• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১২ জুলাই, ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১, ৬ মুহররম ১৪৪৫

নাজমুল হুসাইন : আমার বোধিবৃক্ষ


শাহান সাহাবুদ্দিন
প্রকাশিত: আগস্ট ৩১, ২০২২, ০৪:১৫ পিএম
নাজমুল হুসাইন : আমার বোধিবৃক্ষ

দাদা, আজ আপনার জন্মদিন, এবং কী আশ্চর্য, এ দিনটিতে আমি আছি আপনার আমার শিকড় নরসিংদীর রায়পুরায়। আদিয়াবাদ থেকে পাড়াতলী কি খুব বেশি দূরের পথ? মোটেই না। আধা ঘণ্টার জার্নি। কথা ছিল আপনার গাঁয়ে আমি যাব আপনার সঙ্গেই, এ কারণে একা করে যেতে ইচ্ছে করে না, যদিও পাড়াতলী আমি গিয়েছিলাম দেড় যুগ আগে।

পাড়াতলী কি রত্নাগর্ভা? শামসুর রাহমান, খান আতা এবং আপনি নাজমুল হুসাইন—এ গাঁয়ের সন্তান। হ্যাঁ, রত্নাগর্ভাই বটে! এর মধ্যে প্রথমোক্ত কিংবদন্তির দুজনের একজন আপনার চাচা, অপরজন মামা। কী সাংঘাতিক ব্যাপার, এবং আপনি নিজেও নাজমুল হুসাইন! নাজমুল হুসাইন তো আঠারো কোটি মানুষের একজন, এবং দ্বিতীয়টি হবে না। দ্বিতীয়টি হওয়ার নয়, এটা কে না জানে!

এ দেশে বাক্‌শিল্পে কিংবদন্তির নাম নাজমুল হুসাইন। আজ তাঁর জন্মদিন। দাদার ভাষায় ভূমিষ্ঠ দিবস। আমাদের কালে এমন কেউ কি আছেন, যিনি এই মানুষটার ভরাট কণ্ঠ উপেক্ষা করে বেড়ে উঠেছেন? সম্ভবত নেই। জীবনের এতটা বছর পার করে, এমনকি এতটা কাল পরে এসেও মনে হয় এই কণ্ঠের বয়স বাড়েনি, তেমনই আছে; যেমন ছিলেন তিনি অপ্রতিরোধ্য মহান মুক্তিযুদ্ধে, যেমন ছিলেন আমাদের কৈশোরে! স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম বাক্‌শিল্পী ছিলেন তিনি। বাংলাদেশে রেডিওতে প্রথম চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন চালু করেন, এমনকি তিনিই বাংলাদেশের প্রথম রেডিও অনুষ্ঠান উপস্থাপক। একই সঙ্গে অভিনেতা, প্রযোজকও। বিপুল আলোচিত সিনেমা ‘রঙিন সুজন সখী’র অন্যতম প্রযোজক তিনি। স্বর্ণকণ্ঠের প্রিয়তম দাদা নাজমুল হুসাইন আমার কাছে একজন ড. দীনেশ চন্দ্র সেন বা বুদ্ধদেব বসু অথবা আহমদ ছফা! দীনেশবাবুর ঋণ তো আজীবন বয়ে বেড়িয়েছেন কবি জসীমউদ্‌দীন। যে জীবনানন্দ দাশ তাঁর মৃত্যুর পর আধুনিক বাংলা কবিতার আকাশে উজ্জ্বল নক্ষত্রপ্রতিম কবি, সেই তিনি তো তাঁর কালে, দেশপ্রিয় পার্কে ট্রাম দুর্ঘটনার আগে তাঁর জীবদ্দশায় ছিলেন ধূসর থেকে ধূসরতর আকাশ; সেই কালে এই ধূসর আকাশটাকে একজনই মূল্য দিয়েছিলেন, আগলে রাখার চেষ্টা করেছিলেন, তিনি বুদ্ধদেব বসু। তারও পরে মহাত্মা আহমদ ছফা একজনই। ছফা ভাইয়ের স্বপ্নের বীজতলার ফসল যেমন প্রবাদপ্রতিম জনপ্রিয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ থেকে শুরু করে পরিণত ফলবান বৃক্ষ এস.এম. সুলতান, শক্তিশালী অভিমানী কবি আবুল হাসান, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, তেমনি অগণিত যুবা, সাহিত্যসেবী, শিল্পী, ভাবুক এই মানুষটার ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছেন, অথবা তিনি আশ্রয় দিয়েছেন। আমার কাছে নাজমুল হুসাইন দাদা একজন আহমদ ছফা, একজন দীনেশবাবু বা একজন বুদ্ধদেব বসু। তাঁকে বটবৃক্ষ জ্ঞানে তাঁর ছায়ায় আছি, অথবা মনীষার আলোয় ঋদ্ধ হচ্ছি—এটা আমাকে আশাবাদী করে তুলেছে। তিনি জানেন একজন তরুণ অপরিণত শিল্পীকে কীভাবে স্বপ্ন দেখাতে হয়; দম নিয়ে তাঁর লড়াইটা কীভাবে চালিয়ে যাওয়ার দীক্ষা দিতে হয়।

