ভারতের নির্বাচনের সময় ক্লাসের সবচেয়ে কমবয়সী বাচ্চাদের বয়স ছিল দশ বছর। অর্থাৎ আর আট বছর পর ওরা ভোট দেবে। আমি তাদের জিজ্ঞেস করলাম, নির্বাচন বলতে তারা কী বোঝে? ক্লাসের সবচেয়ে বুদ্ধিমান শিক্ষার্থী, ৯ বছর বয়সী রাম ভান্ডারী লোহার সবার আগে ইংরেজিতে উত্তর দিল। আমি সবসময় তাদের সাথে ইংরেজিতে কথা বলি, তাই তারাও একই ভাষাই বলে। রাম বললো “নির্বাচন একটা খেলা” আমি বললাম, “ঠিক আছে। ভাল বলেছো। কিন্তু এটা কি ধরণের খেলা? ব্যাপারটা আমাকে বাংলায় বুঝিয়ে বলো তো।” আমি তার সঙ্গে খুব ধীরে কথা বললাম। সে আমাকে বাংলা ভাষায় বললো: “মারামারি”। দেখতেই পাচ্ছেন সহিংসতা কোন পর্যায়ে পৌঁছে গেছে, যে বাচ্চাদেরও এসব জানা অসম্ভব কিছু নয়। এই শিশুরা যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের মতো বেশিদিন ছোট থাকে না।

তবে এটা কিন্তু আমাদের শিক্ষার সাফল্যেরও উদাহরণ। বাচ্চাটি এমন বিষয়ে কথা পারছে যার প্রভাব অনেক বিস্তৃত, যা যুক্তরাষ্ট্রে বড়রাই কেবল বুঝতে পারি। গণতান্ত্রিক নির্বাচনী ব্যবস্থায় বিশ্বের সবখানেই রাজনৈতিক সহিংসতা দেখা যায়। রাজনৈতিক নেতা ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা যে নির্মম সত্যকে লুকিয়ে রাখে, এই ছোট্ট ছেলেটি তা প্রকাশ করে দিল। এটি কিন্তু শুধু গ্রামেই সীমাবদ্ধ নয়। এটা তো ৬ জানুয়ারী (ক্যাপিটাল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলা) যুক্তরাষ্ট্রেও দেখা গেছে। আমরা এসব শিশুদের কাছ নির্বাচনী সহিংসতার চেয়েও অনেক বড় কিছু জানতে পারছি।

গায়ত্রী চক্রবর্তী স্পিভাক

ওয়েড: ২০০৪ সালে আপনার লেখা “রাইটিং রংস” – প্রবন্ধের মাধ্যমে আপনি বুকার টি. ওয়াশিংটন ও ডব্লিউ.ই.বি. ডুর দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিতর্কের মাঝে নিজেকে স্থান দিয়েছেন। সমাজের নিপীড়িত গোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি কিভাবে সম্ভব তা নিয়ে এক শতাব্দী আগে এই বিতর্কের শুরু। এখানে আপনি লিখেছেন: “আমি ওয়াশিংটনের চেয়ে ডু বোইসের সঙ্গেই বেশি একমত। সাময়িক ভালো থাকা নিশ্চিত করার চেয়ে গঠনমূলক বুদ্ধির বিকাশটা বেশি জরুরি” আপনি আপনার এই অবস্থানটা একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?

স্পিভাক: আমি অনেক বছর চীনে কাজ করেছি। দু'বছর আগে আমি ইউনান প্রদেশের মহিলাদের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তারা তাদের এলাকার উন্নয়ন সম্পর্কে আমাকে যাই বলছিল সবই ছিল নিজেদের আয় উপার্জন বৃদ্ধি সম্পর্কিত। “রাইটিং রংস” প্রবন্ধে আমি বলতে চেষ্টা করছি, ডু বোইসের ভাষায় শুধুমাত্র আয় উপার্জনের জন্য শিক্ষার ওপর জোর দেওয়ার চেয়ে জনগণের বুদ্ধিবিকাশের ওপর জোর দেওয়া বেশি প্রয়োজন। তারা যেন সিদ্ধান্ত নিতে পারে তাদের নিজের আয় বাড়ানো প্রয়োজন নাকি ভালো থাকাটা বেশি প্রয়োজন। “রাইটিং রংস” –প্রবন্ধে কিছু জায়গায় আমি যুক্তরাষ্ট্রেরও সমালোচনা করছি, যেমন: “যুক্তরাষ্ট্রে অনেক আইনপ্রণেতা আছেন যাদের কার্যকলাপ বঞ্চিতদের মধ্যেও শোষণ করার ইচ্ছাকে জাগ্রত করে।” যেমনটা পাওলো ফ্রেইর বলেছেন, নিপীড়িতরাও কখনো কখনো নিপীড়ক হতে চায়। তিনি কিন্তু এখানে নিপীড়িতদের প্রতি পক্ষপাত করছেন না। আমি এটাই বলার চেষ্টা করেছি। বুকার টি ওয়াশিংটন ও ডু বোইসের যুক্তির মধ্যে এটাই পার্থক্য।

