• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, ৮ ফাল্গুন ১৪৩০, ১১ শা’বান ১৪৪৫

ই-কমার্সই ভবিষ্যৎ, যেতে হবে বহুদূর : মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: জানুয়ারি ১৪, ২০২৪, ০৭:০৯ পিএম
ই-কমার্সই ভবিষ্যৎ, যেতে হবে বহুদূর :  মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন
দেশের প্রথম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান মুনসীজি ডট কমের প্রতিষ্ঠাতা মুনসী মো. গিয়াস উদ্দিন। ছবি-সংবাদ প্রকাশ

করোনা ভাইরাস অতিমারি যখন সারা বিশ্বের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে নাজেহাল করে তুলেছিল, তখন আশির্বাদ হিসেবে এসেছে ই-কমার্স। দুঃসময়ে গ্রাহকের দোরগোড়ায় পণ্য পৌঁছে দেওয়া, ঘরে বসে অনলাইনের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হোটেল বুকিংয়ের মাধ্যমসহ নানা সেবার জনপ্রিয়তাও বৃদ্ধি পায় তড়িৎ গতিতে। ই-কমার্স দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা, বিশ্বস্ত ই-কমার্সে গ্রাহকদের করণীয়সহ নানা বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে কথা বলেছেন দেশের প্রথমে ই-কমার্স ওয়েবসাইট মুন্সিজি ডট কমের উদ্যোক্তা ও ওবিও লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সংবাদ প্রকাশের বিজনেস রিপোর্টার মো. মির হোসেন সরকার।

সংবাদ প্রকাশ : দেশের প্রথম ই-কমার্স ওয়েবসাইট মুন্সিজি ডট কম। গত ১০ জানুয়ারি এই ই-কমার্সের ২ যুগ পূর্তি হয়েছে, এর শুরুর গল্পটা কেমন ছিল?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : ছোটবেলা থেকে বিজ্ঞান সাময়ীকি এবং কম্পিউটার জগতের গ্রাহক ছিলাম। বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে আগ্রহ ছিল। বাবার অনাগ্রহের কারণে বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে পারিনি। তখন আমি বনানীতে একটি রিয়েল এষ্টেট প্রতিষ্ঠানে চাকুরি করি। ১৯৯৭ এ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন থেকে মাষ্টার্স করে চাকুরিতে ঢুকেছি। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশের পত্রিকাগুলোতে ই-কমার্স নিয়ে অল্প-বিস্তর লেখালেখি শুরু হয়। ই-কমার্স যে গোটা দুনিয়া বদলে দিবে তা অনুধাবন করতে পারি। ভাবনাটা পেয়ে বসে আমাকে। ই-কমার্সের পোকা ঘুমাতে দেয় না। আমি নিজে একজন নন-টেক পারসন খুঁজতে থাকি এমন একটি প্রতিষ্ঠান যারা আমাকে একটি ই- কমার্স ওয়েবসাইট বানিয়ে দিতে পারবে। অবশেষে একদিন করোনা ইনফরমেশন টেকনোলজি-র সন্ধান পাই। যারা আমাকে একটি ই-কমার্স ওয়েব সাইট বানিয়ে দিতে পারবে বলে জানায়। ৯৯ তে ডোমেইন কেনা হয়। ২০০০ সালের জানুয়ারির ১০ তারিখে দেশের প্রথম বিটুসি ই-কমার্স সাইট মুন্সিজি ডট কম (www.munshigi.com) চালু হয়। ১৪ জানুয়ারি একটি দৈনিক পত্রিকায় ৪ কলাম জুড়ে নিউজ করে। সম্ভবত জানুয়ারির ২৪ তারিখে জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি সংবাদ সম্মেলন করে আমরা কাজ শুরুর ঘোষণা দেই। দেশের প্রায় সবগুলো ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া গুরুত্বের সঙ্গে নিউজটি প্রকাশ ও প্রচার করে।

