• ঢাকা
  • রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪, ১ বৈশাখ ১৪৩১, ৪ শাওয়াল ১৪৪৫

এই শীতে ঘুরে আসুন নয়নাভিরাম নিঝুম দ্বীপে


সংবাদ প্রকাশ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৭, ২০২৩, ০২:০৮ পিএম
এই শীতে ঘুরে আসুন নয়নাভিরাম নিঝুম দ্বীপে
নিঝুম দ্বীপে হরিণের অবাধ বিচরণ

মেঘনা নদীর অববাহিকায় প্রাণ-প্রকৃতির নৈসর্গ নিয়ে গড়ে ওঠে ‘নিঝুম দ্বীপ’। নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় অবস্থিত ছোট্ট এই দ্বীপটি। মায়াবী হরিণ, বিশাল কেওড়া বন আর নরম বালুর মাঝে অপরূপ সৈকত রয়েছে এ দ্বীপে। বঙ্গোপসাগরের কোলে বালুচরবেষ্টিত ছোট্ট সবুজ ভূখণ্ডটি মোহনীয় টানে টেনে নেয় পর্যটকদের। দ্বীপটি হাতিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে দুই কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। চর ওসমান, বাউল্লারচর, কামলার চর ও মৌলভির চর—এই চার চর নিয়ে পুরো নিঝুম দ্বীপ। 

১৯৪০ সালে প্রায় ১৪ হাজার ৫০ একরের দ্বীপটি সাগরের মাঝখানে জেগে ওঠে। তারও প্রায় এক দশক পড়ে গড়ে ওঠে জনবসতি। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল দ্বীপটিকে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করে। 

অগণিত শ্বাসমূলে ভরা কেওড়াগাছ দেয়াল বানিয়েছে দ্বীপের চারদিকে। পূর্বাকাশে জ্বলজ্বলে সূর্যের আলো সাগরের ছোট ছোট ঢেউগুলোয় ঝলমল করছে, সৈকতের কেওড়া বন পেরিয়ে হাওয়া এসে লাগছে গায়ে। নীল জলে সাঁতার কাটছে ছোট-বড় ট্রলার। সৈকত, কেওড়া বন, পাখি-প্রকৃতি, গ্রাম সবকিছু একসঙ্গে দেখতে চাইলে আপনিও যেতে পারেন নিঝুম দ্বীপে।

চর ওসমান থেকে নিঝুম দ্বীপ হওয়ার আখ্যান

একদম শুরুর দিকে এই দ্বীপের নাম ছিল চর ওসমান ও বাউল্লার চর। তখনো এখানে জনবসতি গড়ে ওঠেনি। লোকমুখে শোনা যায়, এখানে বসতি গড়া প্রথম মানুষটির নাম ওসমান। তখন তার নামানুসারেই দ্বীপের নামকরণ করা হয়েছিল। ওসমান ছিলেন একজন বাথানিয়া। 

শুধু সৈকতই নয়, দ্বীপটির মাটিও বালুতে চিকচিক করত। দ্বীপের বিভিন্ন স্থানে দেখা যেত বালুর ঢিবি বা টিলার মতো জায়গা। আর এই কারণেই বাইল্যার ডেইল বা বাউল্লার চর শব্দগুলো এই দ্বীপের নামের সঙ্গে জুড়ে যায়। এমনকি এখনো নিঝুম দ্বীপের অবস্থান জানার জন্য স্থানীয়দের বাইল্যার ডেইল বা বাউল্লার চরের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে হয়।

প্রথম বসতি গড়ের ওঠার সময় চরে প্রচুর চিংড়ি পাওয়া যেত। চিংড়ির স্থানীয় নাম ইছা; তাই স্থানীয়দের কেউ কেউ একে ইছামতির চরও বলত। ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ে দ্বীপটি একদম জনমানবশূন্য হয়ে যায়। ঝড় শেষে হাতিয়ার তৎকালীন সংসদ সদস্য আমিরুল ইসলাম কালাম দ্বীপটি পরিদর্শনে গিয়ে নাম বদলে দিয়ে ‘নিঝুম’ রাখেন।

