টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ

ঈশান–আলোয় উজ্জ্বল ভারত


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২৬, ১২:০৬ পিএম
ঈশান–আলোয় উজ্জ্বল ভারত

কলম্বোয় আজ ‘এ’ গ্রুপের ম্যাচে পাকিস্তানকে ৬১ রানে হারিয়েছে ভারত। ভারতের ১৭৫ রানের জবাবে ১১৪ রানে গুটিয়ে যায় পাকিস্তান।
আগের কয়েকটি আইসিসি ইভেন্টে ভারতের হয়ে এ কাজটা করেছেন বা করার চেষ্টা করেছেন রোহিত শর্মা। এবার টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে যেন দায়িত্বটা কাঁধে তুলে নিয়েছেন ঈশান কিষান। খুব ‘সহজ’ দায়িত্ব—বল দেখো আর মারো। সাদা রঙের গোল কোনো বস্তু যদি তোমার দিকে ধেয়ে আসে, তবে তার গন্তব্য যেন একটাই হয়; গ্যালারি। তোমার সুবিধাজনক জায়গায় বল পড়ল কি পড়ল না, তাতে কিচ্ছু যায়–আসে না। ব্যাটিং করার সময় কাজ ওই একটাই—পেটানো, স্রেফ পেটানো!


কলম্বোর প্রেমাদাসা স্টেডিয়ামে আজ ঈশান নিজের দায়িত্বটা পালন করেছেন দারুণভাবে। কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করলেন না। মাঝপথে পিঠের ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন, শুশ্রূষাও নিতে হলো। কিন্তু সেই সময়ও ঈশানের তর সইছিল না। ড্রেসিংরুম থেকে ফিজিও আসার সময়টুকুও যেন তাঁর কাছে পাহাড়সম বিরক্তির কারণ। ভয় পাচ্ছিলেন, ছন্দটা না আবার কেটে যায়! তবে রাতটা আসলে ঈশানেরই ছিল। ছন্দ হারানো তো দূর অস্ত, ব্যাট যেন তাঁর কথা শুনতেই নেমেছিল আজ।

আবরার আহমেদকে মারা সেই লেট কাটটার কথাই চিন্তা করুন। যেভাবে কবজির মোচড়ে চার মারলেন, তা এই জগতের কোনো দৃশ্য বলে মনে হচ্ছিল না। এর কয়েক বল পর আবার সেই আবরারকেই আছড়ে ফেললেন কাভারের ওপর দিয়ে। পাকিস্তানের স্পিন-নির্ভর রণকৌশলকে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়িয়ে দিয়ে ৪০ বলে ৭৭ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেললেন এই ভারতীয় ওপেনার। তাঁর ওই ইনিংসই টস হেরে আগে ব্যাট করতে নামা ভারতকে এনে দিল ৭ উইকেটে ১৭৫ রানের সংগ্রহ। যে রান তাড়া করতে নেমে পাকিস্তান ১১৪ রানে অলআউট হয়ে ম্যাচ হেরেছে ৬১ রানে।

প্রেমাদাসার উইকেটে বল কিছুটা ধীরে আসছিল। প্রথম ওভারেই যখন অভিষেক শর্মা টুর্নামেন্টে পরপর দ্বিতীয় ম্যাচের মতো শূন্য রানে ফিরলেন, পাকিস্তান তখন রক্তের স্বাদ পাওয়া নেকড়ের মতো ক্ষিপ্র। পাওয়ারপ্লের মধ্যেই তারা ৫ ওভার স্পিন করিয়ে ফেলল। টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে পাওয়ারপ্লেতে ৫ ওভার স্পিন হওয়ার ঘটনা এর আগে ঘটেছে মাত্র ১২ বার।

কিন্তু ঈশান কিষান কি ওসবে ভয় পাওয়ার লোক! দ্বিতীয় ওভারে শাহীন শাহ আফ্রিদি একটু খাটো লেংথে বল ফেলতেই ব্যাকফুটে গিয়ে সেটাকে ওড়ালেন বিশাল এক ছক্কায়। ব্যাটের কানায় লেগে দু-একটা বল ক্যাচের মতো উঠে ফিল্ডারের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু ঈশানের আগ্রাসন তাতে কমেনি।

আবরারের বিপক্ষে সুইপ আর কাট করলেন রাজকীয় ঢঙে। সাইম আইয়ুবের বিপক্ষে পা ব্যবহার করে লেংথটা আগেভাগেই বুঝে নিচ্ছিলেন। পাওয়ারপ্লে শেষে ভারতের স্কোর দাঁড়াল ১ উইকেটে ৫২; যেখানে ঈশানের একার অবদানই ২৫ বলে ৪২!

