২০২২-এ তথ্য-প্রযুক্তির আলোচিত ঘটনাবলি


সংবাদ প্রকাশ ডেস্ক
প্রকাশিত: ডিসেম্বর ২৮, ২০২২, ০৫:১১ পিএম
২০২২-এ তথ্য-প্রযুক্তির আলোচিত ঘটনাবলি

তথ্য-প্রযুক্তিতে এগিয়ে যাচ্ছে বিশ্ব। প্রতিনিয়ত জানা যাচ্ছে নতুন কিছু, আর প্রযুক্তি ব্যবহারে খুঁজে বের করা হচ্ছে পুরনো সমস্যার নতুন সব সমাধান। বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় ২০২২ সাল যুক্ত করেছে নতুন কিছু উদ্ভাবন, সৃষ্টি করেছে ইতিহাস। তথ্য-প্রযুক্তির দুনিয়ার হাজারো ঘটনা থেকে এবছরের সবচেয়ে আলোচিত কয়েকটি ঘটনা দেখে নেওয়া যাক।

প্রথম ছবি পাঠায় জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ

২০২১ সালের ২৫ ডিসেম্বর মহাকাশে পাঠানো হয় জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ। মহাকাশে সৌরজগতের অবস্থান কোথায়, তা জানাতে এবং প্রথম নক্ষত্রগুলোর আলো দেখার উদ্দেশ্যে ১০ বিলিয়ন ডলার খরচ করে বিশাল আকারের জটিল এই যন্ত্রটি উৎক্ষেপণ করে নাসা। পৃথিবী থেকে ১৫  লাখ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে মহাকাশ দেখাকে আরও সহজতর করে এই টেলিস্কোপ। এবছর ১২ জুলাই এই টেলিস্কোপের পাঠানো প্রথম ছবি প্রকাশ করে নাসা। এর মাধ্যমেই, এই প্রথম মহাকাশের পূর্ণ রঙিন ছবি দেখতে পায় মানুষ। মহাকাশ গবেষণায় শুরু হয় নতুন যুগ। সেই থেকে নিয়মিতই মহাকাশের যুগান্তকারী সব ছবি ও উপাদান দেখতে পাচ্ছেন বিশ্ববাসী। ১০ বছর মেয়াদের এই টেলিস্কোপটি কাজ করছে মাইনাস ২৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে।  যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান নাসা এ ছবিকে মহাকাশের অনেক গভীর থেকে তোলা ছবি হিসেবে বর্ণনা করে।

নাসার কম্পিউটার থেকে এ ছবি নিয়ে আরও গবেষণা করা হলে আরও অনেক তথ্য পাওয়া যাবে। ছবিটি মহাবিশ্বের গ্যালাক্সিগুলোর একটি অংশকে ধারণ করেছে। এর নাম দেওয়া হয়েছে এসএমএসিএস ০৭২৩। ছবিটি আকাশে ছড়িয়ে থাকা আরও দূরবর্তী ছায়াপথের উপস্থিতি প্রকাশ করেছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, ছবিতে মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা জ্বলজ্বলে আলোক রশ্মির বিচ্ছুরণ ফুটে উঠেছে। মহাবিশ্বের প্রাচীনতম রূপ এটি। ১ হাজার ৩০০ কোটি বছর আগে মহাবিশ্বের ছবি এটি।

ইলন মাস্কের টুইটার কাণ্ড

সামাজিক মাধ্যম টুইটারের বেশ সরব ব্যবহারকারী ইলন মাস্ক। নিজের ব্যবসায়িক সফলতার প্রয়োজনে তিনি বেশ ফলপ্রসূ ব্যবহার করেন এই মাধ্যমটির। গত এপ্রিল মাসে টুইটার কিনে ফেলার ঘোষণা দেন এই ধনকুবের। তবে পিছিয়েও আসেন নানা অজুহাত দেখিয়ে। তবে আদালতের মধ্যস্থতায় টুইটার কিনতেই হয় তাকে। টুইটার কেনা থেকে মাস্ক যখন পিছিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন, তখন আদালতের শরণাপন্ন হয় টুইটার কর্তৃপক্ষ।