নিঝুম দ্বীপের দর্শনীয় স্থান

এই চরের বিশেষত্ব হচ্ছে চিত্রা হরিণ ও শীতকালের অতিথি পাখি। একসঙ্গে এত চিত্রা হরিণ দেশের আর কোথাও দেখা যায় না। সন্ধ্যা নামলেই শিয়ালের ডাক শিরদাঁড়া দিয়ে রোমাঞ্চের ঢেউ তোলে।

নিঝুম দ্বীপে গিয়ে পাখি, হরিণ দেখতে হলে খুব ভোরে উঠতে হবে। আগে থেকেই কোনো স্থানীয় গাইডকে বলে রাখা যেতে পারে। তাহলে সঠিক জায়গায় যেতে অসুবিধায় পড়তে হবে না। স্থানীয় ছোট ছোট ছেলেরাই গাইডের কাজ করে। ওরাই সাধারণত পর্যটকদের ম্যানগ্রোভ বনের হরিণ দেখিয়ে নিয়ে আসে।

সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্য এখানকার সেরা জায়গা নামা বাজার সৈকত। নামা বাজার থেকে হেঁটে ১০ মিনিটের মধ্যেই সৈকতে যাওয়া যায়। এ সৈকতে কাঠের পাটাতন দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ৮০০ মিটারের সেতু। পর্যটকরা এর নাম দিয়েছেন নামার বাজার সমুদ্র সৈকত সেতু। সেতুর মাঝখানে মাঝখানে রয়েছে ছাউনি। পর্যটকরা ছাউনিতে বসে বিশ্রাম নেন। শেষ বিকেলের আলোয় ছাউনিতে বসে সূর্য ডোবার দৃশ্যও উপভোগ করেন অনেকে। বারবিকিউয়ের জন্যও এ জায়গাটি বেশ জনপ্রিয়।

নিঝুম দ্বীপ ছাড়া পাখিদের মেলা বসে পাশের দ্বীপ কবিরাজের চর ও দমার চরে। পড়ন্ত বিকেলে কবিরাজের চরের কাছে চৌধুরীর খাল দিয়ে নৌকা করে কিছু দূর গেলেই চোখে পড়বে চিত্রা হরিণ। ট্রলার রিজার্ভ করা হলে মাঝিই হরিণ দেখিয়ে নিয়ে আসতে পারবে। ১০ থেকে ১৫ জনের জন্য ট্রলার ভাড়ায় খরচ হতে পারে এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ টাকা।

তাজা ইলিশ খাওয়ার জন্য কমলার দ্বীপ সেরা জায়গা। জাতীয় উদ্যান এলাকা থেকে সাগর ঘোরার জন্য ৪০ জন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন ফাইবার বোট ভাড়া দেওয়া হয়।

শীতের অতিথি পাখি দেখার জন্য এখানকার আরও একটি দর্শনীয় জায়গা হচ্ছে ভার্জিন আইল্যান্ড। দমার চরের দক্ষিণে নতুন সৈকতটিই ‘কুমারী দ্বীপ’। দমার চর ঘুরে আসতে হলে ট্রলার ভাড়া পড়বে প্রায় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা। নিঝুম দ্বীপ থেকে একটু দূরের পথে দেখা মিলবে ভোলার ঢালচর আর চর কুকরি-মুকরি।

নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের সেরা সময়

নিঝুম দ্বীপের সৌন্দর্যে আপাদমস্তক অবগাহন করার জন্য শ্রেষ্ঠ সময় হচ্ছে শীত ও বসন্তকাল। হেমন্তের শেষলগ্নে তথা অক্টোবর থেকে এপ্রিলের ঠিক মাঝামাঝি সময়টাই উপযুক্ত সময়। এ সময় রাস্তাঘাট শুকনো থাকায় আশপাশের যেকোনো জায়গায় যাওয়া যাবে। এ ছাড়া হরিণ দেখার জন্য বনের পথে হাঁটতে সুবিধা হবে।