যে উইকেটে শট খেলাই কঠিন, সেখানে পাওয়ারপ্লেতে ঈশানের এই রান সোনার চেয়েও দামি। ভারত-পাকিস্তান টি-টুয়েন্টি লড়াইয়ে পাওয়ারপ্লেতে কোনো ভারতীয়র এটিই এখন সর্বোচ্চ রান।

৬ ওভার পর ফিল্ডিং ছড়িয়ে গেল, কিন্তু ঈশানের তেজ কমল না। পাওয়ারপ্লের ঠিক পরের ওভারেই টানা ৩ বলে ৩ চার মেরে বুঝিয়ে দিলেন, যতক্ষণ ক্রিজে আছেন, লাগাম তাঁর হাতেই থাকবে। আবরারকে চার মেরেই পূর্ণ করলেন মাত্র ২৭ বলে নিজের ফিফটি। টি-টুয়েন্টিতে এটি তাঁর দশম পঞ্চাশোর্ধ্ব ইনিংস। ভারত-পাকিস্তান টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের লড়াইয়ে এটিই এখন দ্রুততম ফিফটি। সব মিলিয়ে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে তাঁর আগে আছেন শুধু মোহাম্মদ হাফিজ (২৩ বল, ২০১২) ও অভিষেক শর্মা (২৪ বল, ২০২৫)।

ভারত-পাকিস্তান টি-টুয়েন্টি লড়াইয়ে বিরাট কোহলির ৮২* এবং ৭৮*-এর পর ঈশানের ৭৭ এখন ভারতীয়দের মধ্যে তৃতীয় সর্বোচ্চ। কিছুদিনের বিরতির পর টি-টুয়েন্টি দলে ফিরে ৩৯ ম্যাচে ঈশানের রান এখন ১,১৬৯, গড় ৩০.৭৬ আর স্ট্রাইক রেট ১৪৩.৭৮।

৫.৩ ওভারে রান যখন ১ উইকেটে ৬৪, ম্যাচ তখন পুরোপুরি ভারতের মুঠোয়। এর মধ্যেই বিপত্তি! রিভার্স সুইপ করতে গিয়ে নিজের ডান পা চেপে ধরে মাঠে শুয়ে পড়লেন ঈশান। ব্যথায় কুঁচকে গেল মুখ। ফিজিও এসে স্ট্রেচিং করালেন, খেলা বন্ধ থাকল মিনিট দুয়েক। অন্য প্রান্তে দেখা গেল শাহীন আফ্রিদিও তাঁর ডান হাঁটুতে ব্যান্ডেজ বাঁধছেন। ঈশান উঠে দাঁড়ালেন, জেদ চেপে বসা চোখে আবার গার্ড নিলেন।

শেষ পর্যন্ত অবশ্য নবম ওভারে তাঁকে ফেরাতে পারল পাকিস্তান। সাইম আইয়ুবকে রিভার্স পুল করে চার মারার পরের বলেই একটু সরে গিয়ে লেগ সাইডে জায়গা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বলটা ছিল কিছুটা ফুল লেংথের, সরাসরি আঘাত করল লেগ স্টাম্পের মাথায়। ৮.৪ ওভারে দলকে ৮৮ রানে রেখে যখন ঈশান ফিরছেন, ভারতের ড্রেসিংরুম ততক্ষণে অনেকটাই চিন্তামুক্ত।

নামিবিয়ার বিপক্ষে ৬১ রানের পর এটি টুর্নামেন্টে ঈশানের টানা দ্বিতীয় হাফ সেঞ্চুরি। তবে এই ইনিংসটার মাহাত্ম্য আলাদা। প্রেমাদাসার কঠিন উইকেটে যেখানে সাহসের পাশাপাশি হিসাব কষে খেলার দরকার ছিল, ঈশান দুটিই দেখিয়েছেন। শেষ দিকে শিবম দুবের ১৭ বলে ২৭ আর রিঙ্কু সিংয়ের ৩ বলে ১০ রানের ক্যামিওতে ভারতের স্কোরটা ১৭০ ছাড়িয়ে গেছে। তবে দিন শেষে প্রেমাদাসার আকাশটা ঈশানের ওই ৭৭ রানের ঝলমলে আলোতেই উজ্জ্বল।

Link copied!