• ঢাকা
  • বুধবার, ২৯ মে, ২০২৪, ১৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, ২০ জ্বিলকদ ১৪৪৫

জেল থেকে বেরিয়ে জানলেন বাবা-মাসহ আপন ২৫ জন মারা গেছেন


লালমনিরহাট প্রতিনিধি
প্রকাশিত: এপ্রিল ১৫, ২০২৪, ০৯:৫৭ পিএম
জেল থেকে বেরিয়ে জানলেন বাবা-মাসহ আপন ২৫ জন মারা গেছেন

জরিমানার টাকা পরিশোধ করতে না পারায় যাবজ্জীবন কারাভোগের পর গত বছরের ৪ ডিসেম্বর থেকে আরও তিন বছরের জন্য কারাভোগ করছিলেন রেখা খাতুন (৪৩)। পরে বেসরকারি কারা পরিদর্শক টিমের সদস্য কবি ও সমাজসেবী ফেরদৌসী বেগম বিউটির সহযোগিতায় জরিমানার একলাখ পরিশোধ করা হলে ঈদের একদিন আগে ৯ এপ্রিল ছাড়া পান রেখা খাতুন।

এর আগে রেখা খাতুনের জীবন-গল্প শুনে সমাজসেবী কবি ফেরদৌসী বেগম বিউটি, লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ উল্ল্যাহ ও পৌর মেয়র রেজাউল করিম মিলে জরিমানার টাকা পরিশোধ করেন।

এদিকে জেল থেকে বের হয়ে রেখা বেগম দেখেন তার বাবা-মা ও ভাই-বোনসহ ২৫জন আপনজন মারা গেছেন। স্বামী আবার বিয়ে করে নিরুদ্দেশ। এখন তার আর মাথা গোজার ঠাঁই নেই। এমন খবর শুনে জেল গেটের সামনেই কান্নায় ভেঙে পড়েন রেখা খাতুন।

রেখার বাবার বাড়ি লালমনিরহাট সদর উপজেলার বড়বাড়ী ইউনিয়নের কলাখাওয়া ঘাট এলাকায়। 
তার বাবা ফজলু রহমান মারা গেছেন ১৫ বছর আগে, আর মা নুরনাহার বেগম মারা গেছেন ১২ বছর আগে। নদী ভাঙনে অনেক আগেই হারিয়ে গেছে বসতভিটা। প্রায় বিশ বছর আগে স্বামী কোরবান আলীও অন্যত্র বিয়ে করে নিরুদ্দেশ। দিশেহারা রেখা অবশেষে আশ্রয় নিয়েছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার কবির মাহমুদ নামক গ্রামে ছোট বোন টুম্পা বেগমের বাড়িতে। ৮ বোন আর ৩ ভাইয়ের মধ্যে রেখা অষ্টম। তার দুই বোন ও এক ভাইও মারা গেছেন।

জানা যায়, একটি শিশু ধর্ষণ মামলায় রেখা খাতুন ২০০০ সালের ৫ নভেম্বর গ্রেপ্তার হয়ে লালমনিরহাট জেলা কারাগারে ছিলেন। ওই মামলায় তাকে ধর্ষণে সহযোগিতা করার অপরাধে আসামি করা হয়েছিল। মামলায় আরও দুইজন আসামি ছিল। ২০০৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মামলায় রেখা খাতুনসহ অন্য আসামিদের যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন আদালত। একই সঙ্গে প্রত্যেকের এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। অনাদায়ে আরও তিন বছরের কারাদণ্ড দেন আদালত। রেখা খাতুনের কারাভোগের মেয়াদ শেষ হয় গেল বছর ৩ ডিসেম্বর। কিন্তু তিনি জরিমানার টাকা পরিশোধ করতে না পারায় তিন বছরের জন্য আরও কারা ভোগ করছিলেন তিনি।

তবে রেখা খাতুনের দাবি, শিশু ধর্ষণের ঘটনাটি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। তার স্বামীর বড় ভাইয়ের কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তাকে এই মামলায় আসামি করা হয়। এই মামলার অপর দুই আসামিকেও তিনি চিনতেন না। পরে জানতে পারেন তার স্বামীর সঙ্গে তাদের পরিচয় ছিল। সে ২০০০ সালের ৫ নভেম্বর কারাগারে প্রবেশ করেন। আর কারাগার থেকে বের হন ঈদের আগের দিন ২০২৪ সালের ১০ এপ্রিল। জরিমানার টাকা পরিশোধ করার ব্যবস্থা না হলে আরও ৩ বছর কারাভোগ করতে হতো তাকে।

রেখা খাতুন জানান, তার জন্য কেউ কোনোদিন আদালতে জামিনের জন্য আবেদন করেননি। তার পক্ষে কোনো আইনজীবি আদালতে কথা বলেননি। তিনি কারাগারে যাওয়ার তিন বছর পর তার স্বামী কোরবান আলী অন্য একজনকে বিয়ে করে নিরুদ্দেশ হয়েছেন। তিনি কোথায় আছেন তাও তিনি জানেন না। এখন সে কোথায় থাকবেন, কীভাবে বাঁচবেন এমন দুশ্চিন্তাই করছেন সারাক্ষণ।

১৩-১৪ বছর বয়সে রেখা খাতুনের সঙ্গে বিয়ে হয় ৩৪ বছর বয়সী কোরবান আলীর। দারিদ্রতার কারণে রেখা খাতুনের বাবা-মা এ বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন। স্বামীর বয়স বেশি হওয়ায় রেখা ২-৩ বছর স্বামীর বাড়িতে যাননি। ১৯৯৮ সাল থেকে স্বামীর সঙ্গে থাকতে শুরু করেন। রেখা ও তার স্বামী কোরবান আলী লালমনিরহাট শহরের খোচাবাড়ী এলাকায় একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতেন। তার স্বামী পেশায় একজন দিনমজুর ছিলেন।

রেখার ছোট বোন টুম্পা বেগম বলেন, “সামর্থ না থাকায় রেখা আপার জামিন করাতে পারিনি। বাবা-মা, ভাই-বোনসহ আপনজনদের মৃত্যুর খবরও তাকে দেওয়া হয়নি। তার স্বামী ছিল দুষ্টু প্রকৃতির। রেখা আপা জীবনে কোনোদিনই সুখ পাননি।”

কবি ও সমাজকর্মী ফেরদৌসী বেগম বিউটি বলেন, “আমি রেখা খাতুনের জীবন-গল্প পুরোটাই শুনে তাকে কারাগার থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করেছি। তাকে কীভাবে পুনর্বাসন করা যায় সেই বিষয়ে পরিকল্পনা করছি।”

লালমনিরহাট জেলা কারাগারের জেল সুপার ওমর ফারুক জানান, কারাগারে রেখা খাতুনকে হস্তশিল্পের ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তিনি হস্তশিল্পের কাজ করে উপার্জন করতে পারবেন। রেখা লালমনরহাট কারাগারে ২৩ বছর ৪ মাস ৫দিন ছিলেন। জরিমানার টাকা পরিশোধ করায় ঈদের আগের দিন রেখাকে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।

লালমনিরহাট-৩ (লালমনিরহাট সদর) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাড. মতিয়ার রহমান বলেন, তিনি রেখা খাতুনের বিষয়ে বিস্তারিত জেনেছেন। তিনি জেলা প্রশাসকের সঙ্গে কথা বলে তার পুনর্বাসনের জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে জানান।

Link copied!