ওয়েড: একই প্রবন্ধে আপনি স্থানীয় প্রশাসনের কাছ থেকে গ্রামের জন্য একটি নলকূপ পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে বলেছেন - এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার সহায়তাও আপনি নিতে চান না। আপনি বলছেন যে “আমরা চাই আমাদের শিশুরা প্রশাসনের এই নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে জানুক।” এই ব্যাপারটি তাদের কী শেখায়?

স্পিভাক: আসলে প্রবন্ধের এই অংশে আমি নিজেই ভুল ছিলাম। আবেগপ্রবণ ছিলাম। এখন আমি যে এলাকায় কাজ করি সেখানকার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। এই প্রশ্নের উত্তরের জন্যেও ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। রোজা লুক্সেমবার্গের সামাজিক গণতন্ত্রের সংজ্ঞার মতো, এখানে আমাদের রাষ্ট্রকে দোষারোপ না করে তার সঠিকভাবে ব্যবহার ও পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। প্রবন্ধতে রাষ্ট্রকে নির্মম বলাটা আসলে আমারই ভুল ছিল। আমি সাধারণত এ ধরণের ভুল থেকে শিক্ষা নিতেই পছন্দ করি। এখানে, আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল যেটা হয়, আমরা রাষ্ট্রকে ‘শত্রু’ বানিয়ে ফেলি। লুক্সেমবার্গ ও গ্রামশি দুজন রাষ্ট্রকে ওষুধ ও বিষ দুইভাবেই দেখেছেন। আপনাকে এর সঠিক ব্যবহার শিখতে হবে যেন এটি কোনভাবে বিষে পরিণত না হয়। তবে এর জন্য আপনাকে শাস্তিও পেতে হতে পারে। সচেতন নাগরিক হলে আপনাকে অনেক ঝুঁকিই মোকাবেলা করতে হবে।

তবে আমি বাচ্চাদের এটা বোঝাতে চেষ্টা করি যে রাষ্ট্র এখনো আমাদের মত উঁচু শ্রেণীর কথায় কাজ করে। অথচ রাষ্ট্রের উচিত সবার জন্য কাজ করা, কারণ সবাই এই রাষ্ট্রের নাগরিক। আমি তাদের আরও বলি: “আমি কিন্তু তোমাদের শত্রু। হয়তো আমি ভালো মানুষ, আমার বাবা-মাও ভালো মানুষ ছিলেন, কিন্তু এই দুই প্রজন্ম হাজার বছরের অত্যাচারকে মুছে ফেলতে পারে না। একসময় আমাকে ছাড়াই তোমাদের চলতে হবে।” এভাবেই রাষ্ট্রকে পরিচালনা করতে হয়। কাজটা সহজ নয়; তবে আমি তাদের নিয়মিত এসব মনে করিয়ে দেই। আমার যে দুজন সুপারভাইজার আছেন তাদেরও আমি বলি, আপনারা রাষ্ট্রকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করুন।

ওয়েড: ভারতবর্ষে বা অন্য কোথাও কি শিক্ষাব্যবস্থা দরিদ্র শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি নিয়ে উদাসীন বলে আপনি মনে করেন? আপনার কি মনে হয় রাষ্ট্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়েই এই শ্রেণিবৈষম্য বজায় রাখছে?

স্পিভাক: সব সমাজেই ক্ষমতাবানরা ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেন। তবে শিক্ষার মানের এই দশার জন্য কাউকে দোষারোপ করতে পারছি না। এর পেছনে প্রতিটি সমাজেই নির্দিষ্ট কিছু কারণ রয়েছে, তবে এমনটা মনে হতেই পারে যে রাষ্ট্র একটি জনগোষ্ঠীকে যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে বা নিজের বিচারবুদ্ধিকে কাজে লাগানোর সুযোগ দিচ্ছে না। ফলে তারা নিজের ভোটের গুরুত্ব বুঝতে পারছে না। তারা বুঝতে পারছে না যে, রাষ্ট্র আমাদের শত্রু নয়, বরং নিজেদের সৃষ্ট একটি সমাজব্যবস্থা। রাষ্ট্রের আসল মালিক যে তারা নিজেরাই - এই ব্যাপারটি তাদের কাছে গোপন করা হচ্ছে। তাদের বুঝাতে হবে যে, রাষ্ট্র এমন এক অবকাঠামো যা সবসময় পরিছন্ন রাখা উচিত। যাতে এটি ঠিকভাবে কাজ করতে পারে।