বর্ষাকালে গেলে হাঁটুসমান কাদায় পুরো দ্বীপ হেঁটে ঘুরতে হবে। যানবাহন নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়তে হবে। তবে ভোজনরসিকদের জন্য সুখবর হলো, এ সময়টাতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায় সেখানে। এ ছাড়া বছরের বাকি সময় মেঘনা নদী ও সাগর অনেক উত্তাল থাকে।

ঢাকা থেকে নিঝুম দ্বীপ যাওয়ার উপায়

সাগরের মাঝখানে হওয়ায় নিঝুম দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রার শুরুটা সড়কপথে হলেও শেষ অব্দি জলপথ ব্যবহার করতেই হবে। বাসে চড়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকার সায়দাবাদ বাস টার্মিনাল অথবা ধানমন্ডির জিগাতলা বাসস্ট্যান্ড থেকে নোয়াখালীর সোনাপুর পর্যন্ত যাওয়া যাবে। বাসের ধরনের ওপর ভিত্তি করে এসব বাসে ভাড়া পড়তে পারে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা।

সোনাপুর থেকে চেয়ারম্যান ঘাট যাওয়ার জন্য নিতে হবে সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পুরো একটা সিএনজি রিজার্ভ করতে খরচ পড়বে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা। চেয়ারম্যান ঘাট থেকে হাতিয়া যাওয়ার জন্য আছে ট্রলার, সি-ট্রাক, ও স্পিডবোট। যেগুলোতে জনপ্রতি ভাড়া পড়তে পারে যথাক্রমে ১২০-১৫০, ৯০ ও ৪০০ টাকা। এই জলযানগুলো নামিয়ে দেবে হাতিয়ার নলচিরা ঘাটে। এখানে মনে রাখা উচিত যে চেয়ারম্যান ঘাট থেকে সি-ট্রাক ছাড়ে প্রতিদিন সকাল ৮টায়। আর নলচিরা থেকে চেয়ারম্যান ঘাট আসার ফিরতি সি ট্রাক ছাড়ে সকাল ১০টায়।

নলচিরা ঘাট থেকে স্থলপথে হাতিয়া অতিক্রম করার একমাত্র উপায় হচ্ছে মোটরসাইকেল। এগুলো ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা ভাড়ায় সর্বোচ্চ দুজনকে মোক্তারিয়া ঘাট পর্যন্ত পৌছে দেয়। অতঃপর মোক্তারিয়া ঘাট থেকে ট্রলারে চেপে জনপ্রতি ২২ টাকা ভাড়ায় পৌঁছা যাবে নিঝুম দ্বীপের বন্দরটিলা ঘাটে।

ট্রেন ভ্রমণ করতে হলে ঢাকার কমলাপুর থেকে উঠে নেমে যেতে হবে নোয়াখালীর মাইজদীতে। এখানে সময় লাগবে প্রায় ছয় ঘণ্টা আর ট্রেনের শ্রেণিভেদে ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ২৩০ থেকে ৫০৩ টাকা।

তারপর মাইজদী থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আসতে হবে চেয়ারম্যান ঘাটে। এখানে অটোরিকশা রিজার্ভ করতে খরচ পড়তে পারে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। আর গ্রুপে দুই থেকে তিনজন থাকলে কম খরচে অর্থাৎ জনপ্রতি ১২০ থেকে ১৩০ টাকা ভাড়াতেই যাওয়া যেতে পারে। এরপরে নিঝুম দ্বীপ যাওয়ার রাস্তাটা একই।

ঢাকা থেকে নিঝুম দ্বীপ যাওয়ার সবচেয়ে সেরা উপায়টি হচ্ছে লঞ্চ ভ্রমণ। সদরঘাট থেকে প্রতিদিন বিকেল সাড়ে ৫টায় একটিমাত্র লঞ্চ হাতিয়ায় তমরদ্দি ঘাটের উদ্দেশে ছেড়ে যায়। গন্তব্যে পৌঁছাতে পৌঁছাতে পরদিন সকাল ৭টা বেজে যাবে। তমরদ্দি ঘাট থেকে ঢাকার ফিরতি লঞ্চ ছাড়ে দুপুর সাড়ে ১২টায়। লঞ্চের ডেকে, সিঙ্গেল কেবিন ও ডাবল কেবিনে ভাড়া পড়বে যথাক্রমে ৩৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা ও ২ হাজার ২০০ টাকা।