সংবাদ প্রকাশ : শুরুর চ্যালেঞ্জটা কেমন ছিল?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : শুরুতে খুবই চ্যালেঞ্জের ছিল। মিডিয়া কাভারেজের মধু-চন্দ্রিমা পার হবার পর কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে থাকি। মানুষজন বোঝেই না-ই-কমার্স কী জিনিস। মরণচাঁদের মিষ্টির ছবি তুলতে গিয়ে কয়েকবার ব্যর্থ হয়েছি। একটা জনপ্রিয় সিল্ক এর ব্রান্ডের মালিকের সঙ্গে ১ ঘণ্টা কথা বলার পর-উনি জিজ্ঞেস করেছিলেন আপনার দোকানটা কোথায়? একটা বিজ্ঞাপন পেতে ৬ মাস দৌড়াতে হয়েছে। ই-কমার্সের পণ্য ডেলিভারির জন্য কোনো কুরিয়ার সার্ভিস ছিল না তখন। নিজে ডেলিভারি বয়ের কাজ করেছি। পেমেন্ট গেটওয়ে ছিল না। ক্যাশ অন ডেলিভারি মোডে বিজনেস করতে হয়েছে। আস্তে আস্তে অর্ডার বাড়তে থাকে। ফকিরাপুলের ছোট অফিস থেকে শাহীন কলেজ মার্কেটে বড় পরিসরে অফিস শিফট করি। ২০০২ এ বিবিসি বাংলা রেডিও আমার সাক্ষাৎকার প্রচার করে। ২০০৫ এ জাপান সরকারের একটি স্কলারশীপ পাই- ই-কমার্স নিয়ে পড়াশোনা করার জন্য। ২০০৬-এ দেশে ফিরে আসি।

সংবাদ প্রকাশ : কী কী পণ্য ছিল মুন্সিজিতে?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন :  মুন্সিজি ডট কমে ফুলের তোড়া, মিষ্টি, কেক, অলংকার, হাজীর বিরিয়ানী, ফল এবং গ্রোসারী আইটেম ছিল।

সংবাদ প্রকাশ : নামকরণটা এমন কেন? তখন তো প্রাসঙ্গিক ও অর্থবহ প্রায় সব নামই নিবন্ধনের জন্য খালি ছিল?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : নাম নিয়ে আমরা অনেক ভেবেছি। অনেক ভাবার পর অবশেষে করোনার শামীমুজ্জামান প্রস্তাব দিলেন Munshigi রাখতে। ভাবনাটা ছিল এমন প্রথম হবার সুবাদে মানুষ নামটা মনে রাখবে প্রাসঙ্গিক না হলেও। যুক্তিটা মনে ধরলো রাজি হয়ে গেলাম। আমার পারিবারিক টাইটেল মুনসী আর আমার নামের অদ্যাক্ষর জি মিলিয়ে নাম ঠিক করলাম মুন্সিজি।

সংবাদ প্রকাশ : শুরুতে প্রায় দেড় মাসে কোনো অর্ডার ছিল না। এই দেড় মাস পর যখন প্রথম অর্ডার আসে তখন আপনার প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : এক অনির্বচনীয় আনন্দে ভেসে গিয়েছিলাম। চালু করার প্রায় দেড় মাস পর প্রথম অর্ডার পাই একটা ফুলের তোড়া। আমার কাছে তখন মনে হয়েছে হ্যাঁ, আমি ভুল করিনি।

সংবাদ প্রকাশ : লাভের মুখ দেখেছেন নাকি লোকসান হয়েছে?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : প্রথম পেমেন্ট গেটওয়ে এসএসএল কমার্স চালু হয় ২০১০ এ। কিন্তু খুবই ধীর গতিতে বাড়ছিল এর বাজার। অর্ডার বাড়লেও তা মাসিক খরচ সংকুলানের মতো যথেষ্ট ছিলো না। প্রচুর লোকসান হয়েছে। আসলে তখন মার্কেট প্রস্তত ছিল না। আমরা সময়ের আগে শুরু করে দিয়েছিলাম। ২০১২ সালে সাইট টি বন্ধ করে দেই।