আদালতের রায়ে বলা হয়, ২৮ অক্টোবরের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টুইটার কেনার চুক্তি করে ফেলতে হবে। চুক্তি সম্পন্ন করতে হবে ৪ হাজার ৪০০ কোটি বা ৪৪ বিলিয়ন ডলারে। সেই তারিখের মধ্যেই টুইটার কিনেন তিনি। আর ধীরে ধীরে হারান বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির তকমা। প্রযুক্তি ব্যবসায় দারুণ সাফল্য পাওয়া ইলন মাস্ক তার টেসলা ও স্পেসএক্স কোম্পানির কারণে বেশ সমাদৃত ছিলেন। এই দুটো উদ্যোগ তাকে বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছে। বিশ্বের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তিনি এনেছেন নতুন মাত্রা। তার আরও বেশ কয়েকটি উদ্যোগ পৃথিবীর প্রযুক্তিকে নিয়ে যাবে বহুদূর।

তবে টুইটারের ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পরেই বিতর্ক যেন তার পিছু ছাড়ছে না। নিজের অপরিণামদর্শী কিছু সিদ্ধান্তে জাতিসংঘ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে পেয়েছেন হুমকিও। এরপর জানান, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ভোট হবে টুইটারে। তারপর ভোট করেন, তিনি টুইটারের প্রধান পদে থাকবেন কিনা জানতে চেয়ে। জানান, ভোটের রায় মানবেন তিনি। ভোট দেয় প্রায় ১৭ কোটি মানুষ। ৫৭.৫ শতাংশ ব্যবহারকারী তার সরে যাওয়ার পক্ষেই ভোট দেয়। ব্যবহারকারীরা রায় জানানোর পর তিনি সরে যাওয়ার পক্ষেই অবস্থান নেন, তবে যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজে পাওয়ার আগ পর্যন্ত টুইটার পরিচালনায় থাকবেন ইলন।

চন্দ্রযাত্রার নতুন সম্ভাবনা দেখাল আর্টেমিস

চাঁদের কক্ষপথে অরিয়ন নামের একটি মহাকাশযান পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে ১৬ নভেম্বর বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট— আর্টেমিস উৎক্ষেপণ করে মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা। যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে সফলভাবে উৎক্ষেপণ সম্পন্ন হয় রকেটটির। তৃতীয়বারের চেষ্টায় উৎক্ষেপণ করা শক্তিশালী এই রকেটটির উচ্চতা প্রায় ৩২৮ ফুট, যা প্রায় ৩২ তলা ভবনের সমান। অরিয়ন ক্যাপসুলে করে ভবিষ্যতে মানুষকে চাঁদে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই পরীক্ষামূলক এই উৎক্ষেপণ করা হয়। আপাতত জনশূন্য অরিয়ন ক্যাপসুলটি চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশের পর সেখানে কিছু দিন অবস্থান করে।

২৬ দিনের চন্দ্রযাত্রা শেষ করে সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসে অরিয়ন ক্যাপসুলটি। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে জ্বলন্ত অবস্থায় প্রবেশের পর প্যারাসুটে ভর করে প্রশান্ত মহাসাগরে অবতরণ করে ক্যাপসুলটি। পরীক্ষামূলক যাত্রা হওয়ায়, অরিয়নে করে এবার কোনো মানুষ পাঠানো হয়নি। তবে পরবর্তী যাত্রায় অরিয়ন ক্যাপসুলে যাত্রী হবেন মহাকাশচারীরা। আর অদূর ভবিষ্যতে চাঁদ ঘুরে আসতে পারবেন মহাকাশে ভ্রমণ-ইচ্ছুরা। যাওয়া যাবে মঙ্গলগ্রহেও।

মানুষকে পুনরায় চাঁদে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৪ সালের শেষে আবারো পৃথিবী থেকে জ্বলে ওঠবে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রকেট, নাসার আর্টেমিস। এরপর ২০২৩ ও ২০২৬ সালেও চলবে অভিযান। ২০২৪ সালের আর্টেমিস-২ মিশনে চাঁদ ঘুরে আসবেন মহাকাশচারীরা। এর পরের যাত্রায় তথা আর্টেমিস-৩-এ তারা অবতরণ করবেন চাঁদে। ঠিক ৫০ বছর আগে শেষবারের মতো চাঁদে মানুষ নিয়ে গিয়েছিল এপলো। এপলো-১৭-এর সেই যাত্রার পর থমকে যায় চন্দ্রযাত্রা। গ্রিক পুরাণে আর্টেমিস ছিল এপেলোর বোনের নাম। তাই নাসার এপোলো প্রজেক্টের পরে আসা সংস্থাটির উন্নত প্রযুক্তির চন্দ্রযাত্রার নাম দেওয়া হয়েছে আর্টেমিস।