মান্যবর নাজমুল হুসাইন দাদার সঙ্গে আমার একটা গভীর তাত্ত্বিক ও রুহানি যোগাযোগ আছে। অবশ্য এই যোগাযোগটা দাদা তাঁর অজান্তেই করে চলেন। কিন্তু ঘটনাটা ঘটে যায়। দাদা ও আমার মানসিক সম্পর্কটাকে বোঝানোর জন্য দুই জোড়া শিল্পী পুরুষ বা কবি পুরুষকে আমি এখানে টানব। তাঁর এক জোড়া হচ্ছেন আমাদের এশীয় আকাশের বাইরে, ইউরোপের আকাশের নিচে প্রবল প্রতাপ নিয়ে প্রথম জীবনে, পরের কালে ইউরোপের বাইরে গোটা দুনিয়ায় নিজেদের আলো নিয়ে ছড়িয়ে যাওয়া অসম বন্ধু-যুগল বায়রন ও শেলী, অন্য জোড়া আমাদের লাখো মানুষের প্রিয় মুখ, প্রবল প্রতাপশালী কণ্ঠস্বর ও আকার-আয়তন নিয়ে ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে এককালে বিচরণশীল বোহেমিয়ান যুগল কবি নির্মলেন্দু গুণ ও আবুল হাসান। মনে মনে নাজমুল দাদাকে আমি আমার মানসিক জায়গা জমিনে এভাবেই বসাই। বসিয়ে কখনো ঋষি, কখনো সাধক, কখনো শিল্পী, কখনো কবি, কখনোবা রফিক আজাদ, শক্তি চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের মতো মহৎ মাতাল ইত্যাদি হিসেবে নিজের ছায়া দেখে হালের জামানা ও নানামুখী কূটচরিত্রকে এক ধাক্কায় ফেলে দিই খাদে, তারপর আমি উঠে যাই, উঠে যেতেই থাকি মহাশূন্যে পরাক্রমশালী হয়ে। ওখানে আমার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামার শক্তি একমাত্র আমারই আছে। আমি সেখানে রাজাধিরাজ!

আমি তো কোথাও আমার বই পাঠাই না, আমার লেখার কথা বলতে যাই না; এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে পত্রিকায়ও খুব একটা লেখা পাঠাই না। এটা মহান আলস্যপনার জন্যও হতে পারে, হতে পারে কালের ধুলোয় সচেতনভাবেই রেখে যেতে চাই এই সব। প্রকৃত অর্থেই এসব লেখা হলে টিকে যাবে, নয়তো হারিয়ে যাবে, ধূসর থেকে ধূসরতর হবে আমার কবিতারানি, আমার গদ্য-যুবরাজ, এই আমার উপলব্ধি! অথচ কী কাণ্ড, আমার প্রিয়তম দাদা কিনা অখ্যাত এই যুবকের একাধিক কবিতা বাংলাদেশ বেতারের ‘সংসার গল্পে’ নিজের কণ্ঠে ধারণ করে তা এ দেশের লক্ষ শ্রোতার কাছে পৌঁছে দিয়ে আমাকে মহিমান্বিত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন, তা-ও দাদার উদ্যোগে; এখানে আমার হাত নেই। এই ফাঁকে আমি জীবনানন্দ দাশের ট্রাম লাইন রেখে, মায়াকোভস্কি ও ভ্যানগঘের রিভলভারের ট্রিগার রেখে বিপুল আলোর খোঁজে, মনীষার খোঁজে বেরিয়ে পড়ি পৃথিবীর বড় আকাশের নিচে। দূরে আলো আঁধারে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসেন দাদা, হাসতেই থাকেন! প্রেম ছাড়া তো শিল্প হয় না, এটা আমার জন্যই সম্ভবত অন্নদাশঙ্কর রায় বলে গেছেন। এই প্রেমটা আমার তৈরি হয়ে গেছে। লেখার টেবিলে বসলেই একজনের মুখ দেখি। তিনি প্রেম নিয়ে সমালোচনার বান নিয়ে আড়ালে বসে থাকেন। আমি লিখতে থাকি। তাঁর চোখ থেকে দ্যুতি ছড়াতে থাকে। হৃদয় জমিনে রোপিত জুঁই চামেলী হাসনাহেনা থেকে সুগন্ধ ছড়াতে থাকে। কপালের ভাঁজে দেখতে থাকি বোধিবৃক্ষ! তিনি কে? কে আবার, নাজমুল হুসাইন দাদা!

আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র অসংখ্য আবালকে নানাভাবে সম্মানিত করলেও বিরল প্রতিভার নিভৃতচারী ও প্রচারবিমুখ এ ব্যক্তিত্বের প্রতি বরাবরই ছিলেন উদাসীন (অবশ্য বড় পুরস্কার তিনি পেয়ে গেছেন তাঁর জীবদ্দশাতেই, তা হচ্ছে কোটি মানুষের ভালোবাসা)। নাকি অকপট স্পষ্টভাষী মহান এ ব্যক্তিত্বকে ধারণ করার ক্ষমতা রাষ্ট্র-নীতিনির্ধাকরা রাখেন না? তেল প্রদানের ব্যবসাটা নাজমুল হুসাইন জানেন না বলেই তাঁকে নিয়ে আমার গর্বের শেষ নেই। ভীষণ রকম ঠোঁটকাটা স্বভাবের জন্যও তিনি আমার কাছে নমস্য। দু-একটি বিষয় ছাড়া বিপুল বিস্ময় নিয়ে তাঁর দর্শন, যুক্তি ও প্রজ্ঞার সায়রে আমি ঝাঁপ দিতে যাই সাঁতারে আহামরি দখল না থাকা সত্ত্বেও!

আজ আমার এই প্রিয়তম মানুষটির জন্মদিন। শতায়ু হোন দাদা। কর্মযোগী হয়ে, মহান শিল্পী হয়েই বারবার জয়ী হোন নিজের জন্য, এ দেশ, দেশের মানুষের জন্য।

শুভ জন্মদিন, প্রাণের সখা!

Link copied!