সংবাদ প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি বাংলাদেশে ই-কমার্সের ২ যুগ পূর্ণ হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। কিন্ত ডোমেইন হিষ্ট্রি বলছে মুন্সিজি ২০১৫ তে নিবন্ধিত হয়েছে। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলবেন?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : মুন্সিজি ডট কম প্রথমে কেনা হয় ১৯৯৯ সালে আমেরিকার নেটসল (networksolutions.com) থেকে। ২০১২ তে বিজনেস বন্ধ করে দেবার পর অসতর্কতা বশত ডোমেইনটি রিনিউ করতে পারিনি। ২ বছর তা জাপান এবং আমেরিকায় ২ জনের কাছে ছিল। ২০১৫-তে আবার আমরা তা নিবন্ধিত করার সুযোগ পাই। আপনি www.archive.org-এ সার্চ করলে এর সত্যতা পাবেন।

সংবাদ প্রকাশ : ই-কমার্সে মানুষ প্রচুর বিজনেস করছে বলে দেখতে পাই। কিন্তু আপনার লোকসান হলো কেন?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : প্রথমত বলতে গেলে আমার সময়ে বাজার প্রস্তুত ছিল না আগেই বলেছি। আর দ্বিতীয়ত তুফান অফারের নামে লসে মাল বিক্রির সর্পিল বুদ্ধি আমাকে চালিত করতে পারেনি। ইনভেষ্টমেন্টের অভাব ছিল তখন।

সংবাদ প্রকাশ : আবার কি মুন্সিজি চালু করতে চান?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : জ্বি ইচ্ছে আছে। হয়তো এ বছরই আবার চালু করবো।

সংবাদ প্রকাশ : ই-কমার্সের অগ্রপথিক হয়ে এ ফিল্ড থেকে ছিটকে গেলেন কেন? এটা কি কোন অভিমান?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : ছিটকে যাইনি তো। আমি তো পর্যটন নিয়ে কাজ করছি। তফাৎটা হলো আগে প্রডাক্ট নিয়ে কাজ করতাম, এখন করি সার্ভিস নিয়ে।

সংবাদ প্রকাশ : আপনার বর্তমান কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে কিছু বলবেন?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : বাংলাদেশের ট্যুরিষ্ট ষ্ট্যান্ডার্ড হোটেল/রিসোর্ট গুলোকে আমরা ইন্টারন্যাশনাল বুকিং প্ল্যাটফর্মগুলোতে (ওটিএ-তে) কানেক্ট করি। বুকিং ডট কম, এক্সপেডিয়া, এয়ারবিএনবি, সিট্রিপের মতো ওটিএর পাশাপাশি আমরা আমাদের নিজস্ব ওটিএ www.obeorooms.com এ ও হোটেলগুলোকে আপলোড করি। এর ফলে হোটেলগুলোর ভিজিবিলিটি বাড়ে। দেশি-বিদেশি বুকিং বৃদ্ধি পায়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়।

সংবাদ প্রকাশ : ই-কমার্স নিয়ে তরুণদের জন্য আপনার কোনো পরামর্শ আছে কি?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : ক্ষুধার্ত থাক। জানার কোনো শেষ নাই। ২৪ বছর আগের তুলনায় সময় অনেক বদলেছে। প্রযুক্তি অগ্রসর হয়েছে। অনেক কিছু সহজ হয়েছে। সেই সঙ্গে চ্যালেঞ্জ এবং প্রতিযোগিতাও কিন্ত বেড়েছে। আমরা সফল হইনি কিন্ত পথ দেখিয়েছি। আমাদের ব্যর্থতার ভিত্তির উপর দাড়িয়ে আজ এ সেক্টরে লাখো তরুণের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্রায় ৩ হাজার ই-কমার্স কোম্পানি আর লক্ষাধিক ফেসবুক পেজের বিজনেস দাঁড়িয়ে গেছে। ই-কমার্সই ভবিষ্যৎ। যেতে হবে বহুদূর। বাংলাদেশ খুব বেশি আগায়নি এ ক্ষেত্রে, কাজেই সুযোগ আছে ভালো কিছু করার।

সংবাদ প্রকাশ : দেশে ই-কমার্সের গতি বৃদ্ধির জন্য যদি দুটো জিনিসের নাম বলতে বলা হয় তাহলে কী বলবেন?

মুনশী মো. গিয়াস উদ্দিন : প্রয়োজন নীতি সহায়তা আর আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা।

কথাপ্রকাশ বিভাগের আরো খবর

Link copied!