তমরুদ্দি ঘাট থেকে মোটরসাইকেলে মোক্তারিয়া ঘাট পৌঁছা যাবে। বাকি পথটা একইভাবে পাড়ি দিতে হবে।
তবে তমরুদ্দি ঘাট থেকে সরাসরি নিঝুম দ্বীপের নামার বাজার পর্যন্ত জলপথটা পাড়ি দেওয়ার আরেকটি উপায় আছে। তমরুদ্দি ঘাট থেকে কিছু মাছ ধরার ট্রলার সরাসরি নামার বাজার যায়। এগুলোতে উঠতে হলে সকাল ১০টার আগেই ঘাটে উপস্থিত থাকতে হবে। আর জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এ ছাড়া এখান থেকে ট্রলার রিজার্ভ করেও সরাসরি নামার বাজার যাওয়ার ব্যবস্থা আছে। তবে সে ক্ষেত্রে ৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া পড়তে পারে।

নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা
নিঝুম দ্বীপের বন্দরটিলা ও নামার বাজার সৈকতের কাছেই ভালো মানের কয়েকটি রিসোর্ট আছে। এগুলোতে জনপ্রতি ১ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকা খরচে বিভিন্ন ক্যাটাগরির রুম পাওয়া যাবে।
শীতের নিঝুম দ্বীপ মানেই ক্যাম্পিং। দ্বীপে ক্যাম্পিংয়ের জন্য সবচেয়ে ভালো জায়গা হলো নামার বাজারের নিঝুম রিসোর্টের পাশের খালটি পেরিয়ে সৈকতের কাছে প্রায় ছয় মাইলের বিশাল খোলা মাঠটি। ক্যাম্পিংয়ে রীতিমতো স্বয়ংসম্পূর্ণ নিঝুম দ্বীপ। এখানকার জাহাজমারা বাজারে ক্যাম্পিংয়ের প্রায় সব আইটেমই পাওয়া যায়। এ ছাড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায়ও তাঁবু ভাড়া পাওয়া যায়। তাই যাত্রার সময় সঙ্গে করে তেমন কিছুই নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।

নিঝুম দ্বীপে পেটপূর্তির জন্য যেতে হবে নামার বাজারে। সেখানকার খাবার হোটেলগুলো সামুদ্রিক মাছ এবং চিংড়িভাজার জন্য বেশ জনপ্রিয়। আগে থেকে অর্ডার করে রাখলে তুলনামূলক ভালো খাবার পাওয়া যায়।

যেসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে
নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণে সতর্ক থাকা আবশ্যক, বিশেষ করে যাত্রা শুরুর আগে অবশ্যই সেখানকার আবহাওয়ার ব্যাপারে অবগত হয়ে নেওয়া উচিত। নিঝুম দ্বীপে বিদ্যুতের জন্য সবাই জেনারেটর ও সোলারের ওপর নির্ভরশীল। তাই যাত্রার মুহূর্তে ব্যাগ গোছানোর সময় শীতের পরিমিত কাপড় ও ফার্স্ট এইডের পাশাপাশি মোবাইল চার্জার, ক্যামেরার ও মোবাইলের জন্য অতিরিক্ত ব্যাটারি, পাওয়ার ব্যাংক ও টর্চের কথা ভুলে গেলে চলবে না।

বিভিন্ন যানবাহন ভাড়া করার সময় আগে থেকে ভালোভাবে মিটিয়ে নেওয়া উচিত। তবে দর-কষাকষির সময় শিষ্টতা বজায় রাখতে হবে। সর্বোপরি, নিঝুম দ্বীপ ভ্রমণের সময় দ্বীপের পরিবেশ যেন অপরিষ্কার না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে খেয়াল রাখতে হবে।
 

Link copied!