ব্যাপারটা অনেকটা এরকম: ভোটারদের মধ্যে যারা একটু উঁচু শ্রেণী তারাই সবচেয়ে বেশি সুবিধা ভোগ করে। তারপর তারাই এই আপ্যায়নে খুশী হয়ে অত্যাচারী নেতাদের নির্বাচিত করে। আমি আমার স্কুলের সুপারভাইজারদের প্রায়ই বলি, সরকার তাদের ফুটবল খেলার জন্য বৃত্তি দেয় অথচ স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ দেয় না। হাজার বছর ধরে উচ্চবর্ণের মানুষেরা শোষিতদের অধিকারগুলো এমনভাবে দমন করেছে যে, এখন আর তারা স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারে না। কিভাবে গঠনমূলক চিন্তা করতে হয়, কিভাবে সমস্যার সমাধান বের করা যায় - এসব বিষয়ে তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে। আমি বাচ্চাদের এসবই শেখানোর চেষ্টা করি।

ওয়েড: রাজ্য সরকার কি তাহলে গ্রামবাসীদের উপেক্ষা করছে? কারণ এ ধরনের অবহেলা তো সরকারের অনুপস্থিতির মতোই দেখায়।

স্পিভাক: রাজ্য মোটেও তাদের অবহেলা করে না। বরং রাষ্ট্র তাদের ব্যবহার করে। দেখুন, গ্রামগুলোয় লোকজন যেন বিজেপিকে ভোট না দেয় সেজন্য তৃণমূল কংগ্রেস গ্রামের সবাইকে করোনার টিকা দিয়েছে। অথচ কলকাতায় টিকা কর্মসূচির অগ্রগতি তেমন ভালো না। গ্রামের সবচেয়ে দরিদ্র লোকটিও টিকা পেয়েছে। দরিদ্ররা নাগরিক অধিকার ভোগ করতে পারে না কিন্তু তাদের সবাই ব্যবহার করে।

ওয়েড: বছরখানেক ধরেই আপনি মিয়ানমারে সহিংসতার প্রতিবাদ করছেন। দেশটিতে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে চলমান আন্দোলন প্রতিনিয়ত অস্থিরতার বাড়াচ্ছে। এ বিষয়ে আপনার চিন্তা কী?

স্পিভাক: মিয়ানমারে এই ঘটনাটা হল রোজা লুক্সেমবার্গের ‘স্পন্টেনিটি’ মতবাদের মত। এটি আসলে মানসিক স্বতঃস্ফূর্ততা নয়; অত্যাচার যখন মাত্রা ছাড়িয়ে যায় তখন এ ধরনের সামাজিক অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়। দেশটিতে এত সহিংসতা, এত শোষণ, এত অত্যাচার হয়েছে যে একটি প্রজন্ম এর মাঝেই বড় হয়েছে। এবং এরা মৃত্যুভয় কী জিনিস তা ভুলে গেছে। সত্যিই এরা মৃত্যুকে ভয় পায় না। এটা খুব অদ্ভুত ব্যাপার। একজন মনোবিজ্ঞানী হিসেবে ফানোঁ বলেন, মানুষ যখন সব ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তখন তারা সহিংসতার চরমে পৌঁছায়। অর্থাৎ সমাজে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যখন কেউ আর মৃত্যুকে ভয় পায় না। আর তখন শোষিতদের মৃত্যুই কথা বলে। একারণেই তিউনিসিয়ার মোহাম্মদের আত্মহত্যা আরব বসন্ত ডেকে এনেছিল, যুক্তরাষ্ট্রেও জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু নতুন বিপ্লবের সৃষ্টি করেছে।

তবে এ পরিস্থিতি খুব বেশি দীর্ঘায়িত হবে না। ডেভিড রোডিগার খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলেছেন। এই সময়াটাকে তিনি “বিপ্লবের সময়” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি মনে করেন, বিপ্লবের সময়ে মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় না, যেমন আমরা মিয়ানমারে দেখছি। এই বিপ্লব তীব্র তবে এর স্থায়ীত্ব কম। কেবল আবেগ দিয়ে টেকসই রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় না। গ্রামশি যেমন বলেন, স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে চাইলে আবেগ পরিত্যাগ করতে হবে। মিয়ানমারের এই পরিস্থিতি বেশিদিন স্থায়ী হবে না। তিউনিসিয়া যেমন পারেনি, তেমনি মিশরও তাদের বিপ্লব টিকিয়ে রাখতে পারেনি। কিন্তু তাই বলে আমাদের শুধু চেয়ে চেয়ে বিপ্লব দেখলে হবে না, এর পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করতে হবে।
 

কথাপ্রকাশ বিভাগের আরো খবর

Link copied!