নিউক্লিয়ার ফিউশন: পারমাণবিক শক্তি উৎপাদনে নতুন যুগের সূচনা

সূর্যের প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদনের লক্ষ্যে প্রায় ৫০ বছর ধরে গবেষণা করে আসছেন বিজ্ঞানীরা। এবার অপরিমেয় পরিচ্ছন্ন শক্তি উৎপাদনের সেই জাদুর কাঠি হাতে পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানীরা। নিউক্লিয়ার ফিউশন পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদন করেছেন তারা। সূর্যসহ মহাবিশ্বের সকল নক্ষত্রে শক্তি উৎপাদিত হয় ফিউশন পদ্ধতিতে। সেখানে ব্যবহৃত হয় হাইড্রোজেন, যা বিক্রিয়া শেষে হিলিয়ামে রুপান্তরিত হয়। সেই ফিউশন থেকে উৎপাদিত শক্তি আমরা দেখতে পাই আলো রূপে। আর বর্তমানে আমাদের পারমাণবিক চুল্লিতে শক্তি উৎপাদিত হয় ফিশন পদ্ধতিতে।

ফিউশন প্রক্রিয়ায় শক্তি উৎপাদন তুলনামূলক নিরাপদ এবং এখানে তেজস্ক্রিয় বর্জ্য উৎপাদিত হয় অনেক কম। আবার এই বর্জ্যের তেজস্ক্রিয়তা শেষ হয় খুব দ্রুত। আবার বিক্রিয়ায় হাইড্রোজেন বা লিথিয়াম ব্যবহার করার কারণে, শক্তি উৎপাদনে কাঁচামাল নিয়ে কোনো চিন্তা করার প্রয়োজন নেই। অন্যদিকে পারমাণবিক চুল্লির ফিশান পদ্ধতিটি ফিউশন পদ্ধতির ঠিক উল্টো। এই পক্রিয়ার ভয়াবহতা আজ পৃথিবীর সামনে পরিষ্কার। এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও বেশ কঠিন ও ব্যয়সাপেক্ষ। এই পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদনে যেকোনো দুর্ঘটনা পুরো পৃথিবীকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। যেখানে, ফিউশন পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদন ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে শক্তিই উৎপাদন করা যাবে না।

পৃথিবীতে এলিয়েন আসার প্রমাণ পায়নি যুক্তরাষ্ট্র

মহাকাশের একটি বিষয় নিয়ে মানুষ এখনো স্পষ্টত কিছুই জানতে পারেনি। সেটি হলো ভিনগ্রহী প্রাণী বা এলিয়েন। অনেক বছর ধরে পৃথিবীতে তাদের আগমন নিয়ে নানা গল্প চলতে থাকলেও, এবার সেসব কিছু নাকচ করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

২০০৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১৪৪টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যেখানে এলিয়েনরা পৃথিবীতে এসেছিল বলে দাবি করা হয়। এ নিয়ে তদন্তে নামে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগের সদর দপ্তর পেন্টাগন। বেশির ভাগ ঘটনাতেই বলা হয় কোথাও কোথাও আনআইডেন্টিফায়েড ফ্লাইং অবজেক্টস বা ইউএফও দেখা গেছে অথবা সেন্সরে ধরা পড়েছে। তবে গত ১৬ ডিসেম্বর সংস্থাটি জানিয়েছে, ঘটনাগুলো পর্যালোচনা করে তারা এলিয়েনদের পৃথিবীতে আসা কিংবা ইউএফও নিয়ে পৃথিবীতে দুর্ঘটনায় পড়ার কোনো প্রমাণ খুঁজে পাননি।

এই এলিয়েন ধারণাটি থেকে আমাদের পৃথিবীতে ঘটে গেছে নানা কাণ্ড। বানানো হয়েছে শত শত ব্যবসা-সফল সিনেমা। নানা পোশাক, খেলনা, পোস্টার আর বিভিন্ন পণ্যে সয়লাব বিশ্ববাজার।

Link copied!