আমাদের মিতব্যয়ী হতে হবে


আফরিদা ইফরাত
প্রকাশিত: নভেম্বর ২৩, ২০২২, ১০:৪৭ এএম
আমাদের মিতব্যয়ী হতে হবে

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা পরিস্থিতি মোকাবিলায় মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে, তা থেকে অদূর ভবিষ্যতে দুর্ভিক্ষের আশঙ্কার কথা শোনা যাচ্ছে। এমন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ তাৎপর্যপূর্ণ।

বৈশ্বিক মন্দার এই সময়ে বাংলাদেশের প্রত্যেকেই চিন্তিত। শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক দুরবস্থা থেকেই এক ধরনের আতঙ্ক সবার মনে। সারা বিশ্বেই তো অর্থনৈতিক দুরবস্থা প্রকট। বিশেষত ইংল্যান্ডের দিকে তাকালে যেন দুরবস্থা আরও প্রকট হয়। যাহোক, শ্রীলঙ্কার সঙ্গে আমাদের তুলনা দেওয়ার প্রবণতা আসে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচারে। অবকাঠামোগত এবং অর্থনৈতিক বিষয় বিবেচনায় আমরা এমন কিছু আশঙ্কা করি না। শ্রীলঙ্কা বিরাট একটি সময় পর্যন্ত পর্যটনখাত নির্ভর ছিল। আমাদের ক্ষেত্রে তা সত্য নয়। কৃষিই আমাদের শক্তি। তবে হ্যাঁ, কৃষিখাতে আমাদের যা যা সমস্যা আছে তা চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধানে সচেষ্ট হতে হবে। তাই বাংলাদেশ শ্রীলঙ্কা হয়ে যাবে এমন আশঙ্কা করার কারণ নেই। তবে একথা সত্য, আমাদের আত্মতুষ্টিতে ভোগারও অবকাশ নেই।

ইতোমধ্যে আমরা আইএমএফ থেকে ঋণের নিশ্চয়তা পেয়েছি তা একটি খুশির সংবাদ। পরিমাণে কম হলেও আমরা একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলাম। দেশের অর্থনীতি যে ধসের মুখোমুখি হচ্ছে না তার নিশ্চয়তা। এই ঋণের টাকার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন আমাদের দায়িত্ব। কিন্তু জাতিগতভাবে আমাদের মিতব্যয়ী হয়ে উঠতে হবে। এর জন্য নীতিনির্ধারকদের ওপর রাগ করে লাভ নেই। নিজ অস্তিত্বের স্বার্থেই আমাদের মিতব্যয়ী হয়ে উঠতে হবে। কারণটি একবার ব্যাখ্যা করা দরকার। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সারা বিশ্বেই একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্রিটেনের ক্ষেত্রে যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখবো বিশাল একটি সময় পর্যন্ত তারা উৎপাদনমুখী অর্থব্যবস্থার বদলে বিনিয়োগমূলক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে গিয়েছে। এ জন্যই তাদের অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি একটি বড় সমস্যা। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্রে মজুরি বাড়ানোর হার ইতিহাসে সর্বোচ্চ হলেও তারা মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করতে পারছে না। তাই পুঁজির প্রবাহ থাকলেই বর্তমান মন্দায় সুস্থির হওয়ার সুযোগ নেই।

রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব ইতোমধ্যে আমাদেরও ছুঁয়ে গেছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্বে অনেক শস্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। দেশে চাল, আটা ময়দাসহ নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। শিক্ষাব্যবস্থার স্থবিরতা কাটেনি। যারা আয় করছেন, তারাও দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে সঙ্গতি স্থাপন করতে পারছেন না। এতসব সমস্যার মধ্যে যুক্ত হয়েছে দেশের নানা প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয়বৃদ্ধি। আমাদের অর্থনীতির চালিকাশক্তি কৃষি নিয়ে কত অভিযোগ। করোনা মহামারির সময়েও কৃষিখাতের অবদানের জন্য আমরা টিকে গিয়েছি। এখন আবার সমস্যা দেখা দিচ্ছে। কদিন আগে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং আমাদের অনেক ক্ষতি করে গেছে। অর্থাৎ আমাদের অসংখ্য সমস্যা রয়ে গেছে।

এতসব সমস্যার মধ্যে বিশেষজ্ঞরা বলেন, আমাদের উৎপাদনমুখী হতে হবে। উৎপাদনের মাধ্যমে আমাদের বৈশ্বিক মন্দার মুখোমুখি হতে হবে। সেই মন্দা থেকে উত্তরণ কবে হবে তা এখনো কেউ জানে না। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই মন্দায় নিজের সম্পদ ব্যবহারে উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে। ফলে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন নিয়েও অনেকে এখন দুশ্চিন্তা করতে শুরু করেছেন। বিশ্বব্যাপী যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিচ্ছে, তার ধাক্কা যেন বাংলাদেশকে খুব বেশি ক্ষতি করতে না পারে। আঘাতটা লাগবেই, কারণ পৃথিবী একটা গ্লোবাল ভিলেজ, আমরা একই সঙ্গে। কাজেই একটা জায়গায় যদি এ রকম হয়, সারা বিশ্বে দেখা দেয়। সেই অভিঘাতটা বাংলাদেশেও আসে। বর্তমানে চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটকালে এই কৃষি-নীতির যে দিকটিতে বিশেষভাবে আলোকপাত করা দরকার, তা হলো—এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় আমাদের কৃষি খাতের অবদান, সক্ষমতা ও সম্ভাবনা। ২০০৮-০৯-এর বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থার সংকটকালে অনেকে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবিত হয়ে পড়েছিলেন। কিন্তু সে সময় সরকারের যথাযথ নির্দেশনা ও সহায়তায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘রিয়েল ইকোনমি’তে ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল।

যুদ্ধের কারণে খাদ্য পরিবহনেও সমস্যা হচ্ছে। এতে আমাদের মতো দেশে যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। গম ও ভোজ্য তেলসহ অনেক খাদ্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে। খাদ্য সরবরাহ পেতেও অসুবিধা হচ্ছে। এসবই আমাদের আমদানি মূল্যস্ফীতি বাড়ানোর পেছনে কাজ করছে। গত ১৩-১৪ বছরে দেশকে একটি শক্তিশালী সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো গেছে বলে চলমান সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশ অন্য অধিকাংশ দেশের চেয়ে ভালো করছে। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী এবং রেটিং এজেন্সিগুলোও তাই বলছে। তবে চ্যালেঞ্জ যে রয়েছে তা তো মানতেই হবে। একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে এই সংকট উত্তরণের ক্ষেত্রেও কৃষি সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষাকবচ হতে পারে। এ জন্য দরকার সময়োচিত নীতি গ্রহণ ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন।

নীতিনির্ধারণী পর্যায় বাদেও জনজীবনে মিতব্যয়ী হওয়া প্রয়োজন। প্রযুক্তির বিকাশের ফলে আমরা ধীরে ধীরে বিলাসী পণ্যের দিকে ঝুঁকেছি। কিন্তু এসব পণ্য আমাদের না হলেও চলে। দৈনন্দিন জীবনে কিছু পরিবর্তনের পাশাপাশি দায়িত্বশীলদেরও সুষ্ঠু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ও নীতিনির্ধারণ করতে হবে। নাহলে সামনে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।

লেখক : সংবাদকর্মী।

Link copied!