শিক্ষা আইন ২০২৬-এর খসড়া প্রকাশ

নোট–গাইড ও কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কঠোর অবস্থান


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬, ০৮:৪৩ এএম
নোট–গাইড ও কোচিং বাণিজ্য বন্ধে কঠোর অবস্থান

বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য সামনে রেখে ‘শিক্ষা আইন ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ। গতকাল সোমবার প্রকাশিত এই খসড়ার ওপর আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের মতামত নেওয়া হবে। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে খসড়া দেখা যাবে এবং মতামত পাঠানো যাবে [email protected] ঠিকানায়।

খসড়া আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, জীবনব্যাপী ও সময়োপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিদ্যমান আইনের পরিপূরক ও সম্পূরক ধারাগুলো সমন্বয় করেই নতুন শিক্ষা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি জোরদার হয়।

খসড়া অনুযায়ী, প্রাক–প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পুরো ধাপেই বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের প্রস্তাব এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষা প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে এবং প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাক–প্রাথমিক স্তর চালু করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি মাধ্যমিক এবং একাদশ–দ্বাদশ শ্রেণি উচ্চমাধ্যমিক স্তর হিসেবে গণ্য হবে। সব শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক থাকবে এবং একে শিশুদের মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা খসড়ায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

দীর্ঘদিনের বিতর্কের কেন্দ্র নোট–গাইড ও কোচিং বাণিজ্য বন্ধে খসড়া আইনে নেওয়া হয়েছে কঠোর অবস্থান। প্রস্তাব করা হয়েছে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পাঠ্যবইয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রশ্ন–উত্তরধর্মী গাইড বই প্রকাশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। তবে সরকারি অনুমোদিত সহায়ক বই ব্যবহারের সুযোগ খোলা থাকবে, যাতে শিক্ষার্থীরা মানসম্মত সহায়ক পাঠ্য থেকে বঞ্চিত না হয়। কোচিং ও প্রাইভেট টিউশন নিয়ন্ত্রণে আলাদা বিধিমালা প্রণয়ন করা হবে এবং আইন কার্যকর হওয়ার পর তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে এসব বাণিজ্যিক কার্যক্রম ধীরে ধীরে স্থায়ীভাবে বন্ধ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় শিক্ষা নীতির আলোচনাতেও কোচিং ও নোট–গাইডের বিরুদ্ধেই এমন সুপারিশ উঠে এসেছিল।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে খসড়ায় জাতীয় শিক্ষা একাডেমি প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই একাডেমি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম বুঝে ক্লাসরুম পরিচালনা এবং শিক্ষকদের পেশাগত উন্নয়নে নীতিনির্ধারণী ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এন্ট্রি–লেভেলের শিক্ষক নিয়োগে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন ও নিবন্ধনের দায়িত্ব বর্তাবে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) ওপর, যাতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি ও অনিয়ম কমানো যায়।

খসড়ায় জাল সনদ ব্যবহার করে চাকরি নেয়ার মতো অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি ভুয়া সনদ দিয়ে চাকরি নিলে বা পদোন্নতি নিলে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা এবং প্রশাসনিক শাস্তি—উভয়ই দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগের কিছু খসড়া ও নীতিপত্রেও শিক্ষকতা পেশা থেকে অনৈতিক উপার্জন ও ভুয়া সনদকে শিক্ষাব্যবস্থার বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষার বিষয়ে খসড়ায় এসেছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক শাস্তি, মানসিক নির্যাতন, র‌্যাগিং, বুলিং ও সাইবার বুলিং সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইংরেজি মাধ্যম ও বিদেশি কারিকুলামে পরিচালিত স্কুলগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, বাংলা ভাষা ও দেশের নিজস্ব সংস্কৃতি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি নিজস্ব জাতিগত–সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত থাকে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিশুদের জন্য মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা চালুর কথা উল্লেখ করেছে খসড়া, আর কারিগরি শিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। ডিপ্লোমা প্রকৌশলীদের জন্য ক্রেডিট ওয়েভারের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষায় উঠার পথ আরও সহজ করার প্রস্তাবও রয়েছে এতে।

উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে খসড়া আইনের নবম অধ্যায়ে প্রস্তাব করা হয়েছে সব সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিন্ন গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করার। বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন ভিন্ন গ্রেডিং ব্যবস্থা থাকার কারণে শিক্ষার্থীরা চাকরি ও উচ্চশিক্ষায় আবেদনকালে বৈষম্যের মুখে পড়েন—এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অভিন্ন গ্রেডিংয়ের উদ্যোগও সেই প্রেক্ষাপট থেকেই এসেছে। নতুন আইনে এ ব্যবস্থা আইনি রূপ পেলে ফলাফলের তুলনামূলক মান নির্ধারণ ও নিয়োগ–বাছাইয়ে স্বচ্ছতা বাড়বে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন ২০২৬–এর খসড়ার ওপর শিক্ষা–বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ নাগরিকদের কাছ থেকে যে সব মতামত আসবে, তার মধ্যে যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত প্রস্তাবগুলো গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে। তাঁর প্রত্যাশা, আইনটি চূড়ান্তভাবে পাস ও বাস্তবায়িত হলে নোট–গাইড নির্ভরতা ও কোচিং বাণিজ্যের লাগাম টেনে শিক্ষাব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরবে, পাশাপাশি কাঠামোগত সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষা হবে আরও স্বচ্ছ, মানসম্মত ও ভবিষ্যতের উপযোগী।

শিক্ষা বিভাগের আরো খবর

Link copied!